SEBA Class-10 Bangla Question Answer| রচনা

SEBA Class-10 Bangla Question Answer| রচনা প্রতিটি অধ্যায়ের উত্তর তালিকায় প্রদান করা হয়েছে যাতে আপনি সহজেই বিভিন্ন অধ্যায় জুড়ে ব্রাউজ করতে পারেন এবং আপনার প্রয়োজন SEBA Class-10 Bangla Question Answer| রচনা এমন একটি নির্বাচন করতে পারেন।

SEBA CLASS 10 (Ass. MEDIUM)

  1. English Solutions
  2. অসমীয়া Questions Answer
  3. বাংলা Questions Answer
  4. বিজ্ঞান Questions Answer
  5. সমাজ বিজ্ঞান Questions Answer
  6. हिंदी ( Elective ) Questions Answer
  7. ভূগোল (Elective) Questions Answer
  8. বুৰঞ্জী (Elective) Questions Answer
  9. Hindi (MIL) Question Answer

SEBA Class-10 Bangla Question Answer| রচনা

Also, you can read the SCERT book online in these sections Solutions by Expert Teachers as per SCERT (CBSE) Book guidelines. These solutions are part of SCERT All Subject Solutions From above Links . Here we have given SEBA Class-10 Bangla Question Answer|  Solutions for All Subjects, You can practice these here.

১। তোমার প্রিয় উৎসব (বিহু) অথবা অসমের জাতীয় উৎসব।] 

প্রতিটি জাতীর-ই একটি নিজস্ব জাতীয় উৎসব আছে। ইহার মধ্যদিয়া ঐ জাতীর নিজস্ব ভাবধারা, আচার-ব্যবহার, চাল-চলন, রীতি-নীতি, খাদ্য-পোষাক প্রভৃতি সকল দিকের এক সার্বিক পরিচয় পাওয়া যায়। 

জাতীয় উৎসবই হইল জাতীর দর্পণস্বরূপ। ইহার মাধ্যমে জাতীর সাংস্কৃতিক জীবনের সামগ্রিক পরিচয় স্পষ্ট হইয়া উঠে। উৎসবের দিনেই প্রাতাহিকতার মালিন্য দূর করিয়া আত্মপরায়ণ জীবনের সংকীর্ণ গন্ডী হইতে মুক্ত হইয়া বৃহত্তর কল্যাণের ক্ষেত্রে মানুষ  মিলিত    হয়। 

আমি আসাম প্রদেশের বাসিন্দা তাই আমার প্রিয় উৎসব হইল বিহু উৎসব। বিহু উৎসব আসামের বসন্ত উৎসব। আসামের বিহু উৎসব কল্যাণ ও মিলনের বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। বিহু উৎসব ব্যাপকতা ও বৈচিত্র্যে, আড়ম্বর ও আনন্দ-কোলাহলে বাংলাদেশের দুর্গোৎসব এবং দক্ষিণ ভারতের পোঙ্গল উৎসবের সহিত তুলনীয়। বিহু উৎসব মূলতঃ ঋতু-উৎসব। ঋতুর আগমনে প্রকৃতির রাজ্যে যে-রূপ রূপান্তর আসে, তাহা মানুষের মনে সহতারিত করিয়া আনে নব নব ভাব-রসের পুলক বন্যা। বিহু উৎসবের সূচনা হয় বৎসরের শেষদিন অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তিতে। জীর্ণপুরাতনকে বিসর্জন দিয়া নবীনের প্রাণময় আবির্ভাবের কামনাই হইল বিহু উৎসবের ভিত্তি। বিহু মূলতঃ সৃষ্টি কামনার উৎসব। বিহু তিন প্রকার- কঙ্গালী বা কাতি-বিহু, ভোগালী বা মাঘ বিহু, রঙ্গালী বা বহাগ বিহু। প্রকৃত পক্ষে রঙ্গালী বিহু উৎসব বর্ণাঢ্য আনন্দ-লীলা-বিলাসের উৎসব। এই সময় উৎসবমত্ত তরুণ-আলীরা ‘বিহু-বলিয়া’—বিহুপাগল হয়। তাহারা ঢোল, বাঁশী ও পেপার মনমাতানো সুরে আকাশে- বাতাসে এক অনবদ্য খুশি-তরঙ্গ তোলে। বাজনার তালে তালে চলে নৃত্য। লাল রঙের মেখলা পরিহিতা তরুণীরা প্রণয়ী যুবকের বাঁশী ও পেপার বাজনার ছন্দে যখন নৃত্য চঞ্চল হইয়া উঠে তখন সত্যই মনোমুগ্ধকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এককথায় বলা যায় তখন সমগ্র আসাম যেন ঢোলের বোলে আর পেপা বাঁশির সুরে এক আনন্দঘন উৎসবের উল্লাসে জাগিয়া উঠে। 

