SEBA Class-10 Bangla Question Answer| রচনা 2

SEBA Class-10 Bangla Question Answer| রচনা 2 প্রতিটি অধ্যায়ের উত্তর তালিকায় প্রদান করা হয়েছে যাতে আপনি সহজেই বিভিন্ন অধ্যায় জুড়ে ব্রাউজ করতে পারেন এবং আপনার প্রয়োজন SEBA Class-10 Bangla Question Answer| রচনা 2 এমন একটি নির্বাচন করতে পারেন।

SEBA CLASS 10 (Ass. MEDIUM)

  1. English Solutions
  2. অসমীয়া Questions Answer
  3. বাংলা Questions Answer
  4. বিজ্ঞান Questions Answer
  5. সমাজ বিজ্ঞান Questions Answer
  6. हिंदी ( Elective ) Questions Answer
  7. ভূগোল (Elective) Questions Answer
  8. বুৰঞ্জী (Elective) Questions Answer
  9. Hindi (MIL) Question Answer

SEBA Class-10 Bangla Question Answer| রচনা 2

Also, you can read the SCERT book online in these sections Solutions by Expert Teachers as per SCERT (CBSE) Book guidelines. These solutions are part of SCERT All Subject Solutions From above Links . Here we have given SEBA Class-10 Bangla Question Answer|  Solutions for All Subjects, You can practice these here.

২০। তোমার বিদ্যালয় জীবনের অভিজ্ঞতা 

সূচনা : বিদ্যালয় হইল বিদ্যা বা জ্ঞান অর্জনের পীঠস্থান। আমার যেন মনে হয় বিদ্যালয় আমার দ্বিতীয় বাসগৃহ। কখনো কখনো মনে হয় আমার বাসগৃহ হইতেও আমি বিদ্যালয়কে বেশি ভালবাসি। আমার বিদ্যালয়ে নিয়মিত আসা-যাওয়ার মধ্যে এক অতি অনিন্দ সুন্দর মানবিক পরিবেশ গড়িয়া উঠিয়াছে। কোনো দিন বিশেষ কারণে ‘বিদ্যালয়ে আসিতে না পারলে সেইদিন মনে এক অপূর্ণ অনুভূতি জাগে মনে হয় বিদ্যালয়ের

যাইতে না পারিয়া যেন অনেক কিছু হারাইয়াছি। আমার প্রাথমিক বর্ণমালার ক্লোন বাড়িতে মায়ের কাছেই হইয়াছে। একটু বড় হইয়াই আমি প্রথম বিদ্যালরে গিয়াছি। 

প্রথম ভর্তির দিন : আমার বাবার হইল বদলীর চাকুরী। আমাকে সেইজন্য অনেকবার বিদ্যালয় বদলাইতে হইয়াছে। আমার প্রাথমিক শিক্ষা গ্রামের কোন এক অখ্যাত বিদ্যালয়েই সমাপ্ত হইয়াছে। যখন একটু বড় হইয়াছি, পঞ্চম মান শ্ৰেণীতে উঠিয়াছি তখন আমার বাবা আসামের বিখ্যাত শহর গৌহাটির এক নাম করা বিদ্যালয়ে আমাকে ভর্তি করাইয়া দিলেন। ভর্তির দিনটি আমার এখন সঠিক মনে নাই তবে ঐ দিনটি যতদূর মনে পড়ে জানুয়ারি মাসের ১০ তারিখ ছিল। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মহাশয় আমাকে ভর্তির প্রপত্র দেওয়ার আগে আমার পরীক্ষা নিলেন। ইংরেজিতে আমার নিজের নাম এবং পিতার নাম ও ঠিকানা লিখিতে দিলেন। আমার মনে আছে, আমি প্রশ্নগুলির উত্তর খুব সুন্দর ও শুদ্ধ করিয়া করিতে পারিয়াছিলাম তাই প্রধান শিক্ষক মহাশয় পঞ্চম শ্রেণীতে আমার নাম ভর্তি করাইয়া লইয়াছিলেন। ভর্তির প্রথম দিনই আমার, এত বড় দুইতলা বিশিষ্ট বিদ্যালয় বাড়িটিতে প্রবেশ করিতে ভয় ভয় করিয়াছিল। ঐ দিন ভর্তি হইয়াই বাড়ি ফিরিয়া আসিলাম। জানিয়া আসিয়াছিলাম এক সপ্তাহ পর হইতে বিদ্যালয়ের পাঠদান শুরু হইবে। 

বিদ্যালয়ে প্রথম দিন : বিদ্যালয় ১০টার সময় বসে। নির্ধারিত দিনে বিদ্যালয় শুরু হওয়ার প্রায় আধা ঘণ্টা পূর্বেই আমি উপস্থিত হইয়াছিলাম। বিদ্যালয়ের দপ্তরী আমাদের শ্রেণীকক্ষটি দেখাইয়া দিলে আমি সোজা শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করিয়া প্রথম বেঞ্চের এক কোণে। আমার আসন ঠিক করিয়া বসিলাম। আমাকে আমার বড়দাদা বিদ্যালয়ে পৌঁছাইয়া দিতে আসিয়াছিলেন। দেখিলাম অনেক ছাত্র বাসে করিয়া কেহ বা পায়ে হাঁটিয়া বিদ্যালয়ে আসিয়াছে। বড় রাস্তার পার্শ্বে হলুদ রঙের বিশাল বিদ্যালয় গৃহটি প্রথম দৃষ্টিতেই আমাকে ভীষণভাবে আকর্ষণ করিয়াছিল। বিদ্যালয়ের প্রধান ফটক, সিঁড়ি ও প্রশস্ত বারান্দা সবই বেশ দেখার মত সুন্দর। মাত্র পনের মিনিটের মধ্যেই প্রচুর ছাত্রের উপস্থিতিতে দুই তলা বিদ্যালয় গৃহটি চেঁচামেচিতে মুখরিত হইয়া উঠিল। যথাসময়ে প্রার্থনার পর বিদ্যালয় শুরু হইল। কিছুক্ষণ পরেই একজন শিক্ষক মহাশয় শ্রেণীতে প্রবেশ করিলেন। আমার বুকটা হঠাৎ যেন একটু কাঁপিয়া উঠিয়া পরক্ষণেই শান্ত হইল। শিক্ষক মহাশয় প্রত্যেকের নাম ধরিয়া ডাকিলেন এবং পরিচয় লইলেন। কে কোথা হইতে আসিয়াছে জিজ্ঞাসা করিলেন। তাহাকে বেশ হাসিখুশি মনে হইল। প্রথম দিন তিনি কোন পাঠ পড়াইলেন না। গৰু গুজবের পর প্রথম ঘণ্টা শেষ হইল। এইভাবে প্রথম দিন শেষ হইল। 

পড়াশুনা ঃ আমি সর্বদাই বিদ্যালয়ে নিয়মিত যাতায়াত করিতাম। পড়াশুনার ব্যাপারে আমার এতটুকু অবহেলা ছিল না। বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ আমাকে বেশ সুনজরে দেখিতেন। আমি প্রায় পাঁচ বৎসর কাল ঐ বিদ্যালয়ে পড়িয়াছিলাম। এই সময়ের মধ্যে কোন দিনই আমার বিশেষ কোন দোষ বা অন্যায় শিক্ষক মহাশয়দের নিকট ধরা পড়ে নাই।

বিদ্যালয়ে কি কি শিখিয়াছি :বিদ্যালয় এক পবিত্র মন্দির। এই স্থানে শুধু পড়াশুনাই নয় বিভিন্ন বিষয়ে নানা জ্ঞান আহরণ করার ইহা উপযুক্ত স্থান। জীবনে উন্নতি করিবার নানা সুবিধা এইখানে রহিয়াছে। আচার-আচরণ, সভ্যতা-ভদ্রতা, খেলাধূলা, বক্তৃতা শিক্ষা সবকিছুই এই স্থানে শিক্ষা করা যায়। এই স্থানের অর্জিত জ্ঞানই ভবিষ্যৎ জীবনের উন্নতির প্রবেশ দ্বার। 

বাৎসরিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও আমি যথারীতি অংশগ্রহণ করিয়াছি। এইসকল বিষয়ে আমিই ছিলাম প্রথম উদ্যোগী। নাটক প্রতিযোগিতার, ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় আমি প্রতি বৎসরই যথেষ্ট পুরস্কার লাভ করিতে সমর্থ হইয়াছি। আমি একবার বিদ্যালয়ের ম্যাগাজিনের সম্পাদকও হইয়াছিলাম। তখন আমি দশম শ্রেণীর ছাত্র। বিদ্যালয়ের ফুটবল প্রতিযোগিতা, ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় যথেষ্ট সুনাম অর্জন করিতে না পারিলেই সকল কাজেই আমি আমাকে নিয়োজিত রাখিয়াছিলাম। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন পরীক্ষার আমার নাম কখনও প্রথম কখনও বা দ্বিতীয় স্থানে থাকিত। বিদ্যালয় শিক্ষান্ত পরীক্ষার পূর্বে আয়োজিত বিদায়সভায় আমি আমার বিদায়ী ভাষণে শিক্ষক ও শিক্ষিকাদের বাহবাও পাইয়াছিলাম। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মহাশয় আমার শান্ত ভদ্র স্বভাবের জন্য আমাকে যথেষ্ট স্নেহ ও আদর করিতেন। বিদ্যালয় শিক্ষান্ত পরীক্ষায় আমি বিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান পাইয়াছিলাম। ইংরেজি, গণিত ও সাধারণ বিজ্ঞানে আমার শতকরা ৮০ ভাগ নম্বর ছিল। আজ সকলই অতীত, শুধু স্মৃতি। নানা অনুভূতিতে জড়াইয়া আছে আমার বিদ্যালয় জীবনের সকল অধ্যায়। এখন শুধু অভিজ্ঞতায় বিলীন মাত্র। 

২১। নিরক্ষরতা দূরীকরণে ছাত্রসমাজের ভূমিকা ভূমিকা

ভূমিকা: বিশ্বের প্রতিটি দেশের প্রতিটি সমাজের উচ্চ-নীচ সর্বস্তরের মানুষের শিক্ষা গ্রহণ করা এক মানবিক অধিকার ও জন্মগত অধিকার। এই অধিকার হইতে বর্তমান পৃথিবীতে ঈশ্বর প্রেরিত কোন শিশুকেই বঞ্চনা করা চলিবে না। অশিক্ষা ও অজ্ঞতা মনুষ্য জীবনের এক নিদারুণ অভিশাপ। শিক্ষা প্রতিটি মানুষকে বিশ্বের জ্ঞান ভাণ্ডারে প্রবেশ করিতে ছাড়পত্র যোগায়। বিধাতার সৃষ্টি এই বিশ্ব চরাচর অনন্ত জ্ঞানের পারাবার। যাহারা শিক্ষার অভাবে বিশ্বের জ্ঞান ভাণ্ডারের তালা খুলিতে পারে না তাহারা বড়ই অভাগা।- তাহারা শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান হইতে বঞ্চিত নহে, ব্যক্তিগত বা ব্যক্তি জীবন এবং সামাজিক জীবনের নানা দিক হইতেও বঞ্চিত হয়। নিরক্ষর কাহারা? লেখাপড়া না-জানা লোকদিগকে নিরক্ষর বলা হয়। নিরক্ষর লোকেরা সাধারণ শিক্ষার নিম্নতম সুবিধাটুকু হইতেও বঞ্চিত হ্যা, তাই নিরক্ষরতা একটি সামাজিক সমস্যা। নিরক্ষরতাই দেশের স্বাভাবিক প্রগতিতে প্রধান বাধার স্বরূপ হইয়া দাঁড়ায়, ইহা একটি সামাজিক অভিশাপও বটে। 

নিরক্ষরতা একটি অভিশাপ : ভারতবর্ষের প্রায় ৭০ শতাংশ লোকই নিরক্ষর। নিরক্ষর লোকেদের ব্যক্তিত্বের বিকাশ এবং আনের বিকাশ বা শুভবুদ্ধির উন্মেষ ঘটে না। নিরক্ষর লোকেদের মধ্যে অন্ধবিশ্বাস, সাম্প্রদায়িকতা এবং বিভিন্ন কু-প্রথা সহজেই গভীর ভাবে প্রবেশ করিয়া থাকে। নিরক্ষর লোক গণতান্ত্রিক দেশের দায়িত্ব, অধিকার, কতবা ইত্যাদির তাৎপর্য সহজে উপলব্ধি করিতে সক্ষম হয় না। সেই জন্য সমাজের সর্বস্তরের মানুষ যাহাতে উপযুক্ত শিক্ষা লাভ করিতে পারে তাহার জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টার নিতান্ত প্রয়োজন। ভারতবর্ষের নাগরিকদের মধ্যে শতকরা ৩০ ভাগ লোক শিক্ষিত বা স্বাক্ষরজ্ঞান প্রাপ্ত। নগর অঞ্চল অপেক্ষা পল্লী অঞ্চলে নিরক্ষরতা বেশি। আবার পুরুষ অপেক্ষা নারীদের মধ্যে নিরক্ষর লোক বেশি। নিরক্ষর লোকেরা নিজের ঘরের ছেলেমেয়েদের পড়াশুনায় সাহায্য করিতে পারে না। বিদ্যালয়ে ভালভাবে শিক্ষাদান করা সম্ভব না হওয়ায় নিরক্ষর দরিদ্র হাফিদের ছেলেমেয়েদের নীচু শ্রেণীতে পড়ার সময়েই বিদ্যালয়ের পড়া বন্ধ হইয়া যায়। এইভাবে নিরক্ষর লোকের সংখ্যা সমাজে বাড়িতে থাকে। 

নিরক্ষরতা দূরীকরণে ব্যবস্থা গ্রহণ : বর্তমান ভারতে যে সকল সমস্যা জাতীয় জীবনের উন্নতির পক্ষে অন্তরায় হইয়া দাঁড়াইয়াছে নিরক্ষরতা তাহাদের মধ্যে অন্যতম। ভারত সরকার সর্বভারতীয় নিরক্ষরতা দূরীকরণের জন্য বিশেষ কিছু প্রকল্প হাতে লইয়াছেন। ভারতের সংবিধানে ১৯৬০ সালের মধ্যে ১৪ বৎসর বয়স পর্যন্ত সমাজের সর্বস্তরের মানুষের ছেলে-মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রকল্প গ্রহণ করিয়াছিলেন। যদিও নানা কারণে এই প্রকল্প যথাযথভাবে রূপায়ণ করা সম্ভব হয় নাই তথাপি ইহার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করা হইতেছে। যেই সকল গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় নাই সেই সকল গ্রামে বিদ্যালয় গৃহ নির্মাণ ও শিক্ষক নিযুক্তির ব্যবস্থা করিয়াছেন। প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার ব্যবস্থাও করা হইয়াছে। বর্তমানে ভারত সরকার সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি করার জন্য “সর্বশিক্ষা অভিযান মিশন” নামে একটি ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছেন। এই ব্যবস্থাকে রূপায়িত করার জন্য আসামের “জ্ঞান বিজ্ঞান” সমিতি ইহার বহুলভাবে প্রচারে নামিয়াছে। কিন্তু ভারতের নিরক্ষরতা দূরীকরণে শুধুমাত্র সরকারী প্রচেষ্টাই যথার্থ নহে। ইহার জন্য চাই ছাত্র। সমাজের একান্ত প্রচেষ্টা। 