নাচিবার জন্য যুবক-যুবতীরা দলে দলে চলে বিতলীতে। লোকনৃত্য ও লোক-সঙ্গীতে আসাম বিশেষভাবে সমৃদ্ধ। 

বহাগ বিহু মূলতঃ নৃত্যগীত ও ভোজন-উপহারের অনুষ্ঠান। আসামের প্রতিটি গৃহেই বহাগ বিহুর নৃত্যগীতের আয়োজন হয়। আসামের ডেকা-গাভ গণ তখন পুরাতনের জড়িমা ত্যাগ করিয়া নূতনের মন্ত্রে উদ্দীপিত হইয়া উঠে প্রাণোচ্ছল আবেগ এবং অনুভূতিতে। বিহুনৃত্য-গীত সমগ্ৰ অসমীয়া সমাজের যৌথ সৃষ্টি। বিহু-সঙ্গীত কোনো এক কবির রচনা নয় কিন্তু ইহা উৎকৃষ্ট কবি কর্মের প্রশংসার দাবি রাখে। উৎসব স্মৃতিকে অক্ষয় করিয়া রাখার জন্য একে অপরকে স্বহস্তে তৈরী ‘গামছা উপহার দেওয়ার রীতি আছে। বিহু উৎসব শুধু নর-নারীর জীবনেই সীমিত থাকে না, ঐ দিনে গৃহপালিত পশুগুলির প্রতিও যত্ন নেওয়া হয়। মাঘমাসের বিশ্বকে বলে ভোগালী বিহু। এই সময় ঘরে ঘরে পিঠা-পুলি বানানো হয় এবং খাওয়া-দাওয়ার প্রতি বেশী জোর দেওয়া হয়। বিহুর পূর্বের দিনটিকে উরুকা বলা হয়। ঐ দিনই খর-কুটার ঘর বা মেজী ঘর পোড়াইয়া অশুভ শক্তির নাশ করিয়া নদীতে বা পুকুরে স্নান করিয়া নতুন জামা-কাপড় পড়া হয়। আসামের বিহুগীত পরম বিস্ময়ের বস্তু। আসামকে যদি সভ্য জগৎ মনে রাখে, তবে তাহার বিহু নৃত্য ও বিহু-সঙ্গীতের স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত মাধুর্যের জন্যই মনে রাখিবে। 

২। মহাপুরুষ শ্রীমন্ত শংকরদের 

প্রত্যেক দেশেরই জাতীয় জীবনের সামাজিক, ধার্মিক ও আত্মিক সংকটকালে পরিত্রাতা হিসাবে এক একজন ধর্মগুরু মহাপুরুষের আবির্ভাব ঘটে। পঞ্চদশ শতকে অসমিয়া জীবনে মহাপুরুষ শংকরদেবের আবির্ভাব এক অনিবার্য ঐতিহাসিক ঘটনা। আসামের জনজীবনে তাঁহার প্রভাব নবজাগরনের সূচনা করিয়াছিল। তাঁহার ধর্মের মূলকথা সমন্বয়বান ও সর্বমানবতাবাদ। তিনি ছিলেন গৃহী-সন্ন্যাসী। অসামরা সাহিত্যের তিনিই ছিলেন ভিত্তি স্বপরিত। তাহার পুণ্য জীবনের সর্বতোমুখী প্রভাবে সমকালীন ধর্মচেতনা, শিক্ষা সাহিত্য যাবতীয় বিভেদের কবল হইতে মুক্তিলাভ করিয়া অসমিয়া জাতি সুস্থ-সুন্দর-মানবতাবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়। 

শ্রীমন্ত শংকরদেবের প্রভাবে অসমিয়া ধর্মাদর্শ ও সাহিত্য ও নব প্রাণশক্তিতে পুষ্পিত হইয়া উঠে। শ্রীমন্ত শংকরদেব আহোম রাজ্যের নগীয়ের অন্তর্গত আলিপুখুরী গ্রামে আনুমানিক ১৪৪৯ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার পিতার নাম ছিল কুসুম্বর এবং জননী ছিলেন। সত্যসন্ধ্যা। শৈশবে মাতা ও পিতাকে হারাইয়া শংকরদের তাঁহার পিতামহী সুেতী আই কর্তৃক লালিত-পালিত হন। দৈহিক সৌন্দর্য ও বীরবতার জন্য শংকরদের বড়ই খ্যাতিল করিয়াছিলেন। বাল্যকালে শংকর বিদ্যাচর্চায় বড়ই অনাগ্রহ ছিল। পড়ে অনেক চেষ্টায় শংকরদের সেই যুগের অন্যতম পণ্ডিত মহেন্দ্র কন্দলীর পাঠশালায় ভর্তি হন। ক্রমে ক্রমে তাঁহার স্বভাবের পরিবর্তন ঘটে। অল্পকালের মধ্যেই বিদ্যা চর্চায় তিনি অসাধারণ মেধাশক্তির পরিচয় দেন। বালক শংকরদের আট পংক্তির একটি ঈশ্বরস্তোত্র রচনা করিয়া সকলকে বিস্মিত করিয়া দেন।। শিক্ষাগুরু মহেন্দ্র কন্দলী তাহার অসাধারণ ছাত্রটিকে ‘দেব’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এইভাবে শংকর হইয়াছিলেন শংকরদেব।

তাহার জীবনের পরবর্তী অধ্যায় হইল একনিষ্ঠ আধ্যাত্ম সাধনা ও বিদ্যাচর্চার ইতিহাস। বিভিন্ন শাস্ত্রচর্চা, ধর্ম সাধনা করিয়া শংকরদেব এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, ঈশ্বর নিরাকার সর্বব্যাপী ও অব্যক্ত। শ্রীকৃষ্ণই স্বয়ং ভগবান। জ্ঞানমিশ্রিত ভক্তি অবলম্বন করিয়া শ্রীকৃষ্ণের কৃপা লাভ করা যায়। কেবল নাম-সংকীর্তনই হইল শ্রীশ্রীশংকরদেবের প্রবর্তিত একশরণ নামধর্ম, মহাপুৰুষীয়া ধর্ম বা ‘নববৈষ্ণব ধর্ম’। এই ধর্মাদর্শ হইল সমন্বয়বাদী, সর্বমানবিক। অস্পৃশ্যতা, জাতিভেদ, জীবহিংসা অবশ্য বর্জনীয়। তাহার ধর্মোপলব্ধির সার কথা হইল ‘কুকুর চণ্ডাল গর্দভরো আত্মারাম, জানিয়া সবাকো পরি করিবা প্রণাম’। 

প্রকৃতপক্ষে শংকরদেব ছিলেন অনাশক্ত গৃহী। শুধু ধর্মজীবনের পরিত্রাতাই নহে, তিনি অসমিয়া সাহিত্যের ভিত্তি স্বপয়িতারূপেও তিনি স্মরণীয়। তাঁহার রচিত ‘বরগীত’ আসামের সামাজিক জীবনের মঙ্গল-সঙ্গীত হিসাবে গৃহীত হইয়াছে। শংকরদেব ১৫৬৯ খ্রিস্টাব্দে মরদেহ ত্যাগ করিয়া স্বর্গধামে প্রস্থান করেন। 

অসমিয়া জনজীবনের ধর্মীয় ও সামাজিক-সংস্কৃতির মূলে শংকরদেবের অবদান সর্বাধিক। শংকরদেব অসমের জাতীয় জীবনে এক নবজাগরনের সূত্রপাত ঘটাইয়া স্বনামধন্য হইয়াছেন। 

৩। স্বচ্ছ ভারত অভিযান 

“Cleanliness is next to Godliness” স্বচ্ছতা সুস্থতার প্রতীক। স্বচ্ছতা জীবনকে রুচিশীল পরিকাঠামোয় গড়িয়া উঠিতে সাহায্য করে। অপরদিকে অস্বচ্ছতা অকৃতকার্যতার জন্ম দেয়। প্রগতির পরিপন্থী। ক্ষেতে আগাছা যেরূপ ফসল নষ্ট করে সেইরূপ অস্বচ্ছতা জীবনকে তমসাচ্ছন্ন করিয়া তুলে। 

জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর ১৫০তম জন্ম-জয়ন্তীতে ২০১৯-এর মধ্যে সমগ্র ভারতকে পরিচ্ছন্ন করিবার উদ্দেশ্যে আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র ভাই দামোদর দাস মোদী “স্বচ্ছ ভারত অভিযান” নামে একটি সুন্দর এবং নূতন অভিযানের সূচনা করেন। পরিচ্ছন্ন ভারত দেশবাসীকে উপহার দিবার জন্য প্রধানমন্ত্রীর এইরূপ পদক্ষেপ। 