নিরক্ষরতা দূরীকরণে ছাত্র সমাজের ভূমিকা : ভারতবর্ষ একটি বৈচিত্র্যময় দেশ। এখানে বৈষম্যও রহিয়াছে যথেষ্ট। এখানকার সমাজে দারিদ্র্য, অশিক্ষা, স্বাস্থাহীনতা ও কুসংস্কার আজও ভীষণভাবে প্রকট। সকল প্রকার সমস্যা দূরীকরণে একমাত্র সরকারী নগণ্য প্রয়াসই যথেষ্ট নহে। এই সকল সমস্যা দূরীকরণের জন্য চাই সমাজের স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, সমাজসেবী প্রতিষ্ঠান ও ছাত্র সমাজের সচেতনতা। দেশের আপৎকালীন পরিস্থিতিতে দেশের প্রাণোচ্ছল। ত্যাগৱতী ছাত্রসম্প্রদায় যুগে যুগে নানা সমাজকল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণ করিয়া আসিতেছে। তাহারা এখনও এই সকল কাজে পিছাইয়া নাই। ভারতের প্রায় ৭০ শতাংশ নিরক্ষর মানুষ শিক্ষাহীনতার অভিশাপে আক্রান্ত, দেশের ত্যাগব্রতী ছাত্রসম্প্রদায় নিজেদের

বিদ্যাচর্চার অবসরে গ্রামে ও শহরের প্রত্যন্ত বস্তিতে নৈশ বিদ্যালয়, বয়স্ক শিক্ষার বিদ্যালয় পরিচালনা করিয়া নিরক্ষরতা দূর করিতে পারে। স্বল্প শিক্ষিতদের হাতের কাজ ও কুটির শিল্পের বিষয়ে উৎসাহিত করিতে পারে। সবসময়ই দেখা যায় যে সমাজ সেবায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছাত্ররাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করিয়া থাকে। সমাজের স্বার্থপর বয়স্ক মানুষ নানা কারণে দ্বিধাগ্রস্ত ও সংকুচিত। তাই দেশের তরুণ ছাত্রসমাজ তাহাদের নিষ্ঠা ও ঐকান্তিকতা লইয়া আত্মনিয়োগের মাধ্যমে নিরক্ষর দেশবাসীকে অজ্ঞতার অন্ধকার হইতে আলোকের। রাজ্যে মুক্তি দানে ব্রতী হইতে পারে। ছাত্র-ছাত্রীরা যদি প্রত্যেকে প্রতি বৎসর অন্তর দুই- তিন-জন নারী-পুরুষকে সাক্ষর করিয়া তুলিতে পারে তাহা হইলে সমাজের অশেষ কল্যাণ- হইবে। নিরক্ষরতা দূরীকরণে বিশেষ করিয়া বয়স্কদের শিক্ষাদানই বিশেষ কার্যক্রম। দরিদ্র পিতা-মাতা শিক্ষিত হইলেই তাহাদের সন্তানদের প্রতি বিশেষ প্রভাব পড়িবে। স্কুল ছাড়া ‘ড্রপ আউট ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষাদানে বিশেষ করিয়া ছাত্র-ছাত্রীদের আত্মনিয়োগ করিতে হইবে। 

২২। আমার প্রিয় খেলা (ক্রিকেট) বা (বিশ্বকাপ ক্রিকেট) 

সূচনা : বর্তমান বিশ্বের সেরা খেলার মধ্যে হইল ক্রিকেট খেলা। তাই ক্রিকেট খেলা। হইতেছে খেলার রাজা। সেইজন্য বিশ্বের সকল খেলার মধ্যে ক্রিকেট খেলাই আমার অধিকতর প্রিয় খেলা। 

ব্রিটিশ শ্বেতাঙ্গদের দল রাজতন্ত্রের মতো বুক দিয়া রক্ষা করিয়া চলিয়াছে খেলার রাজা ক্রিকেটকে। পৃথিবীর যে স্থানেই তাহারা গিয়াছে সেইখানেই তাহারা স্থাপন করিয়াছে। উপনিবেশ। আর সেই স্থানেই তাহারা পুঁতিয়া আসিয়াছে ব্রিটিশ রাজদণ্ডের সঙ্গে ক্রিকেটের তিনটি ‘উইকেট’। আধুনিক বিশ্বে রাজতন্ত্রে উপনিবেশ প্রথার অবসান ঘটিলেও ক্রিকেটের প্রাধান্য কিন্তু কমে নাই, বরং কালক্রমে এই খেলা আরও বেশি জনপ্রিয়তার ঊর্ধ্বে উঠিয়াছে সারা পৃথিবীতে। বর্তমান বিশ্বে তাই ক্রিকেট যে শুধু রাজার বেল। তাহা নহে ইহা এখন মজার খেলাও বটে। এই খেলা এখন আবাল বৃদ্ধ-বনিতা সকলেরই প্রিয় খেলা হইয়া উঠিয়াছে। তবে একটা কথা মনে রাখিতে হইবে যে পৃথিবীর পরিবেশ ও পরিস্থিতি বদলের সঙ্গে সঙ্গে ক্রিকেটের মৌলিক চরিত্রেরও বেশ বদল হইয়াছে। আজ হইতে একশত বৎসর পূর্বে ক্রিকেট ছিল নিছক চিত্ত বিনোদনের খেলা কিন্তু সেই ক্রিকেট আজ হইয়াছে পেশাভিত্তিক জীবনের খেলা। আর তাহার সঙ্গে সঙ্গে কালের বিবর্তনের পরিবর্তন আসিয়াছে ক্রিকেট খেলার আইনের মধ্যেও। – 

ক্রিকেট খেলার সরঞ্জাম ও ক্রীড়া নীতি : ক্রিকেট খেলার বিশেষ সরঞ্জাম হইল একজোড়া ব্যাট, ছয়টি স্টাম্প, একটি বল ও দুইটি বেঙ্গল। একটি বৃত্তাকার মাঠের মধ্যস্থলে বাইশ গজ জমিতে এক পীচকে ব্যবহার করিয়া ক্রিকেট খেলা হয়। পীচের উভয় প্রান্তে

তিনটি করিয়া স্টাম্প বেঈল বন্ধ করিয়া রাখা হয়। এক প্রান্তে স্টাম্পের ব্যাটসম্যান ব্যাটিং করে। অন্যপ্রান্ত হইতে বল করা হয়। দুইজন আম্পিয়ার নীচের দুই প্রান্তে বিচিত্র পোষাক পরিয়া খেলা পরিচালনা করেন। খেলা আরম্ভ হওয়ার প্রথমে টস’-এর মাধ্যমে কোন্ পক্ষ আগে ব্যাট করিবে তাহা স্থির করা হয়। প্রতিপক্ষে ১১ জন করিয়া খেলোয়াড় থাকেন। বোলার একসঙ্গে ছয়টি করিয়া বল করিতে পারে। ছয়টি বল নিক্ষেপ করিবার প্রক্রিয়াকে ‘ওভার’ বলা হয়। উইকেটে ‘বল’ নিক্ষিপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাটসম্যান বল ব্যাটের সাহায্যে মারিয়া ‘রান’ করেন। বল ছোড়ার ভঙ্গি অনুসারে ইহাকে নানা প্রকার নাম দেওয়া হইয়াছে। ফাস্ট, স্পিন, ইনসুইং, আউট সুইং, রিভার্স সুইং, গুগলি, ফুলটাস, বাউন্সার, অফব্রেক, ইয়র্কর, নো বল, ডেড্‌ বল এবং ওয়াইড বল ইত্যাদি। খেলোয়াড়কে ‘আউট করিবার পদ্ধতিকে বলা হয় যথাক্রমে – ক্যাচ আউট, রান আউট, স্টাম্প আউট, বোল্ড আউট, লেগ-বিফোর উইকেট (এল. বি. ডব্লিউ) ইত্যাদি। 

ক্রিকেট খেলার বিশ্বের প্রধান দল এবং খেলোয়াড় : 

দল : ভারত, পাকিস্তান, ইংল্যাণ্ড, অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, কেনিয়া, জিম্বাবোয়ে, নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইণ্ডিয়া, কানাডা, নামিবিয়া, স্কটল্যান্ড, বারমুডা, বাংলাদেশ, হল্যান্ড ইত্যাদি। 

খেলোয়াড় : বিরাট কোহলি, সৌরভ গাঙ্গুলী, সচীন তেন্ডুলকার, মহীন্দর অমরনাথ, কপিলদেব, সুনীল গাভাস্কার, রবি শাস্ত্রী, বীরেন্দ্র সেহবাগ, রাহুল দ্রাবিড়, জাহির খান, অনিল কুলে, যুবরাজ সিং, রোহিত শর্মা, রবীন্দ্র জাডেজা, রবিচন্দ্রন অশ্বিন, মহম্মদ শামি, হরভজন সিং, মহেন্দ্র সিং ধোনি, মুনাফ প্যাটেল, ঈশান্ত শর্মা, অজিঙ্ক রাহানে, ঋদ্ধিমান সাহা ইত্যাদি (ভারত)। 

বিশ্বের অন্যান্যরা হইলেন : ব্যাডম্যান, টনি গ্রেগ, গ্রেগ চ্যাপেল, ভিভিয়ান রিচার্ড, ইমরান খান, ব্রায়ান লারা, ক্লাইভ লয়েড, অর্জুনা রানাতুঙ্গা, এস্ জয়সূর্য, অরবিন্দ ডি- সিলভা, মার্ক ওয়া, এনডি ফ্লাওয়ার, সেইন ওয়ার্ন, সোন পলক প্রমুখ বিখ্যাত খেলোয়াড়গণ । ক্রিকেট জগতে নানা সময়ে বিভিন্ন পরিবর্তন আসিয়াছে। ১৯৬১ সাল হইতে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ বিশ্বকাপ খেলার বা সীমিত ওভারের ক্রিকেট খেলার পূর্বে, ক্রিকেট খেলাগুলি ছিল টেস্ট খেলা। এই খেলাগুলি ছিল পাঁচদিনের খেলা, ঐ সকল খেলায় যদি প্রথম ইনিংসে কোন দলের রান সংখ্যা দ্বিতীয় দলের ‘রান’ সংখ্যা হইতে ২০০ ‘রান’ কম হইত, তবে কম রান করা দলকে ফিলো-অন’ খেলিতে হইত। খেলায় এই ধরনের অবস্থা দেখা দিলে যেই দল ‘ফলো-অন’ খেলিত সেই দলকে বেশ অসম্মানজনক পরিস্থিতির মোকাবিলা করিতে হইত। 

বিশ্বকাপ ক্রিকেট: উৎসাহ, উদ্দীপনা, আনন্দদান ও উন্নত ক্রীড়াশৈলীতে ক্রিকেট খেলা আজকাল জনপ্রিয়তার শ্রেষ্ঠ শিরোপা অর্জন করিতে সক্ষম হইয়াছে। তাই বিশেষ করিয়া সীমিত ওভারের একদিনের ক্রিকেট খেলা অর্থাৎ বিশ্বকাপ ক্রিকেট আজকের

পৃথিবীতে এক বিশেষ স্থান লাভ করিয়াছে। বিশ্ব ক্রিকেট হইল ইনস্ট্যান্ট’ ক্রিকেট। ইহার জন্মও হইয়াছে ইংল্যান্ডের মাটিতেই। একদিনের খেলায় প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দলের ব্যাটিং ও বোলিং এবং জয়-পরাজয় বিশ্বের তামাম ক্রিকেট প্রেমীদের মন জয় করিয়া লইয়াছে। তাই এখন সীমিত ওভারের একদিনের খেলা বিশেষ জনপ্রিয় হইয়া উঠিয়াছে। এই প্রকার খেলায় নিয়ম-কানুনের দিক দিয়া বেশ কিছুটা পরিবর্তনও আনা হইয়াছে। বর্তমানে ‘রান’ আউট নামে বিতর্কিত আউট থার্ড আম্পায়ার টেলিভিশনের পর্দা হইতে ধীর গতিতে লক্ষ্য করিয়া আউট দিয়া থাকেন। থার্ড আম্পায়ার প্রথাটি সম্ভবত ১৯৮৭-র বিশ্বকাপ ক্রিকেট হইতে চালু হইয়াছে। 

বিশ্বকাপ ক্রিকেট বা ‘গ্রুডেনসিয়াল কাপ’ ক্রিকেটের শুরু হইয়াছিল ১৯৭৫ সালে। চার বৎসর অন্তর অন্তর এই ক্রিকেটের আসর বসে। প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হইয়াছিল ইংল্যান্ডে। এই খেলায় বিজয়ী হয় ‘ওয়েষ্ট ইন্ডিজ’ দল। অস্ট্রেলিয়ার সহিত এই ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হইয়াছিল। ১৯৭৯ সালের বিশ্বকাপ ইংল্যান্ড দলকে হারাই পুনরায় ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজ’ দল বিজয়ী হয়। ১৯৮৩ সালের তৃতীয় বিশ্বকাপ জয় লাভ করিয়াছিল, দুই দুইবার বিশ্বকাপ বিজয়ের স্বর্ণমুকুট পরিয়া যে ‘ওয়েষ্ট-ইন্ডিজ দল খেলিতে নামিয়াছিল তাহাকে হারাইয়া ‘ভারতীয় দল’। ভারতের প্রিয় ও যোগ্য খেলোয়াড় কপিলদেবের অধিনায়কত্বে ‘ওয়েষ্ট-ইন্ডিজ’ দলকে হারাইয়া জয়ের গৌরব অর্জন করিয়াছিল ‘ভারত’। ১৯৮৭ সালের বিশ্বকাপের প্রতিযোগিতার পরিচালনার যৌথ দায়িত্ব পাইয়াছিল ভারত ও পাকিস্তান। এই খেলার চেয়ারম্যান নিযুক্ত হইয়াছিলেন এন. কে. পি. সাভে। এই খেলার স্পনসর’ করিয়াছিল ভারতের এক বিখ্যাত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান “রিলায়েন্স গ্রুপ” তাই এই বিশ্বকাপ ‘রিলায়েন্স ওয়ার্ল্ড কাপ’ বলিয়া চিহ্নিত হইয়াছে। ১৯৮৭-র বিশ্বকাপ খেলা হইয়াছিল পঞ্চাশ ওভারের ভিত্তিতে। ইহার পূর্বে বিশ্বকাপগুলি হইয়াছিল নির্ধারিত ষাট (৬০) ওভারের ভিত্তিতে। টেলিভিশন কোম্পানীর সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করিয়া খেলাগুলি ৫০ ওভারে সীমায়িত করা হইয়াছিল। ১৯৮৭ সালের বিশ্বকাপ বিজয়ী হইয়াছিল ইংল্যান্ডকে হারাইয়া ‘অস্ট্রেলিয়া’ দল। 

১৯৯২ সালের পঞ্চম বিশ্বকাপ পায় আমাদের প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান। ঐ খেলায় তাহারা ইংল্যান্ড দলকে হারায়। ১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপের উদ্যোক্তা ছিল যৌথভাবে ভারত-পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। ঐ খেলায় অস্ট্রেলিয়া দলকে হারাইয়া শ্রীলঙ্কা দল বিজয় মুকুট লাভ করিয়াছিল। সপ্তম বিশ্বকাপ পাকিস্তানকে হারাইয়া অস্ট্রেলিয়া দল লাভ করিয়াছিল। ১৯৯৯ সালে। অষ্টম বিশ্বকাপ ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়া ও ভারত ফাইনাল খেলায় অবতীর্ণ হইয়াছিল। সাউথ আফ্রিকার জোহান্সবার্গে ফাইনাল খেলায় ভারতকে হারাইয়া অস্ট্রেলিয়া দল বিজয়ীদলের সম্মানজনক মুকুট লাভ করিয়াছে। এই নিয়ে তিনবার বিজয় মুকুট অর্জন করিল এই অস্ট্রেলিয়া। ২০০৭ সালে নবম বিশ্বকাপ অস্ট্রেলিয়া বিজয়ী হইয়াছে। ২০১১ সালে বিশ্বকাপে শ্রীলংকাকে পরাজিত করিয়া ভারত বিজয়ী হইয়াছিল। ২০১৫ সালে একাদশ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া নিউজিল্যাণ্ডকে পরাজিত করিয়া বিজয়ী হইয়াছিল ।