পরিবেশ দূষিত হইবার দুইটি কারণের মধ্যে একটি প্রাকৃতিক এবং অপরটি মনুষ্যসৃষ্ট। সৌর ঝড়, ধূলার ঝড়, অগ্ন্যুৎপাত, দাবাগ্নি এইগুলি প্রাকৃতিক কারণের অন্তর্ভুক্ত হইলেও স্বয়ং প্রকৃতি বৃষ্টিপাত, তুষারপাত ইত্যাদি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দূষণকে শোষণ করে। অপরপক্ষে মনুষ্য সৃষ্ট দূষণ প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে পরিবেশকে এরূপভাবে দূষিত করিতেছে যে মানব- জীবন এখন প্রশ্নচিহ্নের সম্মুখীন হইয়াছে। ভারতে দূষণ এইরূপ একটি রূপ পরিগ্রহণ করিয়াছে যে গ্লোবাল ওয়ার্মিং ঘটিবার পূর্বেই ইন্ডিয়া ওয়ার্মিং ঘটিতে চলিয়াছে। ইহার কারণ আমরা নিজেরাই। কল-কারখানার বর্জ্য পদার্থ, সমস্ত পচনশীল বস্তু নদীতে ফেলিয়া জল দূষিত করিতেছি। কল-কারখানা এবং অসংখ্য যানবাহনের অনল নিশ্বাসে আবহাওয়া হইল উষ্ণ। শিল্পায়নের ফলে গ্রীন হাউস গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বায়ুদূষণ ঘটিতেছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে সমস্ত কুঅভ্যাসগুলি নিরন্তর পরিবেশকে দূষিত করিয়া চলিতেছে সেই গুলি নিজেদেরই নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। 

নালা-নর্দমায় আবর্জনা সহ পলিথিন ফেলা, হোটেলের বর্জ্য পদার্থ এবং নষ্ট খাদ্য, অসুস্থ মানুষের মলমূত্র খাওয়ার পর প্লাস্টিকের থালা, বাটি, গ্লাস অবলীলায় রাস্তার দুই পারে ফেলিয়া রাখি। যেখানে-সেখানে পানের পিক ফেলা, রাস্তায় মূত্র আগ, গৃহের সারাদিনের আবর্জনা রাস্তারা ফেলিতে আমরা দ্বিধাবোধ করিনা। ইহা যেন স্বাভাবিক বলিয়া ভাবি। প্রকৃতপক্ষে নোংরামিটা আমাদের অস্থি-মজ্জায় মিশিয়া আছে। 

অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ আমাদের দৈহিক স্বাস্থ্যের কেবল ক্ষতি করেনা, আমাদের মানসিকতাও বিকৃতি ঘটায়। অসুন্দরের হাতছানিতে সৌন্দর্য, সম্ভ্রম বোধ হারাইয়া যায়। সেইজন্য সমাজে বিভিন্ন অত্যাচার, শোষণ, ধর্ষণ, হত্যা, অপহ ণ ইত্যাদি ন্যক্কারজনক ঘটনা অহরহ ঘটিতেছে। মানুষের মানসিকতা এখন তমসাচ্ছন্ন। 

মানবজীবনে সুন্দর রুচিবোধ অত্যন্ত প্রয়োজন। উপদেশের চাইতে উদাহরণ শ্রেষ্ঠ” ইহা মনে রাখিয়া আমরা যদি এইরূপ অভিযানে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করিয়া স্বচ্ছ পরিবেশ রচনা করিতে সক্ষম হই তাহা হইলে পরবর্তী প্রজন্ম অনায়াসে সেইরূপ অভ্যাস গঠনে অভ্যস্ত হইবে। শৈশব কাল হইতেই এই শিক্ষা জীবনে এক সুন্দর স্বাস্থ্যসম্মত ভিত গড়িয়া তুলিবে। স্বচ্ছ ভারত গড়িতে হইলে মনের নোংরামি প্রথমে দূর করিতে হইবে। নিজের মনে নোংরামি পুষিয়া রাখিয়া বাহিরের জগতকে পরিস্কার করা অসম্ভব। প্রকৃতপক্ষে স্বচ্ছতা- অস্বচ্ছতা, শ্রীলতা-অশ্লীলতা, সভ্যতা-অসভ্যতা এইসকল বোধ মানসিক। সেইজন্য মন নির্মল না হইলে স্বচ্ছতা মনে স্থান পায় না। তাই করিব লেখনীতে ধ্বনিত হইয়াছে। “

অন্তর মম বিকশিত কর।” 

৪। তোমার প্রিয় গ্রন্থ 

(সংকেত সূত্র ঃ সূচনা গ্রন্থ পাঠের অভ্যাস – প্রিয় গ্রন্থের নাম ও বিষয়বস্তু কেন প্রিয় উপসংহার)। 