অতএব গ্রন্থাগার যেমন প্রয়োজন গ্রন্থপাঠও তেমনি প্রয়োজন। উভয়ই উভয়ের পরিপূরক। মানবজীবনে অধিকার ও কর্তব্য যেমন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত তেমনি গ্রন্থাগার ও গ্রন্থপাঠ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। প্রত্যেক মানুষের উভয়ের বিষয়ে সবিশেষ আগ্রহী হওয়া উচিত। কারণ গ্রন্থাগার ও গ্রন্থপাঠে মানুষ আগ্রহী হইলে দেশ উন্নত দেশে রূপান্তরিত হইবে, জনসাধারণও উন্নত মানের হইবে। ইহাদের ধ্বংসে দেশ, জাতি মানব সভ্যতা ধ্বংস হইবে। 

২৩। মাদার টেরেসা অথবা, মহীয়সী মহিলা 

সূচনা : ‘জীবন যখন শুকায়ে যায়, করুণাধারায় এসো’—রবীন্দ্রনাথ। বিংশ শতাব্দীর দয়াহীন, ভালোবাসাহীন বিশুষ্ক মরু প্রান্তরে যিনি মূর্তিমতী স্নিগ্ধশীতল করুণাধারার মতো নামিয়া আসিয়া পৃথিবীকে সুন্দর করিয়া তুলিযাছেন তিনি সর্বজন বন্দনীয় মাদার টেরেসা। তিনি নিরাশ্রয়কে দিলেন আশ্রয়, রোগার্তকে দিলেন ঔষধপথা ও সেবা, আশাহীনকে দিলেন আশা এবং অবহেলিত মুমূর্ষু রোগীকে নিলেন সম্মানজনক মৃত্যুর অধিকার। 

জন্ম : ১৯১০ খ্রিস্টাব্দের ২৭শে আগস্ট যুগোশাভিয়ার স্কোপজে শহরের এক অ্যালবেনীয় দম্পতির ঘরে মাদার টেরেসা জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। তাহার বাল্যকালের নাম ছিল অ্যাগনেস গংরা বোজাক্সিউ। 

মানবতার ডাক : কিশোরী অ্যাগনেস্ শুনিয়াছিলেন আর্তমানুষের ক্রন্দনধ্বনি। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে ঘর ছাড়িয়া বিশ্বের আর্ত-পীড়িত দীন-দুঃখীদের সেবায় নিজেকে নিবেদন করিলেন। কলকাতা হইল তাঁহার সাধনার কেন্দ্রস্থল। 

কর্মজীবন : সেন্ট মার্গারেট স্কুলের ভূগোল শিক্ষয়িত্রী কেবল শিক্ষাদান ব্ৰতেই নিজেকে তৃপ্ত করিতে পারেন নাই। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে ১০ই সেপ্টেম্বর দার্জিলিং যাইবার পথে তিনি সহসা শুনিতে পাইলেন বিশ্বের লক্ষ কোটি ক্ষুধার্ত, অসহায় শিশুর কাতর আহ্বান। নীলপাড়ের সাদা সুতীর শাড়ি পরিধান করিয়া তিনি জীবনের মহাব্রত উদযাপনে দুঃখের মহাসমুদ্রে ঝাঁপাইয়া পড়িলেন। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে গঠিত হইল মিশনারিজ অব চ্যারিটি। ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে কালীঘাে স্থাপিত হইল ‘নির্মল হৃদয়।’ যেখানে অসহায় মুমূর্ষু মানুষ পাইয়াছে করুণাময়ীর স্নেহচ্ছায়। তাহারা পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও সেই মৃত্যু হইয়াছে প্রীতিস্নিগ্ধ। অনাথ শিশুদের জন্য স্থাপন করিয়াছেন “নির্মল শিশু ভবন” যেখান থেকে তারা ফিরিয়া পাইয়াছে জীবনের আলো। শুধু কলকাতা বা ভারতবর্ষেই নয় সর্বত্র তিনি তাঁহার কর্মজাল বিস্তৃত করিয়াছেন। পৃথিবীতে যার কেউ নেই, কিছু নেই তাহার জন্য ছিলেন মাদার টেরেসা। সমাজস্বজন পরিত্যক্ত কুষ্ঠরোগীদের জীবনে শান্তির বারি সিক্ষিত করিয়াছেন। স্নেহ-মমতা ও মানবিকতা মণ্ডিত হাদয় লইয়া দুহাত বাড়াইয়া তিনি তাহাদের আহ্বান করিতেন “এসো এসো, আমার ঘরে এসো”। তিনি বলিতেন, ঘৃণা নয় সেবা, ভালোবাসা একজন কুষ্ঠরোগীকেও সুস্থ জীবনের কূলে ফিরিয়া নিয়ে এসে সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত করিতে পারে। “Touch a leaper, touch him with love.” এখানেই স্নেহময়ী জননীর স্নেহের সীমাহীনতা।

স্বীকৃতি পরিশ্রম কখনই বিফলে যায় না মানার টেরিসার জীবনে একথা চরণ সভ্য হইয়াছিল। বন্ধের দিক-দিগন্ত থেকে এলো তাহার শুভকর্মের স্বীকৃতি। অবশ্য মানার টেরেসা নাম বা যশের জন্য কাজ করেননি। অন্তরের তাগিদে দুঃস্থ, অসহায়ের পাশে দাঁড়াইয়া অক্লান্ত সেবা করিয়া আত্মতৃপ্তি পাইয়াছেন। ভারত সরকার তাহার কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ “পদ্মশ্রী” উপাধিতে ভূষিত করিয়াছেন। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে তিনি পাইয়াছেন “পোপ ত্রয়োবিংশ শান্তি পুরস্কার।” “গুড সামারিটান পুরস্কার”, “কেনেডি আন্তজার্তিক শান্তি পুরস্কার”, “ডক্টর অব হিউম্যান লেটার্স” উপাধিতেও তিনি ভূষিত হইয়াছেন। ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে তিনি পাইয়াছেন “নেহক পুরস্কার”। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি পাইলেন “টেম্পেলটন ফাউণ্ডেশন প্রাইজ ফর ইন্টারন্যাশনাল আণ্ডারস্ট্যান্ডিং।” ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে পেলেন “নোবেল পুরস্কার”। ১৯৮০ সালে ভারত সরকার তাঁহাকে ভূষিত করেন “ভারত রত্ন” উপাধিতে। 

উপসংহার : আজ বিংশ শতাব্দীর অপরাহ্নে মানবতার দিক থেকে মানুষ যে সম্পূর্ণ দেউলিয়া হইয়া যায়নি মাদার টেরেসা তাই প্রমাণ করিলেন। ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দের ৫ই সেপ্টেম্বর সমস্ত বিশ্বকে মাতৃহারা করিয়া মাদার টেরেসা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সমস্ত জীবনের অক্লান্ত পরিশ্রম শেষে “আমি আর নিঃশ্বাস নিতে পারছি না” বলেই মাদার টেরেসা চিরশান্তি। কোলে ঢলিয়া পড়িলেন। চোখের জলে সারা বিশ্বমানবের কন্ঠের হাহাকারধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে। 

“অনাথ করিলে তুমি মোদের হে বিশ্বজননী।” 

২৪। ছাত্রজীবন ) 

বিদ্যালয়ের প্রবেশ মুহূর্ত হইতে শিক্ষা সমাপ্তি পর্যন্ত জীবনের যে সময় বায়িত হয় তাহাই ছাত্রজীবনের সংজ্ঞা। শৈশব কালই মানবজীবনে প্রবেশের সিংহদ্বার। জীবনের এই পরম লগ্নের যথোপযুক্ত ব্যবহার করিলে মনুষ্যত্বের অধিকারী হইতে পারা যায়। “ছাত্রানাং অধ্যয়নং তপঃ।” অধ্যয়নই ছাত্রের তপস্যা। মানব জীবনে সোনা ফলাইতে হইলে ছাত্রজীবন হইতে গভীর অধ্যয়নের প্রয়োজন। “পাঁচজন পারে যাহা, আমিও পারিব তাহা” এই প্রত্যয় ছাত্রের অন্তরে নিহিত থাকিতে হইবে। মানব জীবনের সকল পাঠই এই সময়ে গ্রহণ করিতে হয়। জীবন যুদ্ধের সৈনিক সকলে। এই জীবন যুদ্ধে বিজয়ী হইতে হইলে পাঠ্যপুস্তক ছাড়াও সমাজ, পরিবেশ ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করিতে হইবে। প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জনের প্রস্তুতি কাল ছাত্রজীবন। মাটি যখন নরম থাকে তখন তাহা দ্বারা যাহা খুশী তৈয়ারি করা যায় সেইরূপ ছাত্রজীবনে সাংসারিক মালিনাযুক্ত হৃদয়পটি কুসুম-কোমল থাকে বলিয়া যে কোন পাঠ অক্লেশে গ্রহণ করিতে পারা যায়। 

শৃঙ্খলাবোধ : প্রতিটি কর্মের মধ্যে আছে একটি সুশৃঙ্খল ধারাক্রম, যার নাম ছন্দ। সেই ছন্দই শৃঙ্খলা, সেই ছন্দই সাফল্যের চাবিকাঠি। শৃঙ্খলাবোধ ও নিয়মানুবর্তিতা ব্যতিরেকে জীবনের বিকাশ হওয়া সম্ভব নয়। ভারতের বৈদিক সমাজ ছাত্র-জীবনে কঠোর ব্রহ্মচর্য পালনের নির্দেশ নিয়াছিল। ছাত্রদের প্রতিটি কর্মই নিয়মানুবর্তিতা মানিয়া চলিতে হয়। শিষ্টাচার, সাধুতা, নম্রতা, কর্তব্যপরায়ণতা, ভক্তি পরায়ণতা ছাত্রদের এক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। কেবলমাত্র উচ্চশিক্ষাই মানুষকে প্রকৃত মানুষরূপে পরিগণিত করিতে পারে না যদি তাহার চরিত্রে এই গুণাবলীর অভাব দেখা যায়। পিতামাতার আশা-আকাঙ্খা পূর্ণ করিবার জন্য এই সময় হইতেই সচেষ্ট থাকিতে হয়। গৃহে পিতা-মাতা ও বিদ্যালয়ে শিক্ষক ছাত্রগণের প্রকৃত হিতৈষী, বিশাল পৃথিবীতে নিজের স্থান নির্ণয়ে তাহারা যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। শ্রদ্ধা, ভক্তি, বিনম্র ব্যবহার ছাত্রকে উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করিতে সাহায্য করে। কিশোর ছাত্রের নমনীয় মনোভূমিতে এই সব গুণ একবার মুদ্রিত হইলে আমৃত্যু তার চরিত্র মাধুর্য সর্বপ্রভায়ী থাকিবে। 

ছাত্রগণ সমাজেরই অঙ্গ। সুতরাং সমাজের প্রতিও তাদের দায়বদ্ধতা থাকা উচিত। অধ্যবসায়ের সাথে সাথে সাধ্যানুসারে দুর্গতদের সেবায় ঝাঁপাইয়া পড়া উচিত। ভবিষ্যৎ জীবনে ছাত্র যখন বিস্তৃততর কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করিবে এই মানবহিতৈষিতাই তাহাকে বৃহত্তর কল্যাণ কর্মে প্রেরণা দিবে। 

“ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুদের অন্তরে।” আজকের ছাত্র ভবিষ্যতে নাগরিক। তাহারা রাষ্ট্রনেতা হইবে, আদর্শবান শিক্ষক হইবে, রণক্ষেত্রে দাড়াইয়া বজ্রকণ্ঠে সৈন্য পরিচালনা করিবে, ছাত্রদের এই সুপ্তি মগ্ন চৈতন্য সযত্ন প্রয়াসে জাগ্রত করিতে হইবে। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া ছাত্রের কেবলমাত্র মুখ্য উদ্দেশ্য নয়, শুভ লক্ষে পৌঁছাইবার একটি উপায় মাত্র। পুঁথিগত শিক্ষা লাভের সহিত জীবনের অন্যান্য পাঠগুলি আয়ত্ত করিতে না পারিলে সুপ্তি ভঙ্গ হয় না, জীবন সার্থক ও সুন্দর হইয়া উঠে না। 

ছাত্র জীবনই হইল ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য নিজেকে সুযোগ্য করিয়া গড়িয়া তোলার প্রকৃষ্ট সময়, দায়িত্ববোধের বিকাশের কাল, সামাজিক কতর্ব্যবোধে দীক্ষিত হইবার পরম লগ্ন। তাই ছাত্রদের একথা মনে রাখা উচিত যে, “জীবনের পরম লগন, কোরনা হেলা”

২৫। বইমেলা 

সূচনা : মেলা কথাটির আক্ষরিক অর্থ হইল ‘মিলন’। মেলার কয়েকটি মৌলিক দিক রহিয়াছে; যেমন—মানসিক মিলন, সামাজিক মিলন ও অর্থনৈতিক মিলন। আর বইমেলা প্রকৃতপক্ষে সংস্কৃতির ভাব বিনিময়ের মিলনকেন্দ্র। মানসিক দিক হইল ভাব-চিন্তা ও আদর্শের লেনদেন। মেলার সামাজিক দিক হইল পরস্পরের সহিত সম্মিলন ও সৌহার্দ্যের আবাহন। ইহার অর্থনৈতিক দিক হইল গ্রামীণ পণ্যসম্ভার ক্রয়-বিক্রয়। ভারতবর্ষে অতি প্রাচীন কাল হইতেই এই সকল মেলার আয়োজন বিভিন্ন উদ্দেশ্যে আয়োজিত হইয়াছে। বিভিন্ন স্তরের মানুষের ভাবের আদান-প্রদান, সামাজিক উৎকর্ষ, মানস-প্রকর্ষ ও স্থায়ী বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপনের প্রকৃষ্ট উপায়ই হইল মেলা। মেলা অনেক প্রকারের হয়; যেমন— পৌষ মেলা, শিল্প মেলা, কৃষি মেলা, বাণিজ্য মেলা, চড়কের মেলা, রাাযাত্রার মেলা; কিন্তু বইমেলার আবেদন একটু অন্য স্বাদের। এখানে লেখক, সাহিত্যিক, পাঠক, ছোট ছোট শিশু- কিশোর; তাদের মনের বিভিন্ন দিকের খোরাক মিটাইতে বইমেলায় আসে। এখানে প্রকৃতপক্ষে সংস্কৃতির ভাব বিনিময় হয়। এখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দিকের জ্ঞান ভাণ্ডারের পরিচয় মিলে। বইমেলা আধুনিক কালের জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনুশীলনের জ্ঞানপীঠ। 

উদ্ভব : যতদূর জানা যায় বইমেলা প্রথম শুরু হয় ১৮০২ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে। এই বইমেলার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন ম্যাথু কেরী নামে এক ব্যক্তি। ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে ১০০ জন প্রকাশক মিলিয়া নিউইয়র্কের লিস্টন শহরে বিরাট এক বইমেলার আয়োজন করিয়াছিলেন। এই মেলায় প্রায় ত্রিশ হাজার গ্রন্থ প্রদর্শন করা হইয়াছিল। তবে আধুনিক বইমেলার সূচনা হইয়াছিল ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ফ্রাঙ্কফুটের সর্ববৃহৎ বইমেলা হইতেই। তখন হইতেই পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই বইমেলার জোয়ারে মানুষ মাতিয়া উঠিয়াছে। 

ভারতবর্ষে সর্বপ্রথম বইমেলার সূত্রপাত হয় ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে কলিকাতায়। এই মেলার মাধ্যমে বাঙালী জাতি বঙ্গ সংস্কৃতির সম্মিলনের অঙ্গ হিসাবে পশ্চিমবঙ্গের জ্ঞানপিপাসু ও গ্রন্থপ্রেমী মানুষকে ভাব বিনিময়ের মিলনতীর্থে আনিয়া জড়ো করিয়াছিলেন। ১৯৬৯ সালে বোম্বাই (বর্তমানে মুম্বাই) শহরে প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ বইমেলার আয়োজন করা হইয়াছিল। এর পর প্রথম বিশ্ব বইমেলার উদ্বোধন হয় দিল্লিতে ১৯৭৪ সালে। পরবর্তী সময়ে ভারতের রাজধানী দিল্লীতে বইমেলা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের রূপ লয়। ১৯৭৫ সালে Publicers and Book Sellers ‘গিল্ড’ নামে এক সংস্থার উদ্যোগে কলকাতায় প্রতিবৎসর জানুয়ারী মাসে শীতের মরশুমে বইমেলা হয়। 

গৌহাটিতে প্রতিবছর সর্বভারতীয় পর্যায়ে দুইখানি বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। আসামের প্রতি জিলাতে স্থানীয় উদ্যোগে বইমেলা আয়োজিত হয়। 

প্রয়োজনীয়তা : বইমেলা সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মনের ‘মিলন’ মেলা। এই মেলাতেই একমাত্র দেখা যায় ধনী-দরিদ্র একই সঙ্গে নানাপ্রকার বইয়ের খোঁজে অভিভাবকেরা ছেলেমেয়ে লইয়া স্টলে স্টলে ঘুরিয়া বেড়ায়। প্রতিটি স্টলের সাজসজ্জা ও বৈচিত্র্যের অভাব নাই। প্রতিটি স্টলেই সাজানো থাকে নানা প্রকারের দেশ-বিদেশের বই। প্রতিটি বই পাঠককে অলক্ষ্যে অদৃশ্য হাতছানিতে কাছে টানিয়া লইতে চায়। সাজাইয়া রাখা বইগুলির সামনে দাঁড়াইয়া যেন মনে হয়, যদি সম্ভব হইত তবে সবগুলি বই কিনিয়া লইয়া বাড়ি চলিয়া যাইতাম। বইমেলাতে শুধু পাঠকই নয়, সেইখানে উপস্থিত থাকেন লেখক-লেখিকা, নানা বিষয়ের জ্ঞানীগুণী শিল্পীগণ। আর ছোটদের ভিড়ে তো বইমেলা খুবই জমিয়া উঠে। বই মেলায় আসেন বই পাগল পাঠক, আসেন লেখক, আসেন প্রকাশক, ছোট দেওয়াল পত্রিকার লেখব। তাই পাঠক, লেখক ও প্রকাশকের ত্রিবেনি সংগম হইল বই মেলা। সবাই যে বই কেনেন তাহা নহে, নতুন নতুন বইয়ের সাথে পরিচিত হইয়া উঠেন। এক কথায় বইমেলা আনিয়া দেয় এক আনন্দ ধারা। স্টলে স্টলে ঘুরে বই কেনার মধ্যে থাকে এক নিকিনির স্বাদ এক ভিন্ন আস্বাদন। – 

আমাদের জাতীয় জীবনে এবং সমাজ জীবনে বইমেলার প্রয়োজনীয়তা বলিয়া শেষ করা যাইবে না। মানুষের মনের খোরার অনুযায়ী বইমেলা বই নির্বাচনের এক আদর্শ স্থান। শুধু গল্প-উপন্যাস-এ্যাড়ভেঞ্চারই নাহ, বিভিন্ন ধরনের ভ্রমণ কাহিনী, বিজ্ঞান-ভিত্তিক রচনা, চিত্রাক্ষনের বই, ফটোগ্রাফ, ইধি নিয়ারিং বই ইত্যাদি সকল ধরনের বই-ই বইমেলায় পাওয়া যায়। 

উপসংহারঃ গজকাল বইমেলা আধুনিক জীবনযাত্রার অপরিহার্য অঙ্গ হইয়া পড়িয়াছে। এই বইমেলা বর্তমানে প্রকাশকদের ব্যক্তিগত উদ্যোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হইয়া পড়িয়াছে। ফলে ইহার মাধ্যমে ব্যাপক লোকশিক্ষার সম্প্রচারের দিকটি অবহেলিত হইতেছে। এই বইমেলাকে সরকারী উদ্যোগে ছড়াইয়া দিতে হইবে দূর হইতে দূরতম প্রান্তে। সাধারণ মানুষের জন্য সুলভ মূল্যে বই বিক্রির ব্যবস্থা রাখিতে হইবে। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে বইমেলার উদ্দেশ্য ছড়াইয়া দিতে পারিলে ইহার সর্বাঙ্গীন বিকাশ সম্ভব হইবে। 

২৬। বন্যা

অতি প্লাবনেই বন্যা। অনেক সময় অতিবৃষ্টির ফলে নদী-নালার জলপ্রবাহ বৃদ্ধি পাইয়া বন্যা সৃষ্টি করে। জলের অপর নাম জীবন। জল যখন তার পরিমিতির সীমা অতিক্রম করে। মানুষের একমাত্র আশ্রয়স্থলের দিকে উগ্র বাঁধনহারা জলপ্রবাহকে বন্যা নামে অভিহিত করা হয়। অঃ তিরোধ্য জলপ্লাবনের আঘাতে মানুষের বাসগৃহ – দরিদ্রের পর্ণকুটীর, ধনীদের সুরমা – অট্টালিকা ভাঙ্গিয়া পড়ে। 

বন্যার সর্বনাশা পরিণাম অবর্ণনীয়। একদিকে বন্যা মানুষ-পশু-পক্ষী নির্বিশেষে সকল প্রাণীকে মৃত্যুর দিকে টানিয়া লয়। অন্যদিকে শস্যক্ষেত্র, গোচারণভূমি প্লাবিত করিয়া অপার জলের দিগন্ত বিস্তৃত রুদ্রনৃত্য চালায়। যতদূর দৃষ্টি যায় শুধুমাত্র দেখা যায় জল আর জল। নদীবহুল ভারতীয় জীবনে বন্যা যেন প্রায়ই নিয়মিত ঘটনা। প্রায় প্রতি বৎসরই আসামের বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যা কবলিত হয়। ইহার কারণ মৌসুমী বৃষ্টির প্রভাব। 

সময়ের নিদৃষ্ট অস্তে ধীরে ধীরে জলপ্লাবন স্তিমিত হইয়া আসে। বন্যার বেগ প্রশমিত হয়। ধ্বংসস্তূপের অন্তরাল হইতে জীবন পুনরায় অজেয় প্রাণশক্তিতে আত্মপ্রকাশ করে। জীবনের কোন দুঃখ চিরস্থায়ী নহে। শতাব্দী কালের শ্রমে নির্মিত জনপদ বাসযোগ্য করিয়া তুলিতে অনেক সময় কাটিয়া যায়। খুবই ধীরে ধীরে মৃত্যুর ধ্বংসস্তূপ হইতে জীবনের অঙ্কুর পাখা মেলে। 

পঞ্চবার্ষিক নদী নিয়ন্ত্রণ, সেচ খাল ও বাঁধ তৈরী করিয়া যথাযথভাবে বন্যাকে নিয়ন্ত্রণ করা যাইতেছে। ভারত সরকার বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য নদী পরিকল্পনা হাতে লইয়াছেন। এই পৃথিবীর কোন কিছুই বোধ হয় মানুষের অবিমিশ্র ক্ষতিসাধন করে না, অশুভের মধ্যেও কিছু অংশে ঈশ্বরের শুভেচ্ছা মানুষের জন্য বর্ষিত হয়। তাই বন্যা বিদায়ের সময় কিছু কল্যাণের বীজ উপ্ত করিয়া নিয়া যায়। বন্যাপ্লাবিত ভূমি পলিমাটি সঞ্চিত হই। পরবর্তী আবাদে শস্য উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি করে। তাই বন্যা মানব জীবনের পক্ষে কিছু পরিমাণে শুভঙ্করীও হয়। 

২৭। মানব কল্যাণে বিজ্ঞান 

আদিমকালে মানুষ প্রকৃতিকে ঈশ্বর বলিয়া মানিত, অসাধ্য সকল কিছুতেই তাহারা ঈশ্বরের অস্তিত্ব অনুভব করিত। পরবর্তীকালে ‘বাইবেল’, ‘বেদ’ প্রভৃতি ধর্মগ্রন্থ তাহাদের নিয়ন্ত্রণ করিতে লাগিল। বৈজ্ঞানিক কোন আবিষ্কারকে সেই যুগের মানুষ সর্বান্তঃকরণে গ্রহণ করে নাই; যাহার ফলে গালিলিও, সক্রেটিসের মতো বিজ্ঞানীকেও শাস্তি পাইতে হইয়াছিল। কিন্তু বিজ্ঞানের বিজয়-যাত্রার ফলে অসহায় মানুষ আজ অসীম শক্তিধর মানুষে রূপান্তরিত হইয়াছে। 

আগুন ও লৌহ আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে হইয়াছে বিজ্ঞানের জয়যাত্রার ভিত্তি। তারপর মানুষ একে একে অনেককিছুই আবিষ্কার করিয়াছে। আজ বিংশ শতাব্দীর শেষপাদের মানুষ সমগ্র পৃথিবীকে, এমনকি, মহাকাশকেও করায়ত্ত করিয়াছে। প্রতিনিয়ত চলিয়াছে ইহার সাধনা, আবিষ্কৃত হইতেছে নূতন নূতন দিগন্ত। 

বিজ্ঞান মানব কল্যাণে ব্যবহৃত হওয়ার জন্যই আবিষ্কৃত হয়। আদিম মানব মেঘ ও বিদ্যুতকে দেখিয়া ভয় পাইত। কিন্তু একদিন মানুষ সেই মেঘ ও বিদ্যুতকে বশীভূত করিয়া আপন কল্যাণে নিয়োজিত করিয়াছে। খরস্রোতা নদীকে বশীভূত করিয়া উষর মরুপ্রান্তরকে মানুষ ফসলক্ষেত্র করিতেছে। বিজ্ঞানের বলে দূর হইয়াছে আজ নিকট, অদৃশ্য অনেক কিছু হইয়াছে আজ দৃশ্য ও কর্মক্ষম। আণবিক তথা পারমাণবিক শক্তিকে আপন ইচ্ছানুযায়ী মানুষ ব্যবহার করিতে শিখিয়াছে। দূরারোগ্য ব্যাধি নির্ণয়ে ও নিরাময়ে আবিষ্কৃত হইয়াছে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি তথা জীবনদায়ী ঔষধপত্র। শব্দ হইতেও দ্রুতগামী বিমানে চড়িয়া মানুষ আজ মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবী ঘুরিয়া আসিতে পারে। দূরদর্শনের মাধ্যমে ঘরে বসিয়াই মানুষ পৃথিবী তথা মহাকাশের যাবতীয় দ্রষ্টব্য অবলীলাক্রমে দেখিতে পাইতেছে। বহু দূরদেশে বসবাসকারী আত্মীয় বন্ধু-বান্ধরের সহিত টেলিযোগাযোগের মাধ্যমে ঘরে বসিয়া বাক্যালাপ করিতে পারিতেছে। মুদ্রণযন্ত্রের উদ্ভাবনের ফলে শিক্ষা ও জ্ঞান আজ স্থান-কাল অতিক্রম করিয়া পৃথিবীর যাবতীয় মানুষের মধ্যে নৈকট্যের সেতু রচনা করিয়া চলিয়াছে। মানব কল্যাণে বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত যন্ত্রাদির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হইল বৈদ্যুতিক ও বাষ্পীয় যন্ত্রপাতি, বিভিন্ন যান, রেডিও, টেলিভিশন, সিনেমা, ফ্রীজ, উনান, টেলিফোন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র, রোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, মুদ্রণ যন্ত্র, কম্পিউটার ইত্যাদি। 

কিন্তু বিজ্ঞানের দানবীয় শক্তিও কম ভয়ঙ্কর নয়। মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীদের বাঁচাইয়া রাখিবার জন্য একদিকে যেমন আবিষ্কৃত হইয়াছে জীবনদায়ী ঔষধপত্রাদি অপরদিকে প্রাণিজগতকে ধ্বংস করিবার জন্য সৃষ্টি হইয়াছে বিভিন্ন মারণাস্ত্র। মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীকে ধ্বংস করিয়া দেওয়ার মত পারমাণবিক অস্ত্র পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশের হাতে রহিয়াছে। বিজ্ঞানকে কেবল কল্যাণের জন্য ব্যবহার করিতে পারলেই জগতের মঙ্গল ।

২৮। সভ্যতার অগ্রগতিতে বিজ্ঞানের ভূমিকা] 

বুদ্ধি ও মননের শক্তিতে মানুষ অনন্য। মানুষ যাবতীয় অগনন প্রাণীকে অতিক্রম করিয়া মনে তাহাদের বুদ্ধি প্রাচুর্যে দেহসব্রস্ব পশুর “সংকীর্ণ স্থবিব জীবন-যাপনের অভিশাপ হইতে মুক্তি দিয়াছে”। মানুষ যাহা পাইয়াছে শুধু তাহাতেই সে তৃপ্ত নহে। সে আরও পাইতে চায়, জানিতে চায়। তাহাদের অপূর্ণ অভীলায় মানুষকে আরো বেশি করিয়া কর্মচঞ্চল রাখিয়াছে। ক্রমে ক্রমে। মানুষ প্রকৃতির দাসত্ব হইতে মুক্ত হইয়া তাহাদের জীবন নির্বাহের প্রতিটি উপকরণ তাহার জ্ঞান ও বুদ্ধি বলে সংগ্রহ করিয়া প্রকৃতির সর্বাঙ্গে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের স্বাক্ষর রাখিয়াছে। মানুষের কর্মধারা সভ্যতার রথচক্রকে বিজ্ঞান মানব মনীষার অবদান রূপে সভ্যতাকে চিহ্নিত করিয়াছে। 