উত্তর ঃ বাংলা সাহিত্য ভাণ্ডার হইতে কোনো একটি বিশেষ গ্রন্থকে প্রিয় বলিয়া চিহ্নিত করা সত্যই দুঃসাধ্য। তবে ব্যক্তিগত রুচির উপর নির্ভর করিয়া প্রিয় গ্রন্থের নাম অবলীলায় বলা যাইতে পারে। বিভিন্ন পাঠকের রুচি, মানসিকতা বিভিন্ন বলিয়া একই গ্রন্থ বিভিন্ন পাঠকের নিকট বিভিন্ন আবেদন উপস্থিত করে। 

কিশোর বয়স হইতেই ছড়া, ঠাকুরমার ঝুলি, ঠাকুরদাদার থলে পাঠ করিয়া সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ জন্মিয়াছিল। তাহার পর হইতে বিভিন্ন লেখকের রচিত বিভিন্ন গল্প পাঠ করা ফে অভ্যাসে পরিণত হইয়াছিল। ইহা ছাড়াও বইমেলার বিভিন্ন দোকানে ঘুরিয়া ঘুরিয়া অনেক বই সংগ্রহ করিয়া পাঠ করিয়াছি। লেখকদের রচনাসম্ভার আমার মনের বন্ধ দরজা খুলিতে সাহায্য করিয়াছে। 

আমার প্রিয় গ্রন্থ হইতেছে কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘শ্রীকান্ত’ প্রথম পর্ব। গ্রন্থটিয়ে শ্রীকান্ত এবং ইন্দ্রনাথ নামে দুই কিশোর বালকের জীবনের বিচিত্র কাহিনি এবং অভিজ্ঞতা বর্ণিত হইয়াছে। 

স্কুলের মাঠে বল খেলাকে কেন্দ্র করিয়া যে মারামারি করিয়াছিল সেই মুহূর্তে আকস্মিক ভাবে ইন্দ্রনাথের সহিত শ্রীকান্তের পরিচয় ঘটে। ব্যাঘ্ররূপী শ্রীনাথ বহ্মপীর আবির্ভাবে বাড়ির সকলে যখন ভীত, সন্ত্রস্ত তখন সাহসী ইন্দ্রনাথ সকলকে রক্ষা করে। গঙ্গাবক্ষে নিশীথ রাত্রে মাছ চুরি করা, সাপ ধরিবার মন্ত্র শিখা প্রভৃতি দুঃসাহসিক অভিযানের নায়ক ইন্দ্রনাথের সহযাত্রী হয় শ্রীকান্ত। শ্রীকান্ত প্রথম পর্বের প্রধান চরিত্র শ্রীকান্ত, ইন্দ্রনাথ এবং রাওলেম্বী। অপ্রধান চরিত্রগুলির মধ্যে নতুনদা, পিসেমশাই, পিসিমা, মেজদা, শাহজী, অন্নদাদি প্রভৃতি। 

গ্রন্থটি পাঠ করিতে করিতে আমি যেন দুই কিশোরের সহিত একাত্ম হইয়া যাই। ইন্দ্রনাথ ডানপিটে, দুর্জয় সাহসী হইলে ও তাহার ছোট বুকখানি যেন অপরিসীম স্নেহ, করুণা ও মমতায় পূর্ণ। নায়ক শ্রীকান্ত ভবঘুরে, সে জীবন-পথের বর্ণনা দাতা। তাহার কোমল হৃদয়ের উপলব্ধিতে, মমত্বের স্পর্শে তাহার বর্ণিত চরিত্রগুলি জীবন্ত হইয়া সকল পাঠকের হৃদয়-মন স্পর্শ করে। সেইজন্য গ্রন্থটি আমার প্রিয় মনে হয় গ্রন্থটি আমার মত সকল কিশোরের প্রিয় হইবে। 

প্রিয়-অপ্রিয় চিরন্তন নহে। বয়সের পরিবর্তনে রুচির পরিবর্তন ঘটিলে ও কালজয়ী সৃষ্টিতে গ্রন্থখানি সকলের হৃদয়ে অক্ষয়, অমর হইয়া থাকিবে। 