বিজ্ঞানের যুগ স্বভাবতঃ ই বুদ্ধি বৃত্তির স্বাধীন বিকাশ ও অনুশীলনের যুগ। কোন দেশই বিজ্ঞানের প্রথম আবির্ভাব সাদর অভ্যর্থনা লাভ করিতে পারে নাই। মানুষ যেদিন জীবনকে সুস্থ স্বাভাবিক সংস্কার মুক্ত দৃষ্টিতে দেখিতে পারিয়াছে, সেই দিন হইতেই বিজ্ঞানের অবাধ জয়যাত্রা শুরু হইয়াছে। আগুন, লৌহ এবং চাকার আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গেই বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপিত হইয়াছে। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীতে প্রবেশ করিয়া মানব সভ্যতা একের পরা এক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার সমৃদ্ধ হইতে থাকে। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার গুলি মানুষের কৌতূহলকে কেন্দ্র করিয়া আবির্ভূত হয়। একটির সন্ধান করিতে গিয়া অন্য কোনো অজানা অভাবিত তত্ত্ব আসিয়া ধরা দেয়। ইহাতেই বহু প্রয়োজনীয় তথ্য ও তত্ত্ব আবিষ্কৃত হয়। এইভাবেই হৃদয় ও বুদ্ধির মিলনে। মানবের সভ্যতার বিকাশ ঘটিয়া চলিয়াছে। আধুনিক জগৎ যে শিক্ষার আলোক ও প্রসারে পূর্বাপেক্ষা অধিক সফল হইয়াছে তাহার মূলে রহিয়াছে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার। জীবনের সর্বতোমুখী উন্নতি আধুনিক মানব সভ্যতার বৈশিষ্ট্য। তাহার মূলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানের ভূমিকা সক্রিয় হইয়া আছে। মানব সভ্যতার ইতিহাস মানুষের সংগ্রামী প্রয়াসেরই ইতিহাস। বৈজ্ঞানিক চেতনার উন্মেষই মানুষকে মোহমুক্ত বুদ্ধি ও পূর্ব সংস্কারহীন দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনে সহায়তা করিয়া মানবধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছে। মানব সভ্যতার অগ্রগতিতে বিজ্ঞানের অমূল্য চেতনা শ্রদ্ধাসহকারে। স্বীকার করিয়াও বলিতে হয় যে, বর্তমান যুগের সভ্য মানুষ সর্বাঙ্গে বিজ্ঞানের কল্যাণ চিহ্ন ধারণ। করিয়াও যেন অন্তরে কিন্তু আদিম যুগের পাশবিক হিংসাকে এখনও লালন করিতেছে। 

যে জ্ঞান ব্যবহারিক জীবনে কাজে লাগে না অথচ তাহার প্রাপ্তিতে মনোলোক সমৃদ্ধ হইতে পারে, আধুনিক বিজ্ঞান তাহার সাধনায় ও অনলস। আধুনিক বিজ্ঞানে বিশ্বসৃষ্টি, নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস, দিবারাত্রির আবির্ভাব-তিরোভাব গ্রহ-নক্ষত্রের রহস্য, এমন কি গ্রহান্তরে যাত্রার অভিলাষেও। প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। কতগুলি আবিষ্কার বেতার, চলচ্চিত্র, মুদ্রণযন্ত্র প্রভৃতির অবদান উপেক্ষণীয় নয়। আধুনিক সভ্যতার বিজ্ঞান শিক্ষার ক্ষেত্রেও পূর্বাপেক্ষা অধিক সফলতা লাভ করিয়াছে। আধুনিক। বিজ্ঞানের শুভঙ্কর রূপই কেবল সত্য নয়, ইহার সভ্যতার বিকাশেও নানা বিস্ময়কর অবদানে সমৃদ্ধ করিয়াছে।

Chapter
NO.
Contents
সাগর সঙ্গমে নবকুমার
বাংলার নবযুগ
বলাই
অরুণিমা সিন্হা : আত্মবিশ্বাস
ও সাহসের অন্য এক নাম
তোতা কাহিনী
কম্পিউটার কথা, ইন্টারনেট কথকতা
আদরিণী
প্রার্থনা
প্রতিনিধি
১০গ্রাম্যছবি
১১ বিজয়া দশমী
১২ আবার আসিব ফিরে
১৩দ্রুতপঠন : বৈচিত্র্যপূর্ণ অসম
তিওয়া
দেউরী জনগোষ্ঠী
অসমের নেপালী গোর্খা জনগোষ্ঠী
বড়ো জনগোষ্ঠী
মটক জনগোষ্ঠী
মরাণ জনগোষ্ঠী
মিচিং জনগোষ্ঠী
অসমের মণিপুরী জনগোষ্ঠী
রাভাসকল
সোনোয়াল কছারিসকল
হাজংসকল
অসমের নাথযোগীগণ
আদিবাসীসকল
১৪পিতা ও পুত্র
১৫অরণ্য প্রেমিক : লবটুলিয়ার কাহিনী
১৬ জীবন-সংগীত
১৭কাণ্ডারী হুশিয়ার

ভাবসম্প্রসারণ

রচনা

রচনা (Part-2)

২৯। জাতি গঠনে নারী সমাজের ভূমিকা 

জাগো নারী, জাগো বহ্নিশিখা – কাজী নজরুল ইসলাম নারী ও পুরুষের সম্মিলিত জনসংখ্যায় একটি জাতি গঠিত হয়। একটি জাতি তখনই সমৃদ্ধি লাভ করে যখন নারী পুরুষের মধ্যে কোন ভেদাভেদ থাকে না। বিশ্বের উন্নত দেশগুলিই ইহার প্রমাণ । 

বৈদিক যুগের হিন্দুসমাজে নারী মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত ছিল। পরবর্তী সময়ে নারীদের এই সামাজিক মর্যাদা বিভিন্ন কারণে যেরূপ সামাজিক-রাজনৈতিক-বিদেশী আক্রমণ, ধর্মীয় অনুশাসনের ভুল ব্যাখ্যা ইত্যাদির জন্য খর্ব হইতে থাকে। বৈদিক যুগের পরবর্তী সময়ে এবং মধ্যযুগে নারীরা সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অধিকার হইতে বঞ্চিত হয়। নারী সম্পূর্ণভাবে পিতা, স্বামী এবং পুত্রের উপর নির্ভরশীল হইয়া পরে। 

উনিশ শতকে পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে নারীর অবস্থার উন্নতির জন্য বিভিন্ন প্রয়াস আরম্ভ হয়। নারী সমাজ এখন শিক্ষা-দীক্ষা, চাকরি, রাজনৈতিক অঙ্গনেও পুরুষের সমকক্ষতা অর্জন করিয়া আপন আপন যোগ্যতা প্রদর্শন করিতেছে। ঘরের দায়িত্ব ও কর্তব্যও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করিতেছে। সন্তানকে লালন-পালন করিয়া তাহাদের শিক্ষিত, আদর্শবান ও রুচিবান নাগরিক তৈয়ারী করিয়া দেশকে উপহার প্রদান করে। বিখ্যাত ফরাসী যোদ্ধা ও শাসক নেপোলিয়ান বোনাপার্ট বলিয়াছিলেন, “আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি দেব।” এই উক্তি দ্বারাই বুঝা যায় জাতি গঠনে নারীর ভূমিকা কত ব্যাপক ও গুরুত্বপূর্ণ। 

একবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাষা নারী ক্রমশ প্রগতির পথে পুরুষের সহিত বিভিন্ন কর্মযজ্ঞে অংশগ্রহণ করিতেছে। তাহাদের কর্মজগতে পরিধি আজ বিস্তৃত। দশভূজার ন্যায় অবতীর্ণ হইয়া নিষ্ঠা ও যোগ্যতার সহিত কর্মস্থল এবং ঘর-সংসারের কর্তব্য সম্পন্ন করে। পুরুষের সহিত সহযোগিতা না করিলে পৃথিবীতে মানবজাতির অস্তিত্বই বিলীন হইয়া যাইত। জীবনের সর্বস্তরে নারী জাতি শরিক হইয়া জাতিকে উন্নতির পথে লইয়া যাইতেছে। 

রাষ্ট্রসংঘের নির্দেশে ১৯৭৫-১৯৮৪ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক নারীবর্ষরূপে পালিত হইয়াছে। প্রদীপের তলায় যেরূপ অন্ধকার সেইরূপ আজ একবিংশ শতাব্দীতেও সমাজে নারীর মূল্যায়ন সঠিকভাবে হয় না। তাহারা অপরকে আলোকিত করিতে করিতে একসময় নিজেরা নিঃশেষ হইয়া যায়। বৃহত্তর নারী সমাজ আজও অশিক্ষা, অপুষ্টি, শারীরিক নির্যাতন, মানসিক নির্যাতনের শিকার। এত উদ্যোগ গ্রহণের পরও কোথায় যেন ফাঁক থাকে এবং সেই ফাঁকের চোরাপথে নারী নির্যাতন অবাধে চলিতেছে। 

দেশের প্রত্যেক কর্মকাণ্ডে নারী জাতিকে অংশীদার করিয়াই একটি জাতি, একটি দেশ মর্যাদাশীল দেশ বা জাতি হিসাবে বিশ্বে মাথা উঁচু করিয়া দাঁড়াইতে পারে। পরিশেষে কবির ভাষায় বলা যায় “না জাগিলে বুঝি ভারত-ললনা, এ ভারত বুঝি জাগে না, জাগে না।”

৩০। তোমার প্রিয় কৰি 

আমার প্রিয় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাহার কাব্যে ব্যথাহত পাইবে বাথা বিজয়ের প্রেরণা, দার্শনিক পাইবে প্রকৃত সত্যের সন্ধান, মৃত্যুপথযাত্রী পাইবেন মৃত্যুঞ্জয়ী সান্ত্বনা। এক কথায়, রবীন্দ্রনাথ আমাদের সত্ত্বার সহিত জড়াইয়া আছেন। 

ইংরাজি ১৮৬১ সালের ৭ই মে কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে রবীন্দ্রনাথ জন্মগ্রহণ করেন। তেরো বছর বয়সে তাঁহার কাব্য উদ্যানে আরম্ভ হয় কাব্য- কুসুমের বসন্ত উৎসব। যৌবনের প্রথম প্রভাতে তাঁহার হৃদয়ের নিবিড় বেদনায় সংগীতের যে উৎসমুখ খুলিয়া গিয়াছিল, তাহার মর্মর কলতানে ঝংকৃত হইয়া উঠিল সন্ধ্যা সংগীত, প্রভাত সংগীত, ছবি ও গান, কড়ি ও কোমল, ভানুসিংহের পদাবলী, মানসী ও সোনার তরী। চিত্রা, চৈতালী কথা ও কাহিনী, নৈবেদ্য। খেয়ার ফসলে এই সোনার তরী বোঝাই হইল। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে গীতাঞ্জলির ইংরাজি অনুবাদের জন্য তিনি সাহিত্যে লাভ করেন। “নোবেল পুরস্কার” তাহার পর, বলাকা, পলাতকা, পূরবী, মলুয়া, পুনশ্চ, পত্রপুত্র এবং শ্যামলীর ধারা বহিয়া তাঁহার কাব্যতরী জন্মদিনেও শেষ লেখার মধ্য দিয়া দিগন্তের অন্তরালে উধাও হইয়া গিয়াছে। 

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন পৃথিবীর কবি, মানুষের কবি। এত বিশাল মাপের কবি যখন আত্মাসরূপ উদ্ঘাটন করিয়া আক্ষেপ করিয়া বলেন— 

“আমার কবিতা / জানি আমি,

 গেলেও বিচিত্র পথে 

হয় নাই সে সর্বত্রগামী।” 

তখন শ্রদ্ধায় মস্তক অবনত হয়। শুধু স্বদেশেই নহে, পৃথিবীর যেখানে নিগ্রহের রথচক্রতলে মানুষ নিষ্পেষিত হইয়াছে সেখানেই ধ্বনিত হইয়াছে তাহার বলিষ্ঠ প্রতিবাদ। বিশ্বের তিনি লাভ করিয়াছেন বিশ্বকবির উপযুক্ত সম্মান। ১৯৪১ সালের ৭ই আগস্ট কবির জীবনাসান ঘটে। ২৫শে বৈশাখের ভাস্করসূর্য অস্তমিত হইল। ২২শে শ্রাবণের নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়।। 

রবীন্দ্রনাথের ছিল বাল্মীকি বেদব্যাস — কালিদাসের গভীর হৃদয় এবং গ্যেটে টলস্টয়ের সুগভীর সমাজ চেতনা। যে গভীর স্পর্শকাতরতা। নিবিড় বিশ্বাত্মবোধ এবং স্থির ঈশ্বর চেতনা তাঁহার কাব্য-কবিতাকে ত্রিবেণী সঙ্গমে স্থাপন করিয়াছে। রবীন্দ্রনাথ সকল কালের মানুষের পবিত্র তীর্থভূমি। 

৩১। আসামের বন্যা ও তাহার প্রতিকার

আসামের (বর্তমানে পরিবর্তিত নাম অসম) বন্যা আসামবাসীদের নিকট বার্ষিক অভিশাপস্বরূপ। আসামের কোন কোন অঞ্চল প্রতি বৎসরই বন্যার প্রকোপে পড়ে, তাহার ফলে আসামবাসীদের জীবন বিপর্যয় ও দুর্দশার অন্ত থাকে না। ভারতের অন্য কোন অঞ্চল এই ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয় না, কারণ আসামের ন্যায় পার্বত্য ও নদীবহুল রাজ্য ভারতবর্ষ কমই আছে, বন্যার ফলে এই রাজ্যের নদীগুলি যে কি ভীষণ আকার ধারণ করে তাহা প্রত্যক্ষ না করিলে উপলব্ধি করা যায় না। 

আসামের বন্যার প্রধান কারণ দীর্ঘতম ব্রহ্মপুত্র নদ। ইহা আসামের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত বর্তমান অরুণাচল প্রদেশ দিয়া লোহিত নামে আসামে প্রবেশ করিয়াছে। তাহাছাড়া উত্তর- পূর্ব সীমান্তের পর্বতশ্রেণীতে প্রচুর পরিমাণে তুষার সঞ্চিত হয়। বৃষ্টির সহিত গলিত তুষারস্তূপ আসামে নদ-নদীগুলির সহিত মিশ্রিত হয়। মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে আসামে বৃষ্টিপাতের পরিমাণও অধিক। অত্যধিক বৃষ্টিপাতের ফলে নদ-নদীগুলি স্ফীত হইয়া উঠে এবং উভয়তীর প্লাবিত হয়। মত্ত উল্লাসে ব্রহ্মপুত্র ও তাহার শাখানদীগুলি সমতলভূমির উপর দিয়া বহিয়া যায়। ভূমিকম্পের ফলেও ভূগর্ভের জল স্ফীত হইয়া উঠে ও উপরের হল দীর্ঘদিনের জন্য উপরেই থাকিয়া যায়। 

ব্রহ্মপুত্র ব্যতীত আসামের অন্য একটি প্রধান নদী হইল বরাক। ইহা সমগ্র কাছাড় জেলাকে বন্যা কবলিত করিয়া প্রায় প্রতি বৎসরই জনগণের প্রচুর ক্ষতিসাধন করে। ৩/৪ বৎসর পূর্বে মণিপুরের নিকট বাঁধ ভাঙ্গিয়া যাওয়ায় কাছাড় জেলার বন্যার প্রকোপ বৃদ্ধি পাইযাছিল। গ্রামাঞ্চলে প্রচুর শস্যক্ষেত্র, গোবাদি পশু বিনষ্ট হয়। শতাধিক মানুষের প্রাণহানি হয়। অসংখ্য লোক গৃহহারা হইয়া শহরাঞ্চলে বন্যাত্রাণ শিবিরে আশ্রয় গ্রহণ করে। শহরাঞ্চলেও যে সমস্ত অঞ্চল নীচু তাহাতেও বন্যার জল গৃহের চাল পর্যন্ত নিমগ্ন করিয়াছিল। 

আসামের বন্যার ফলে আসামবাসীরা প্রতিবৎসরই যে এত দুঃখকষ্টের সম্মুখীন হয়, কিন্তু তাহা হইতেও কিভাবে রক্ষা পাওয়া যায় ইহার কারণ অন্বেষণে কেহই যত্নবান নহে। তবে কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকার আসামের বন্যা নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি পরিকল্পনা গ্রহণ। করিয়াছে। তাহারা ব্রহ্মপুত্র নদীতে বাঁধ দিয়া ইহার উন্মত্ততা রোধ করিতে চাহিয়াছেন। কিন্তু আসামে বৃষ্টিপাতের কোন স্থায়ী সময় সীমা নাই। বৎসরের যে কোন সময় অতিবর্ষণের ফলে নদ-নদীগুলি প্লাবিত হয় বলিয়া এই সকল প্রকল্পের স্থায়ী সুফল এখনও পাওয়া যায়। নাই। খরস্রোতা পার্বত্য নদীর উপকূলভূমিও বৃহৎ প্রস্তরখণ্ড বাঁধিবার চেষ্টা করিয়া দেখা গিয়াছে যে প্রচণ্ড প্লাবনে ইহা কার্যকরী হয় না। ব্রহ্মপুত্র তীরস্থ শহরগুলির ভাঙ্গন রোধ করিতে এই ব্যবস্থা অবলম্বন করা হইয়াছে। ইহাছাড়া গঙ্গার সহিত ব্রহ্মপুত্রের সংযোগ স্থাপন করিবার জন্য খাল কাটিবার পরামর্শ একদা ভারতের প্রাক্তন সেচমন্ত্রী ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নদী পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ ডক্টর. কে. এল রাও দিয়াছিলেন। ইহাতে একদিকে যেমন আভ্যন্তরীণ নদী-পরিবহনের ক্ষেত্র বিস্তৃত হইবে অন্যদিকে তেমনি আসামও বন্যার ভয়াবহতা হইতে রক্ষা পাইবে। কিন্তু এই পরিকল্পনা বাস্তবে রূপায়ণ করা সম্ভব হয় নাই, কারণ ইহাতে প্রচুর পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন। ইহাছাড়া আসামে প্রতি বৎসর বন্যার ফলে নদীখাতসমূহ ভরাট হইয়া যাইতেছে। ইহাতে নদীর গভীরতা কম হওয়ায়, নদীগর্ভে সঞ্চিত

মাটি, বালি প্রভৃতি ড্রেজার দ্বারা সরাইবার ব্যবস্থা করিলে জল প্লাবন বন্ধ করা যায়। প্লাবন রোধের জন্য মানুষের ঐকান্তিক প্রয়াস যদি আংশিক সাফল্য লাভ করে তাহা হইলেও অগণিত মানুষের জীবন রক্ষা পায়। বিজ্ঞানের অশেষ চেষ্টার ফলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত হইতে মানুষ অব্যাহতি পায় নাই তবুও ইহার বীভৎস পরিণাম হইতে যাহাতে মুক্তি পাইতে পারে এই ব্যাপারে সরকারকে সচেষ্ট হইতে হইবে। 

৩২। অসমের পর্যটনশিল্প 

পর্যটন আধুনিক বিশ্বের অন্যতম শিল্প ব্যবসায়। এই ব্যবসায়ে দেশের দর্শনীয় স্থানসমূহ ব্যবহৃত হয়। দেশ বিদেশের মানুষকে আহ্বান ও আকর্ষণ করে আনে পর্যটন শিল্প। 

অসম উত্তরপূর্ব ভারতের একটি রাজ্য। এই রাজ্যের উত্তরে ভুটান দক্ষিণে মেঘালয় পশ্চিমে পশ্চিমবঙ্গ এবং পূর্বে অরুণাচল রাজ্য অবস্থিত। অসম একটি পার্বত্য সবুজ ভূমি। এখানে অনেক দর্শনীয় স্থান আছে। অসমে রয়েছে নানা ঐতিহাসিক সৌধ, মন্দির জাতীয় উদ্যান, অভয়ারণ্য এবং তীর্থস্থান। এসবই ভ্রমণ পিপাসুদের আকর্ষণ করে। অতীতকাল থেকেই নানা দেশের মানুষ অসম ভ্রমণ করেছে। পর্যটক হিউয়েন সাঙ তাঁদের মধ্যে অন্যতম। 

পর্যটন দুনিয়ায় অসম লালনদী ও নীল পাহাড়ের দেশ বলে খ্যাত। অসমের বৃক্ষ ঢাকা পাহাড়, সমভূমির আঁকাবাঁকা পথ খুব সুন্দর। এখানকার পুরাকথা, গান, নৃত্যশৈলী, রঙিন। উপজাতি ও এক শৃঙ্গ গণ্ডার সারা পৃথিবীর মানুষকে মুগ্ধ করে চলেছে। অসমের চা পৃথিবী বিখ্যাত। 

অসমের দর্শনীয় স্থানগুলির মধ্যে রয়েছে— কামাক্ষা মন্দির, শিবসাগরের শিবদৌল, মাজুলি দ্বীপ, মানাস জাতীয় উদ্যান, কাজিরাঙা অভয়ারণ্য, হাজো পোয়ামকা ইত্যাদি। অসম ভারতের উত্তরপূর্ব সীমান্তের প্রবেশ দ্বার। এখানে যাতায়াতের সুব্যবস্থা আছে। বিমানপথ, রেলপথ, সড়কপথ সকলই উন্নত বলা যেতে পারে। এ সকল পথে তীর্থযাত্রীদের পর্যটকদের যাতায়াত সুগম। 

পর্যটন ক্ষেত্র থেকে অসমের বেশ মুনাফা আদায় হয়। পর্যটনের উন্নয়নে সরকার পরিকল্পনা করেছে। সকল দর্শনীয় স্থানগুলিতে নিরাপত্তা কায়েম রাখার সরকার ব্যবস্থা নিয়েছে। আশা করা যায় পর্যটকদের সমাগমে অসমের অর্থনীতি গতিশীল হইবে। 

৩৩। কম্পিউটার 

বিজ্ঞানের জয়যাত্রার নবতম সাফল্য কম্পিউটার। গাণিতিক নিয়ম ছাড়াও যে কোনও বিষয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্লেষণের মাধ্যমে কম্পিউটার অতি দ্রুত ফলাফল প্রদান করে। ১৬৪২ সালে গণিতজ্ঞ ব্রেইজি প্যাসকেল প্রথম যান্ত্রিক গণনাযন্ত্র তৈয়ারী করেন। 

১৬৭১ সালে গডফ্রাইড লেবনিজ প্রথম গুণ ও ভাগের ক্ষমতাসম্পন্ন যান্ত্রিক ক্যালকুলেটর তৈয়ারী করেন। ১৯৪৪ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও আই. বি. এম. কোম্পানীর যৌথ

উদ্যোগে ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল কম্পিউটার তৈয়ারী হয়। ইলেকট্রিক কম্পিউটার তৈয়ারী হয় ১৯৪৬ সালে। কম্পিউটারের বিপুল ব্যবহার আরম্ভ হয় ১৯৫৭ সালের পর। কম্পিউটার জগতের বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে ১৯৭১ সালের পর হইতে। 

কম্পিউটারের প্রধান দুইটি দিক হইল হার্ডওয়ার এবং সফটওয়ার সরঞ্জাম অর্থাৎ যান্ত্রিক সরঞ্জাম এবং প্রোগ্রাম সরঞ্জাম। যান্ত্রিক সরঞ্জামকে কাজে লাগাইবার জন্য প্রোগ্রাম প্রয়োজন। কম্পিউটারের বিভিন্ন অংশের মধ্যে কার্যের সমন্বয় রক্ষা করে প্রোগ্রাম। কম্পিউটারকে প্রধানত চারটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা— 

(১) সুপার কম্পিউটার, (২) মেইনফ্রেম কম্পিউটার, (৩) মিনি কম্পিউটার এবং (৪) মাইক্রো কম্পিউটার। 

বিভিন্ন গাণিতিক সমস্যা সমাধানের জন্য কম্পিউটারের মেমরিতে একসাথে অনেক কার্য নির্দেশের তালিকা সংরক্ষিত হয়। কার্য নির্দেশের এই সমষ্টিকে কম্পিউটার প্রোগ্রাম বলা হয়। 

ইন্টারনেটের উদ্ভাবন কেবল তথ্য এবং সংযোগের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহৃত হইলেও বর্তমানে মনোরঞ্জনের মাধ্যম হিসাবেও ব্যবহৃত হয়। কম ব্যয়ে কম সময়ে অধিক সুবিধাজনক হিসাবে ব্যবহার করিতে পারার জন্য ইহার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাইয়াছে। ইন্টারনেট বা অনলাইনের মাধ্যমে সম্পাদিত ব্যবসা-বাণিজ্যকে বলা হয় ই-কমার্স। ই-কমার্সের মাধ্যমে বিভিন্ন জিনিসের ক্রয়-বিক্রয় করা হয়। কম্পিউটারের সম্মুখে বসিয়া বাড়িতে বসিয়াই ক্রয়-বিক্রয়, রেল ও বিমানের টিকিট ক্রয়, যোগাযোগ সম্ভব হয়। ই-মেল, ই- ব্যাঙ্কিং, ই-ট্রেভেল ইত্যাদি লইয়া বিস্তৃত হইয়াছে ইলেকট্রনিক্সের জগৎ। 

কম্পিউটার জটিল সমস্যার সমাধান করে। মহাশূন্যে গবেষণার কাজ সহজসাধ্য হইয়াছে কম্পিউটারের মাধ্যমে। কম্পিউটারের মাধ্যমে খেলা, চিত্র অঙ্কন করা, ভাষা অনুবাদ, প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ প্রভৃতি কার্য সম্পন্ন হইতেছে। 

বর্তমানে শিক্ষানুষ্ঠান, অফিস, আদালত, বাণিজ্যিক সংস্থা সর্বত্র কম্পিউটারের ব্যাপক ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। কম্পিউটার যেন সমগ্র বিশ্বকে ঘরের ভিতরে আনিয়াছে। তাই বিশ্বকবির সুরে বলা যায়- 

“কত অজানারে জানাইলে তুমি কত ঘরে দিলে ঠাঁই, 

দূরকে করিলে নিকটবন্ধু, পরকে করিলে ভাই।” 

৩৪। নিয়মানুবর্তিতা

যখন যে কাজ করার উপযুক্ত সময় অর্থাৎ যথাসময়ে কার্য সম্পাদন করার নামই হইল। নিয়মানুবর্তিতা। সুষ্ঠভাবে মানুষের জীবনের প্রতিটি কর্তব্য করিতে হইলে সময়ের সচেতন ব্যবহার করিতে হইবে। জীবনকালের মূল্যবান সময়কে সচেতনভাবে ভাগ করিয়া লইতে হইবে। প্রকৃতপক্ষে মানুষের জীবন তো কয়েকটি দিনের সমষ্টি ছাড়া আর কিছুই নহে। মানুষের

জীবনে সময়ের যথাযথ ব্যবহারের চেতনাই মানুষকে কর্মশীল করিয়া রাখিয়াছে। সচেত কর্মী মানুষই জীবনের মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ হইতে পারে এবং জীবনকে প্রতিষ্ঠা করিতে প সময়ের সু-সামঞ্জস্য সমবায়ে মানব জীবনের এবং একটি অধ্যায় এক একটি কন জন্য নির্দিষ্ট হইয়া আছে। বাল্য, শৈশব ও কৈশোরে বিদ্যাশিক্ষা, নীতিশিক্ষা, যৌবনে কাজির ও গার্হস্থ্য জীবনের কর্তব্যে মনোনিবেশ, আর বৃদ্ধ বয়সে কর্মহীন বিশ্রাম গ্রহণ অধ্যাত্মচিত্তা। ইহাই তো প্রকৃত মানব জীবনের সার কথা। 

এই বিশ্বপ্রকৃতি এক আশ্চর্য নিয়মের অনুশাসনে বাঁধা পরিয়া আছে। একটু ব্যতি হইলেই মহা অঘটন ঘটিয়া যাইবার সম্ভাবনা আছে। তাই মানুষের জীবনেই ঐ একই নিয়ম প্রযোজ্য নিয়মানুবর্তিতা। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে কাজ করার উদাহরণ খুব কমই পাওয় যায়। যথাসময়ে কাজ করিবার অর্থই হইল সময়ের সদ্ব্যবহার। বাস্তব জীবনে আ দেখিতে পাই যাহারা প্রতিটি কাজে আলস্য ও বিলম্ব করে তাহারা ঠিক সময়ে গাড়ি ধরিে পারে না, সভাসমিতিতে বিলম্বে পৌঁছে। যথাসময়ে গন্তব্যস্থানে পৌঁছিতে না পারি অন্যের বিরক্তি ভাজন হইয়া থাকে। পরীক্ষার হলে দশ মিনিট দেরিতে গেলে সেই দিনে পরীক্ষার সকল প্রশ্নপত্রের উত্তর দেওয়া সম্ভব হয় না। মোট কথা সময় জ্ঞানের অভ জীবনে অনেক সময় অনেক ক্ষেত্রেই অকল্যাণকর দুঃখময় পরিস্থিতির মোকাবিলা করিয়ে বাধ্য হইতে হয়। 

সময় বহমান নদীর স্রোতের মতই কেবল নিয়ম মতো অগ্রসর হইয়া চলিয়াছে সময়ের সঙ্গে তাল রাখিয়া কর্তব্যকর্ম সম্পাদন করিতে না পারিলে পিছাইয়া পড়িতে হয় কর্মচঞ্চলতা, জীবনের নিয়মানুসারী অভ্যাস জীবনকে সমৃদ্ধতর করে। পাশ্চাত্য জাতিগুলির উন্নতির মূল কারণ-ই হইল তাহাদের সময়ানুবর্তিতা ও নিয়মানুবর্তিতা। অ সাম্প্রতিককালের কর্মব্যস্ততা ভারতীয়দের কিছুটা নিয়মানুবর্তিতা করিয়া তুলিতে সম হইয়াছে। দেশের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা নিয়মের তাগিদেই সকলেই ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে জীবনে গতিকে নিয়ন্ত্রণ করিতেছে। বৃহত্তর সমাজ জীবনের কল্যাণ সাধনে দেশের সাধারণ মানুষদে সবাগ্রাসী আলস্যকে ত্যাগ করিয়া সময়ানুবর্তী ও নিয়মানুবর্তী হওয়ার অভ্যাস গড়িয়া তোল প্রয়োজন। জীবনের প্রথম সোপান হইতেই নিয়মানুবর্তিতাকে অধিগত করিতে হইবে। অভিভাবকগণ চেষ্টা করিলেই শিশুদের যথা নিয়মে, যথাসময়ে কর্তব্য সম্পাদনের শিক্ষ নিতে পারিবেন। স্কুল-কলেজের বিধিবদ্ধ জীবন যদি বাড়িতেই বাঁধাবন্ধনহারা স্বাধীনতা লাভ করে, তবে নিয়মানুবর্তী বা সময়ানুবর্তী হইবার কোন আশাই নাই। 

“সময় চলিয়া যায়, নদীর স্রোতের প্রায়’। ‘Time and tide, wait for none ইত্যাদি প্রবচন বাক্যের তাৎপর্য, কিশোর সুকোমল চিত্তভূমিতে মুদ্রিত করিয়া দিবার দায়িত্ব গুরু বয়স্তদের উপর রহিয়াছে। দীর্ঘসূত্রতা এবং অবহেলায় কালহরণ করার ক্ষতিকারক অন ফল সমাজের প্রতিটি ব্যক্তি ও সমাজকে ক্রমান্বয়ে অধঃপতনের দিকে লইয়া যায়। তাই পুঁথিগত বিদ্যা-শিক্ষার সাথে সাথে নিয়ম মাফিক সময়ের সদ্ব্যবহার করার অভ্যাস করিতে হইবে। অন্যথায় জীবনে পরাজয়ের গ্লানি বহন করা ছাড়া আর কিছুই উপায় থাকিবে না। 