৫। পরিবেশ প্রদূষণ ও ইহার প্রতিকার 

সমগ্র পৃথিবীতে বিজ্ঞানী তথা বুদ্ধিজীবীরা আজ যে কয়টি প্রধান সমস্যার সমাধানে ব্যস্ত আছেন, ইহাদের একটি অন্যতম সমস্যা হইল পরিবেশ প্রদূষণ। আদিযুগে পরিবেশ এমন ছিল না; বায়ুমণ্ডল ছিল নির্মল, জল ছিল বিশুদ্ধ, মাটি ছিল ঘাঁটি। কিন্তু আধুনিক যন্ত্র সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশে শুরু হইল প্রদূষণ। কল-কারখানা নিঃসৃত ধোঁয়ার নিসর্গ প্রকৃতির আকাশ-বাতাস আজ কালিমাযুক্ত হইয়া উঠিয়াছে। মানুষের জৈবিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য যানবাহন ও যন্ত্রপাতিগুলি পরিবেশকে দূষিত করিতেছে। যন্ত্র পরিত্যক্ত জঞ্জাল নদী-নালায় জলের বিশুদ্ধতা নষ্ট করিতেছে। কীট নাশক নানা প্রকারের ঔষধ প্রয়োগের ফলে মাটির খাঁটিত্ব নষ্ট করিয়া ফসলের মাধ্যমে মানবদেহে বিষ প্রয়োগ হইতেছে। জৈবিক প্রয়োজনে গাছপালা ধ্বংসের ফলে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের পরিমাণ হ্রাস পাইতেছে। পারমাণবিক তথা বৈজ্ঞানিক নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলে সূর্যরশ্মির বিশুদ্ধতাও নষ্ট হইতেছে। পঞ্চভূতে গঠিত প্রকৃতির পাঁচটি উপাদান পঞ্চভূতে গঠিত মানবদেহকে করিতেছে দুষিত। 

মানুষ যেদিন হইতে আগুনের আবিষ্কার শিলি, সেইদিন হইতে বায়ুতে অক্সিজেনের পরিমাণ হ্রাস পাইতে শুরু করিল। এদিকে গাছপালা বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করিয়া অক্সিজেনের ভারসাম্য রক্ষা করিত। কিন্তু মানুষ আজ নিজেদের প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে অরণ্য ধ্বংস করিতেছে। ইহাছাড়া বাষ্পশক্তি ও বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদনের মূলেও রহিয়াছে অক্সিজেন দহন। অধুনা পারমাণবিক ক্রিয়া-কলাপের মূলেও রহিয়াছে অক্সিজেনের দহন লীলা। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে নাগাসাকি ও হিরোসিমার উপর যে বোমা বর্ধিত হইয়াছিল। = মানুষ জীবজন্তু ও গাছপালার উপরও ইয়ার প্রভাব পড়িয়াছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং উহা হইতে সুযোগ-সুবিধা লাভের আশায় মহাকাশে আজ যে সমস্ত রকেট ও কৃত্রিম উপগ্রহাদি প্রেরিত হইতেছে, উহাদের নিঃসৃত গ্যাসও পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে দূষিত করিতেছে। বায়ুমণ্ডলের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার-এর ‘ওজন’ গ্যাস ইহার সমতা রক্ষা করিতে পারিতেছে না। ইহার ফলে সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মি বা আলট্রা ভায়োলেট রে’ পৃথিবীতে আসিয়া প্রাণ সম্পদের অনিষ্ট সাধন করিতেছে। 

আধুনিক পৃথিবীতে পরিবেশ প্রদূষণের জন্য বিশেষ করিয়া মানুষই দায়ী, আর সম প্রাণিজগৎ ইহার ফলভোগী। অরণ্যের বৃক্ষাদি ধ্বংস হওয়ায় বায়ুমণ্ডলের গ্যাসের ভারসাম্য বিনষ্ট হইয়াছে। ইহার ফলে পৃথিবীতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ হইয়াছে অস্বাভাবিক। ঋতুকালীন বৃষ্টিপাত না হওয়ার ফলে শস্য উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটিতেছে; বহু মূল্যবান প্রাণী ও উদ্ভিদ পৃথিবী হইতে চিরতরে ধ্বসে হইয়া যাইতেছে। মনুষ্যকুলেও রোগ-ব্যাধির প্রকোপ বৃদ্ধি পাইতেছে। দূষিত বায়ুমণ্ডল ও দূষিত জল রোগ-জীবাণুর বংশবৃদ্ধির অনুপম ক্ষেত্র। ফলে মানব সমাজে আজ যক্ষ্মাদি শ্বাসরোগ, অন্যান্য ক্ষয়রোগ, উদরাময়, রক্তদৃষ্টি, স্নায়ুরোগ প্রভৃতি দুরারোগ্য ব্যাধি আপন প্রভাব বিস্তার করিয়া চলিয়াছে। 