৩৫। মিতব্যয়িতা 

মানুষের আয়ের সহিত ব্যয়ের সামঞ্জস্য রক্ষা করাকেই মিতব্যয়িতা বলা হয়। সামঞ্জস্যপূর্ণ। জীবনই আদর্শ জীবন। প্রকৃত মানুষ সেই জীবনকেই কামনা করে। মিতব্যয়িতা সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনের ভিত্তিপ্রস্তর-স্বরূপ। বর্তমানের সহিত ভবিষ্যতের, আয়ের সহিত ব্যয়ের সামগ্রস্য রাখা দরকার। জীবনে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধির বুনিয়াদ রচনা করিয়া দেয় মিতব্যয়িতা। শৈশব কাল হইতেই মিতব্যয়িতা আচরণীয় এবং অনুকরণীয় আদর্শ হওয়া উচিত। 

মানুষের নিকট ভবিষ্যৎ অজ্ঞাত। তাহার জীবন অনিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ। মানুষ তাই তাহার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সর্বদা আশঙ্কিত থাকে। শুধু বর্তমানকে লইয়া কিংবা অতীতের স্বপ্নে মগ্ন হইয়া সন্তুষ্ট থাকিতে মানুষ পারেনা। সে ভবিষ্যতের জন্য করিতে চায় জীবনের সংস্থান। তাই মিতব্যয়িতা তাহার নিকট অপরিহার্য বিষয়। রোজগারের মাধ্যমে যাহা আয় হয় তাহার সবটুকুই বর্তমানের মোহময় গহ্বরে নিক্ষেপ না করিয়া ভবিষ্যতের জন্য কিছু সঞ্চয় করিয়া রাখা দরকার। 

মিতব্যয়িতার অর্থ আয়ানুসারে ব্যয় করা। মানুষ যাহা উপার্জন করে, সে যদি তদতিরিক্ত ব্যয় করিয়া বসে, তাহা হইলে তাহাকে অদূর ভবিষ্যতে নিদারুণ অভাবগ্রস্থ হইতে হইবে। অমিতব্যয়ী জীবনের বিপুল তাড়নায় তাহাকে দুর্জয় কণজালে জর্জর হইয়া ভাগ্যকে দোষারূপ করিতে হইবে। কিন্তু মানুষ যদি বায়ের পরিমাণকে আয়-সীমানার মধ্যে আবদ্ধ রাখে, তাহা হইলে তাহাকে ঋণ করিতে তো হইবেই না উপরন্ত উদ্বেগহীন সুখময় জীবন কাটাইতে পারিবে। 

মিতব্যয়িতার অর্থ কৃপণতা নয়। যাহারা কৃপণ তাহারা নিজের এবং পরিবারের প্রয়োজনের অর্থ খরচ না করিয়া অতিরিক্ত সঞ্চয় করিয়া থাকে। ইহাতে পারিবারিক সুখ-শান্তি নষ্ট হইয়া থাকে। কৃপণেরা বর্তমানকে ফাঁকি দিয়া ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনাতিরিক্ত অর্থ সঞ্চ করিয়া রাখে। নিজের আত্মাকে কষ্ট দিয়া, তাঁহারা পরিবার-পরিজনকে উপবাসী রাখিয়া কেবল সঞ্চয়ের নেশায় মাতিয়া উঠে। কিন্তু বর্তমান তাহাকে ক্ষমা করে না, ক্ষয়-ক্ষতি বা রোগ-শোকের দুর্জয় আঘাতে বর্তমান কাল তাহার প্রতিশোধ গ্রহণ করিতে বাধ্য। লক্ষ্মীর অন্তরের কথা হইল কল্যাণশ্রী আর; কুবেরের অন্তরের কথা অর্থ সংগ্রহ। আবার খরচের নেশায় পাইয়া বসিলে মানুষ অমিতব্যয়ি হইয়া উঠে এবং বায় বাহুল্যের অনিবার্য পরিণামে পরবর্তী কালে তাহার জীবনে আসে অসহ দুঃখ ও লাঞ্ছনা। 

বাল্যকালে পিতা-মাতার মোহাতিশয্যে অমিতব্যয়িতা প্রশ্রয় পাইয়া জীবনের চন্দনতরুকে বিষবৃক্ষে পরিণত করিতে পারে। অথচ শৈশবেই যদি তাহা সংশোষিত হয় তাহা হইলে উত্তর জীবনের চরম ট্র্যাজেডি হইতে নিজেকে রক্ষা করা সহজতর হয়। অমিতব্যয়ীর জীবনে আত্মসুখ ও ভোগ সর্বস্বতার ক্ষুদ্রতা প্রশ্রয় পায়। সমাজবাদী রাষ্ট্রে ভোগবণ্টনে সকল বিধি বলবৎ থাকায় সেইখানে অমিতব্যয়িতার বিষবৃক্ষের জন্ম ও বৃদ্ধির সম্ভাবন কম। সেখানে সামাজিক মিতব্যয়িতা ব্যক্তির মিতব্যয়িতাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং ভবিষ্য নিরাপত্তার ভার গ্রহণ করে সমাজ। 

৩৬। বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ 

ভূমিকা : বিজ্ঞান শব্দের প্রকৃত অর্থ হইল যে জ্ঞান মানুষকে বিশেষরূপে জানাইয় দেয়। যাহা মানুষ হাতে কলমে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সাহায্যে প্রত্যক্ষরূপে জানিয়া ধাে তাহাই বিজ্ঞান। সভ্যতার ইতিহাসে কখন হইতে বিজ্ঞানের সূত্রপাত তাহা সঠিক করিয় নির্ণয় করা অসম্ভব। সৃষ্টির আদিম যুগে মানুষ ছিল একান্ত অসহায়, প্রকৃতির ক্রীড়নকমাত্র। মানুষ তাহার যুগ-যুগান্তরের স্বপ্ন ও সাধনার অনবদ্য ফসল দিয়া আধুনিক সভ্যতার বিশ ইমারত গড়িয়া তুলিয়াছে। আপন মনীষার বলে মানুষ বিজ্ঞানকে আজ সভ্যতার বনিয়ে রচনার কাজে নিয়োজিত করিয়াছে। আজ সভ্যতার চরম সমুন্নতির মূলে রহিয়াছে বিজ্ঞানে অপরিসীম বিস্ময়। বিজ্ঞান অসম্ভবকে আনিয়াছে সম্ভবের সীমানায়। মানুষকে পৌঁছাইয় দিয়াছে শূন্যে মহাকাশে, গৌরবের উচ্চশিখরে। বিজ্ঞানের চমৎকারিত্বে আজ প্রকৃতির হাতে অসহায় মানুষ হইয়া উঠিয়াছে অসীম শক্তিধর। আজ সুউচ্চ পর্বত, পারাপারইন সাগর অথবা অন্য কোন প্রাকৃতিক বাধা মানুষের অগ্রগতির পথরোধ করিয়া দাঁড়াইবার ক্ষমতা রাখে না। মানুষের তৈরি যন্ত্র আজ সর্বদিকেই যেন অসাধ্যকে সাধন করিতে সক্ষ হইতেছে। 

কিন্তু বিজ্ঞানের এই সীমাহীন ও অকৃপণ অবদানের জন্য সকৃতভজ্ঞ চিত্তে মাথা ন করিয়াও বিশ্বমানবের অন্তর হইতে যেন ভাসিয়া আসিতেছে এক ভীষণ ভয়ার্ত জিজ্ঞাসা- এই সুন্দর বিশ্বের ধ্বংসের বিষাণ কি চির কল্যাণময় বিজ্ঞানই বাজাইবে? বিজ্ঞানের আশীর্বাদের পিছনে কি অভিশাপের হাতছানি অপেক্ষা করিতেছে? 

বিজ্ঞান আশীর্বাদ : 

মানব জীবনকে পূর্ণতর এবং সুন্দরতর করিয়া তুলিবার উপায় হিসাবে বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্বকে অস্বীকার করিবার কোনো উপায় নাই। বিজ্ঞান মানব জীবনে শ্রেষ্ঠ আশীর্বাদ। বিজ্ঞানের ফলস্বরূপ চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতি মানুষের আয়ু-সীমা বর্ধি করিয়াচ্ছে। মানুষ এমনকি কৃত্রিম উপগ্রহ নির্মাণ করিয়া বিধাতার ক্ষমতার প্রতিস্পর্ণী হই দাঁড়াইয়াছে। বিজ্ঞান মনুষকে ভূগর্ভস্থিত অসংখ্য মূল্যবান ধাতু ও রত্নের সন্ধান দিয় করিয়াছে ধনবান। বিজ্ঞানের প্রসাদে মানুষের জীবনে দেখা দিয়াছে সুখ-স্বাচ্ছন্দ। বিজ্ঞান মানুষেকে করিয়াছে বিপুল বৈভবের অধিকারী। বিজ্ঞানীর প্রতিভা বৈদ্যুতিক শক্তিকে করার করিয়া পৃথিবীর রূপকেই যেন পাল্টাইয়া দিয়াছে। বৈদ্যুতিক বাতি, পাখা, রেডিও, ফ্রি টেলিফোন, টেলিভিশন, ইত্যাদি বিভিন্ন আবিষ্কার দূরের দেশ, দূরের মানুষ আজ হই উঠিয়াছে একেবারেই কাছের। এই বিশাল বিশ্ব আজ মানুষের নিকট এক পড়ায় পরিণ হইয়াছে। 

আরাম আয়াসের তো কথাই নাই, এই সকল হইল বিজ্ঞান-নির্ভর আধুনিক সভ্যতার অতি উজ্জ্বল দিগন্ত। 

বিজ্ঞান অভিশাপ : বিজ্ঞানের আবিষ্কার মানব জীবনে অভূতপূর্ব সুখ-স্বাচ্ছন্দ আনন্দ আনিয়া দিয়াছে সত্য, কিন্তু জগতের অন্যান্য জিনিসের মতো বিজ্ঞানেরও একটা অশুভ দিক আছে। ইহার যেমন আধুনিকতম সভ্যতা সৃষ্টির ক্ষমতা আছে, তেমনই এ বিজ্ঞান এক মুহূর্তে এই সভ্যতাকে ধ্বংস করিবার ক্ষমতাও রাখে। আলফ্রেড নোবেল ডিনামাইট। আবিষ্কার করিয়াছিলেন পাহাড়ের পাথর ভাঙ্গিয়া যাতায়াতের পথ সুগম করিবার জন্য। পরে দেখা গেল, এই ডিনামাইটের সাহায্যে কত সুসভ্য জনপদ উড়িয়া গিয়াছে। একটি মাত্র পরমাণু বোমার আঘাতে মুহূর্তের মধ্যে বিরাট ধ্বংসলীলা সাধিত হইয়া গিয়াছিল জাপানের দুইটি শহরে ‘হিরোশিমা ও নাগাসাকি। 

বিজ্ঞান-রূপ সিন্ধুর মন্থনে একদিকে যেমন বিজ্ঞানের আশীর্বাদরূপ অমৃতের’ উদ্ভব হইয়াছে, অন্যদিকে সঙ্গে সঙ্গেই পাশাপাশি ‘হলাহল’ও উৎপন্ন হইয়াছে? এখন বর্তমান বিশ্বের মানব সমাজ বুঝিতে শিখুক যে তাহারা বিজ্ঞানকে কোন পথে লইয়া যাইবে। কিন্তু প্রকৃত বিচারে দেখা যাইবে — ধ্বংসক্রিয়ার জন্য বিজ্ঞান কিন্তু দায়ী নহে, ইহা তো একটি নিষ্ক্রিয় শক্তিমাত্র, বুদ্ধিমান মানুষ ইহাকে যেই দিকে চালনা করিবে বিজ্ঞান সেই দিকেই চলিবে। 

আজ লক্ষ লক্ষ কল-কারখানা, যানবাহন, শব্দ-যন্ত্র—সকলের সম্মিলিত অবদানে পৃথিবীর পরিবেশ বিষে বিষে নীল। প্রকৃতি আর জীবনে নামিয়া আসিয়াছে সংকটের অশনি সংকেত। অসীম সম্ভাবনা ও শক্তিময় বিজ্ঞান মুষ্টিমেয় স্বার্থপর নরঘাতীদের হাতে পড়িয়া আজ সমাজের সার্বিক দুঃখ-কষ্ট ও আতঙ্কের রূপে প্রকট করিয়া তুলিয়াছে। মূল কথা বিজ্ঞানের সুফল ও কুফল দুইয়েরই রূপকার মানুষ। মানুষ যদি চায় বিজ্ঞানের মঙ্গল শঙ্খ-ই বাজাইবে তবে পৃথিবীতে কোন দিনই ধ্বনিত হইবে না ধ্বংসের বিষাণ আর বিষের বাঁশি। 

৩৭। তোমার প্রিয় সাহিত্যিক 

যখন বাংলা সাহিত্যে তেমন কোন সাহিত্যিক আদর্শ ছিল না, ছিল না কোন মহান সাহিত্যিক ও সাহিত্যপ্রেম, অবহেলায় অনাদরে বাংলা সাহিত্য ছিল নিমজ্জমান, ঠিক তখনই যিনি রূপকথার রাজপুত্রের মতো বাংলা সাহিত্যকে, বাঙালীর ভাষাকে, চরম অবহেলা, অধঃপতন ও অবমাননার হাত হইতে উদ্ধার করিতে ব্রতী হন, সেই মহান পুরুষই হইলেন আমার প্রিয় সাহিত্যিক বা লেখক। তিনি হইলেন সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। সেই সময় সত্যিই ছিল বাংলা ও ভাষা সাহিত্যের ক্ষেত্রে এক দুঃসময়। একদিকে ইংরেজি শিক্ষিতদের চোখে ছিল বাংলা ভাষা বর্নরের ভাষা, অন্যদিকে সংস্কৃত পণ্ডিতদের দৃষ্টিতে ছিল ইহা চণ্ডালের ভাষা। উভয়শ্রেণীর অপমান, অনাদর, অবহেলা মস্তকে ধারণ করিয়া বাংলা ভাষা সাহিত্য দীন হীন বেশে শম্বুক গতিতে চলিয়াছিল। সেইদিন বাংলা সাহিত্যের অগ্রণী কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা ভাষাকে অবহেলা করিয়া উহাকে ত্যাগ করিয়াছিলেন। আর সেই অনাদর মুহূর্তে ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র বঙ্গসরস্বতীর পদতলে দাঁড়াইয়া ভক্তিনম্র শিরে তুলিয়া লইলেন বাংলা ভাষাকে। 

সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র বঙ্গসরস্বতীর মন্দিরে প্রবেশ করিয়া বাংলা ভাষার পূজার মাধ্যমে বাংলা ভাষার মুখে হাসি ফুটাইয়া তুলিলেন। তাই বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা সাহিত্যের যুগ পুরুষ। পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সাহিত্যের সংঘাতে ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলায় যে বিপুল তরঙ্গ উঠিয়াছিল বঙ্কিমচন্দ্র তাহাকে অপূর্ব বাণীমূর্তি দান করিলেন। তিনি পশ্চিমিয়া হাওয়াকে পূর্বাহাওয়ায় পরিবর্তিত করিয়া বাংলা সাহিত্যের দৈন্যদশা মোচন করিলেন। নতুন নতুন সৃষ্টির উল্লাসে তখন যেন বাংলা সাহিত্য ভাসিল। 

শুধুমাত্র এই কারণেই যে লেখক বঙ্কিমচন্দ্র আমার প্রিয় লেখক, তাহা নহে, বঙ্কিমচন্দ্রের মধ্যে আমাদের সুপ্ত চেতনার যেন প্রথম জাগরণ প্রত্যক্ষ করিলাম। তাঁহার বাস্তব জীবনবোধে আমরা অনুপ্রাণিত হইলাম। তাই আমরা আমাদের সমাজ, স্বদেশ ও নিজের জীবনকে ভালোবাসিতে শিখিলাম। তাহার আনন্দমঠ, তাহার ‘কমলাকান্তের দপ্তর’, তাঁহার ‘মুচিরাম গুড়ের জীবন কাহিনীতে আমাদের শুধু চিত্ত মুক্তিই ঘটিল না, আমাদের আত্মদর্শনও ঘটিল। 