ভারতের পরিবেশ প্রদূষণজনিত মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দের ২ ডিসেম্বর মধ্যপ্রদেশের ভূপালে। পৃথিবীর ইতিহাসে ইহাকে ভূপালের ভয়াবহ গ্যাস দুর্ঘটনা বলা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে এখানে ইউনিয়ন কার্বাইডের বিরাট কীটনাশক ঔষধ প্রস্তুতের কারখানা স্থাপিত হয়। কারখানার পাঁচটি ট্যাঙ্কের একটিতে উৎপন্ন হইত বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস, একটিতে ফসজিন গ্যাস এবং অবশিষ্ট তিনটিতে মিথাইল আইসো সায়োনেট বা সংক্ষেপে ‘মিক গ্যাস দুর্ঘটনার দিন মধ্যরাত্রে ‘মিক’-এর ট্যাঙ্কে বিস্ফোরণ ঘটিল, দেখিতে না দেখিতে শহরের চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িল প্রাণঘাতী এই গ্যাস। কারখানার নিকটস্থ বস্তিতে ঘটিল সর্বাপেক্ষা অধিক অঘটন। বহু আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা এই গ্যাসের বিক্রিয়ায় হইল নিহত, বহুলোক হইল চিরতরে অন্ধ বা পঙ্গু। তারপর বিকলাঙ্গ বা পঙ্গু অবস্থায় সেখানে পরবর্তীকালে মাতৃজঠর হইতে শিশুরা ভূমিষ্ঠ হইতে লাগিল। এই দুর্ঘটনায় প্রায় দেড় হাজার লোকের মৃত্যু ঘটে। অগণিত (যাহার সংখ্যা এখনও নির্ণীত হয় নাই) লোক বিকলাঙ্গ বা পঙ্গু অবস্থায় শেষে ভয়ঙ্কর দিনের অপেক্ষা করিতেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রেডক্রস সোসাইটি ইতিমধ্যে দুর্গতদের কিছুটা অর্থ সাহায্য দিয়াছে। কিন্তু এত বড় দুর্ঘটনার পরও এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলি তেমন সজাগ ও সাবধান হইতেছে না। সরকারী বিধি-নিষেধকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখাইয়া বড় বড় শহরেও আয় মারাত্মক সব কারখানাগুলি সগর্বে মাথা উঁচু করিয়া চলিতেছে। এই ব্যাপারে বিভিন্ন রাজা তথা কেন্দ্রীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলিকে দুর্নীতিমুক্ত করিয়া পরিবেশ প্রদূষণের কবল হইতে প্রাণিজগতকে যতটুকু সম্ভব রক্ষা করা আবশ্যক। সমস্যাটি এককভাবে কোন একটি দেশের বা রাজ্যের নয়, সমগ্র বিশ্বে ইহার প্রভাব ছড়াইয়া পড়িয়াছে। কিছুদিন পূর্ব পর্যন্ত দক্ষিণের হিম মহাদেশ আন্টার্কটিকা ছিল প্রদূষণমুক্ত। সম্প্রতি সেখানকার পরিবেশেও প্রদূষণের ছোঁয়া লাগিয়াছে। 

সম্প্রতি রাষ্ট্রসংঘের উদ্যোগে বিশ্ব পরিবেশ প্রদূষণ প্রতিরোধ করিবার জন্য ৫ই জুনকে বিশ্ব-পরিবেশ দিবসরূপে পালন করিবার সিদ্ধান্ত লওয়া হইয়াছে। আজ পৃথিবীর সর্বত্র দরকার পরিবেশ বিশুদ্ধীকরণ। ইহার জন্য সকলকে আগাইয়া আসিতে হইবে। বৃক্ষরোপণে উৎসাহ দিতে হইবে, পুরাতন ইঞ্জিনাদি হইতে ধোঁয়া যত কম বাহির হয় তাহার ব্যবস্থা করিতে হইবে, পরিত্যক্ত জঞ্জাল নদী-নালায় বা যেখানে-সেখানে না ফেলিয়া পুড়াইয়া ফেলিবার ব্যবস্থা করিতে হইবে, অশিক্ষিতদের পরিবেশ সম্বন্ধে সজাগ করিবার জন্য পরিবেশ অধ্যয়নের ব্যাপক ব্যবস্থা করিতে হইবে। বায়ুমণ্ডলে ব্যাপকহারে রকেটাদি উৎক্ষেপণ বা মহাকাশে অনাবশ্যক পরীক্ষা-নিরীক্ষাজনিত বিস্ফোরণ সীমিত করিতে হইবে, জলের বিশুদ্ধতা রক্ষা করিতে হইবে, লোকালয়ের আশে পাশে কল-কারখানা স্থাপন বন্ধ করাইতে হইবে, অন্যথায় পৃথিবীর প্রাণিজগতকে অকালমৃত্যুর কবল হইতে রক্ষা করা যাইবে না। 