বঙ্কিমচন্দ্র মানবী-জননী, দেশ-জননী এবং দেবী-জননীর সমাহারে দেশ মায়ের বাণী বিগ্রহ রচনা করিয়া দেশবাসীর হাতে তুলিয়া দিয়াছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র ভারতের তেত্রিশ কোটি মানুষকে যেন ত্যাগী, বীর ও সন্তানধর্মে দীক্ষিত করিয়াছিলেন তাঁহার ‘বন্দেমাতরম’ মন্ত্রে। শুধু তাহাই নহে, তিনি জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তির সমাহারে তাহার ‘আনন্দমঠ’ গ্রন্থে নবযুগের মাতৃসাধনার সার্থক রূপ দিয়াছিলেন। এই সাধনা ব্যর্থ হয় নাই। বঙ্কিমচন্দ্র আমাদের দেশের স্বাদেশিকতার প্রথম রূপকার। সামগ্রিক ভাবে তিনি বাংলা সাহিত্যের ভগীরথ। তাঁহার আবির্ভাবের পূর্বে বাংলা সাহিত্যে কোথাও ছিল না প্রাণের স্পন্দন, কোথাও ছিল না সবুজের আভাস। তিনি বাংলা সাহিত্যের ধূসরতাকে ঊষরতায় বদলাইয়া দেন। তাঁহার পরবর্তী কালে লেখক রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ সেই ধানেই বোঝাই করিয়াছিল। বাংলা সাহিত্যের চরম সমুন্নতির দিনে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের নিকট আমাদের ঋণ অনস্বীকার্য। তাই স্বনামধন্য লেখক বঙ্কিমচন্দ্র আমার প্রিয় লেখক। তিনি আমাদের জাতীয় জীবনমুক্তির চরম এবং পরম উদাহরণ। 

৩৮। বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ  

ভূমিকা : পৃথিবী প্রথমে ছিল গ্যাসীয়, তারপর তরল, সবশেষে কঠিন আকার ধারণ করে। এরপর প্রথম উদ্ভিদ, তারপর অমেরুদণ্ডী ও মেরুদণ্ডী প্রাণীর আবির্ভাব হয়। মানুষের আবির্ভাব হয় সর্বশেষে। বিবর্তনের পথ ধরিয়া বিভিন্ন সময়ে উদ্ভিদ, জীবজন্তু ও মানুষের আবির্ভাব হইলেও পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে উদ্ভিদ, জীবতত্ত্ব ও মানুষ—

এই তিনটির মধ্যে স্থাপিত হইয়াছে এক গভীর সম্পর্ক। একে অন্যের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কিংবা যথেষ্ঠ ব্যবহারের ফলে বহু প্রজাতির উদ্ভি ও প্রাণী পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে কিংবা বিলুপ্ত হওয়ার মুখে। তাই প্রয়োজন সংরক্ষণের। 

সংরক্ষণ বলিতে কি বোঝায় : পৃথিবীর কোনও প্রাকৃতিক সম্পদই অফুরন্ত নহয়। বিভিন্ন খনিজ সম্পদের সঙ্গে সঙ্গে জল, বায়ু, মাটি, বন, বন্যপ্রাণী — এসবই প্রাকৃতিক সম্পদ। এইসব সম্পদের অপচয় ও যথেষ্ট ব্যবহারের ফলে মানুষ আজ নানা সমস্যার সম্মুখীন হইয়াছে। জীবগোষ্ঠীর সার্বিক মঙ্গলের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয়রোধ, পরিচর্যা, রক্ষণাবেক্ষণ, পুনরুদ্ধার এবং সীমিত ব্যবহারকে সংরক্ষণ বলে। 

বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা : মানুষ তাহার সীমাহীন লোভ ও অপরিণামদর্শিতার জন্য বনভূমি ধ্বংস এবং বন্যপ্রাণী হত্যা করিয়া পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করিয়া নিজের সর্বনাশ ডেকে এনেছে। কোনও দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি অনেখখানি বনের উপর নির্ভরশীলয় আবার বন্যপ্রাণী বেঁচে থাকার জন্যও বনের প্রয়োজন। নানারকম খাদ্য, ঔষধ, বস্ত্র, কাগজ, আসবাবপত্র, উদ্ভিজ্জ তেল, রবার, আটা ইত্যাদি নানারকম নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি আমরা বন হইতে পাই। এছাড়া বায়ুর বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা, বন্যা ও খরার প্রাদুর্ভাব রোধ করা, মৃত্তিকা ক্ষয় বন্ধ করা প্রভৃতি কারণে বন সংরক্ষণের প্রয়োজন। 

কনভূমি ক্রমশ ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার জন্য প্রাণীরাও আজ বিপদের সম্মুখীন। বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল বনভূমি, সেখান থেকেই তারা খাদ্য সংগ্রহ করে। অপরদিকে চোরা শিকারিরা অর্থের লোভে চামড়া, শিং, পালক, দাঁত ইত্যাদি সংগ্রহের জন্য নির্বিচারে বন্য প্রাণী হত্যা করে চলেছে। তার ফলে বহু পশুপাখি অবলুপ্ত হয়ে গেছে, নয়তো অবলুপ্তির সম্মুখীন। অথচ বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখা, সৌন্দর্য রক্ষা এবং মানুষকে নির্মল আনন্দদানের জন্য বন্য প্রাণী সংরক্ষণের প্রয়োজন। 

গৃহীত ব্যবস্থা : আমাদের দেশে বন ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণের জন্য নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইয়াছে। সমাজভিত্তিক বনসৃজন প্রকল্পে প্রতিবছর নতুন নতুন গাছ লাগানো হচ্ছে। বন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হইয়াছে। অভয়ারণ্য বা সংরক্ষিত অরণ্য, জাতীয় পার্ক, বন্য প্রাণী স্যাংচুয়ারি প্রভৃতি সৃষ্টি করা হইয়াছে। এইসব বনাঞ্চলে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নিষিদ্ধ, গাছকাটা, কোনও প্রাণী ধরা কিংবা শিকার করা আইনত নিষিদ্ধ করা হইয়াছে। কন্য প্রাণী সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন সময়ে আইন প্রণয়ন করা হইয়াছে। বাঘ, সিংহ, হাতি, গণ্ডার ভাল্লুক হরিণ, বাইসন, কৃষ্ণসার, নীলগাই, কুমির, মরাল সাপ, ময়ূর, সিন্ধুঘোটক, নীল তিমি, বিভিন্ন হাস ও পাখি, ভারতীয় বড়ো বাঙ্কার্ড ইত্যাদি ৪৩ রকম বন্য প্রাণী ও ১৮ রকম পাখি ধরা বা হত্যা করা নিষিদ্ধ হইয়াছে ১৯৭২ সালের বন্যপ্রাণী আইন প্রণয়নের মাধ্যমে। শুধু আইন প্রণয়ন নয় প্রতিটি ৰাজ্যে বন্যপ্রাণী পর্ষদ গঠিত হইয়াছে। এ ছাড়া

সশস্ত্র বনরক্ষা বাহিনী গঠন করা হইয়াছে। বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করা হইতেছে। 

ভারতের সংরক্ষিত বনাঞ্চল : ভারতের যেসব বনাঞ্চলে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হইয়াছে তাহাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হইল— আসামের মানস ও কাজিরাঙা, ওড়িশার সিমলিপাল, বিহারের হাজারিবাগ ও পালামৌ, উত্তর প্রদেশের করবেট, গুজরা গির, রাজস্থানের ভরতপুর, কেরালার পেরিয়ার, মধ্যপ্রদেশের কানহা, তামিলনাড়ুর মধুমালাই, কাশ্মীরের দাচিগ্রাম, পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন, কর্ণাটকের বান্দীপুর প্রভৃতি। সজনেখালি পক্ষীনিবাস হিসাবে বিখ্যাত, গির অরণ্য সিংহ এবং তামিলনাড়ুর মধুমালাই বিভিন্ন জাতের হরিণের জন্য প্রসিদ্ধ। কাশ্মীরের ডাচি অরণ্য কস্তুরী মৃগ, রেড ডিয়ার, তুষার চিতা প্রভৃতির জন্য বিখ্যাত। 

পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন ও সজনেখালিতে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, কুমির, হরিণ, বন্যশূকর প্রভৃতি ; জলদাপাড়ায় একশৃঙ্গ গণ্ডার, বাঘ, চিতা, হাতি, চিতল, বন্যশূকর, সম্বর, ময়ূর, প্রভৃতি ; সিঞ্চলে ভালুক, হরিণ, কাকর প্রভৃতি; গরুমারায় বাঘ, হাতি, সম্বর প্রভৃতি ; চাপমারিতে সম্বর, হাতি, বাঘ, বন্যশূকর প্রভৃতি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হইয়াছে। উপসংহার : বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ব্যাপারে সারা বিশ্বে দেখা দিয়াছে সচেতনতা। 

তাহার ফলে বিভিন্ন সময়ে নানা আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠিত হইয়াছে। তাহার মধ্যে ১৯৫২ সালে গঠিত বিশ্ব বন্যপ্রাণী তহবিল বা World Wildlife Fund (WWE) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে এই সংস্থার অধীনে সারা বিশ্বব্যাপী প্রায় সাড়ে আটশো প্রাণী সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হইতেছে। ইহার সঙ্গে তাল মিলাইয়া আমাদের দেশেও নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইতেছে। 

৩৯। অধ্যাবসায় 

সাফল্য অর্জন করিতে হইলে নিরবছিন্ন পরিশ্রমের বিকল্প নাই। কথায় আছে ‘একবার না পারিলে দেখ শতবার।’ পরাজয়ের আঘাত সহ্য করিয়াও সাফল্য প্রাপ্তির আশায় অবিরাম চেষ্টায় রত থাকাই হইতেছে অধ্যাবসায়। 

মানব জীবনে সাফল্য অর্জনে অধ্যাবসায় অপরিহার্য উপাদান। খ্যাতিমান পুরুষদের জীবনী আলোচনায় আমরা জানিতে পারি তাঁহাদের সাফল্যের অন্তরালে রহিয়াছে অধ্যাবসায়। স্বীয় লক্ষ্যে উপনীত হইবার জন্য সমস্ত প্রতিকূলতা অতিক্রম করিয়া বিরামহীন প্রচেষ্টার ফলে জীবনে সাফল্য অর্জন করিতে পারিয়াছে। বোপদেব, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামমোহন রায় অবিরত প্রচেষ্টা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়া সাফল্যে স্মরণীয় হইতে পারিয়াছেন। 

অধ্যাবসায়ের অভাব মানব জীবনকে সার্থকতার পথে অগ্রসর হইতে দেয় না। কোন কর্মে প্রতিবন্ধকতা আসিলে তাহাকে অতিক্রম করিতে হইবে। বাধা-বিপত্তি দেখিয়া থামিয়া গেলে তাহার জীবনে বিফলতা গ্রাস করিবে যাহা কাহারও কাঙ্খিত না। জীবনের প্রথম হইতে বিশ্বাস এবং আত্মপ্রত্যয়ে দৃঢ় হইতে না পারিলে জীবন ব্যর্থতার অন্ধকারে ডুবিয়া যাইবে।

কোন জাতি যদি অধ্যাবসায়ী হয় তাহার সমগ্র আর্থিক জীবন ও মানসিক সক্রিয়তা (শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে সক্ষম হইবে। বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলির দিকে লক্ষ্য করিলে ইহাই অনুধাবন করিতে পারা যায় যে তাহারা যথেষ্ট অধ্যাবসায়ী বলিয়া সাফল্য তাহাদের নিকট ধরা দিয়াছে। 

শিক্ষা, কৃষি বাণিজ্য, সামরিক শক্তিতে তাহারা অন্যান্য দেশকে পরাভূত করিয়া স্বীয় ধ্বজা উত্তোলন করিতে সক্ষম হইয়াছে। যে জাতিকে প্রতিটি সামগ্রীর জন্য বিদেশের কাছে হাত পাতিতে হয় তাহাদের মর্যাদাবোধ লুণ্ঠিত হয় ফলে হীন বলিয়া প্রতিপন্ন হয়। অভিষ্ট কে লাভ করিতে হইলে অধ্যাবসায় একান্ত প্রয়োজন। অধ্যাবসায় সাফল্যের চাবিকাঠি। জীবনে সধৈর্য চেষ্টার মূল্য অপরিসীম। অধ্যাবসায়ের অভাবে সততা, বিদ্যাবত্তা, সাহস, ক্ষুরধার বুদ্ধি প্রভৃতি গুণাবলী অর্থহীন হইয়া পরে। অধ্যাবসায়ের ফলে জীবন সুন্দরতর হইয়া উঠে। 

৪০। কোভিড-১৯ 

বিশ্বসন্ত্রাসকারী কোভিড-১৯। ইহা করোনা ভাইরাস রোগ যথা কোভিড নামে পরিচিত। এই রোগ সর্বপ্রথম ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে চীনে শনাক্ত করা হয়। ২০২০ সালের প্রথমদিকে বিশ্বে মহামারীর সৃষ্টি করে। এই রোগের প্রারম্ভিক লক্ষণ হিসাবে পরিলক্ষিত হয় জ্বর, সর্দি এবং পরবর্তীতে শ্বাসকষ্ট। 

ইহা সংক্রমিত ব্যক্তির হাঁচি কাশির মাধ্যমে সৃষ্ট বায়ুকণা হইতে ছড়াইয়া পড়ে। মানবদেহে ইহার উপসর্গ ২-১৪ দিনের মধ্যে দেখা দেয়। প্রাথমিক ভাবে ক্রুর মত উপসর্গ দেখা দিলেও অনেকের মধ্যে বমি বমি ভাব, বমি, ডায়রিয়া ইত্যাদি দেখা যায়। করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির দেহে ভাইরাসটি ২১ দিন পর্যন্ত সক্রিয় থাকে বলিয়া বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) অনুমান করিয়াছে। 

ত্রান সৃষ্টিকারী এই রোগের প্রতিরোধে আমাদের সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখিতে হইবে। যেকোনো ব্যক্তির দেহে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ভাইরাস প্রবেশ করিতে পারে বলিয়া জনসমাগম এড়াইয়া চলা প্রয়োজন। নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস করা উচিত। কোন ব্যক্তির সহিত করমর্দন এবং ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হইতে বিরত থাকা উচিত। মাস্ক পরিধান করিয়া বাহিরের প্রয়োজনীয় কাজ করা উচিত। 

কোভিড-১৯ লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ কাড়িয়া লইয়াছে। শিক্ষানুষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য, যাতাযাত ব্যবস্থা সকল কিছু স্থবির হইয়াছিল। লক-ডাউনের ফলে মানুষের অর্থের অভাব, খাদ্যের অভাব, জীবিকার অভাব সর্বত্রই এক অনিশ্চয়তা, অস্থিরতা বিরাজিত ছিল। আপন জনের মৃতদেহ স্পর্শ করাতো দূরের কথা চাক্ষুষ দেখিবারও অধিকার ছিলনা। 

টীকাকরণের ফলে ভারতে আক্রান্তের হার কমিয়াছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখা উচিত আমরা এখনও সম্পূর্ণভাবে কোভিড মুক্ত দেশ হইতে পারি নাই। তাই আপ্তবাক্যটি স্মরণে রাখিতে হইবে। “Prevention is better than Cure

Leave a Reply