৬। ছাত্রসমাজ ও রাজনীতি 

সূচনা : ছাত্রজীবন হইতেই পূর্ণাঙ্গ সামাজিক মানুষ হিসাবে গড়িয়া উঠিবার সাধনা করিতে হয়। প্যয়ন ছাত্রদের তপস্যা বটে, কিন্তু একমাত্র কর্তব্য নহে। কালের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আজিকার ছাত্রজীবনের আদর্শও পরিবর্তিত হইয়াছে। আজ ছাত্র সমাজের সম্মুখে আসিয়াছে এক নতুন যুগ, আসিয়াছে নতুন জিজ্ঞাসা, তাহারা রাজনীতির ডাকে সাড়া দিবে কিনা? স্বভাবতাই এই প্রশ্নে ছাত্র-সমাজ সংশয়-বিমূঢ়, অভিভাবকগণ চিন্তাকুল, দেশনেতারা সন্ত্রস্ত এবং শিক্ষক অধ্যাপকগণ বিরক্ত। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সমাজ-বিন্যাস ভিন্ন; জীবনাদর্শ ভিন্ন। কিন্তু ভারতের মতো দেশে যেখানে ছাত্রগণ গৃহে কৃপার পাত্র, সমাজে উপহাসের পাত্র ও বিদ্যালয়ে শাসনের পাত্র সেইখানে রাজনীতিতে ছাত্রদের যোগদানের প্রশ্নে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। এই যুগে একজন গ্রন্থনিবিষ্ট শিক্ষার্থী হইতে সর্ববিষয়ে উৎসাহী ও সক্রিয় ছাত্র অনেক বেশি প্রশংসাভাজন। 

প্রাচীন ভারতের ছাত্রসমাজ : প্রাচীন ভারতের আদর্শ ছিল ‘ছাত্রানাং অধ্যয়নং তপঃ।’ সেই সময় অধ্যয়নই ছিল ছাত্রজীবনের তপস্যা। সেইদিন সামাজিক সমস্যা এত তীব্র আকারের ছিল না। জীবন-যন্ত্রণা বা জীবন সংকট তখন ছিল অনুপস্থিত। সমাজের জীবন দর্শনই ছিল ‘পরমার্থ’। দুঃখ-দারিদ্র ছাত্রদের বিচলিত করিতে পারিত না। তখন কোন সামাজিক আন্দোলন বা রাজনৈতিক বিপ্লব ঘটে নাই। তখন সমাজের অনুকূল পরিবেশে ছাত্রদের বিদ্যাচর্চার ক্ষেত্র গড়িয়া উঠিয়াছিল। 

বিংশ শতাব্দীর ছাত্রসমাজ : ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর পাশ্চাত্য জীবন তরঙ্গ যুগান্তরের ছাত্র সমাজকে নাড়া দিয়াছে। পাশ্চাত্য জীবনাদর্শ ক্রমে সঞ্চারিত হইল ছাত্র সমাজের জীবনে। আসিল সামাজিক উত্থান-পতন, আসিল জীবন-যন্ত্রণা বা জীবন-সংকট। সঙ্গে ছাত্র উচ্ছৃঙ্খলতা আর সেই দিন হইতে ছাত্রগণ রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজ কল ক্ষেত্রেই জড়াইয়া পড়িল সত্যানুসন্ধানের দুশ্চর তপস্যায়। 

বিংশ শতাব্দীতে ভারতবর্ষে স্বাধীনতার জন্য বহু আন্দোলন সংঘটিত হইয়াছে। প্রতিি আন্দোলনেই ছাত্র সমাজের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। পৃথিবীর অন্যান্য স্বাধীন স্বাধীনতাকামী দেশগুলির দিকে তাকালেই দেখা যায় যে স্বাধীনতার যুদ্ধে ছা যুবশক্তিই হইয়াছে আন্দোলনের প্রধান শক্তি। তাই স্বদেশের ও বিদেশের ইতিহাস দেখিলে ছাত্র ও রাজনীতির সম্পর্কটি বেশ পরিষ্কার হইয়া উঠে। বর্তমান সামাজিক সংকটে ছা যদি বিচলিত হয়, তবে আশ্চর্য হইবার কোন কারণ নাই। আজকাল ছাত্রদের রাজনীতি হইতে সরিয়া দাঁড়াইতে বলিয়া পুঁথিতে ফিরিয়া যাইতে নির্দেশ দিলেও তাহা তাহাদের পক্ষে কতটুকু যুক্তিসঙ্গত হইবে তাহা ভাবিবার বিষয়। 

ছাত্রসমাজ :রাজনীতি : আজকাল আমাদের জীবনে রাজনীতির সার্বিক প্রাধান্য। অনস্বীকার্য। আজকাল শিল্পে, সাহিত্যে, শিক্ষায় রাজনীতিবিদদের মতামত যতখানি গুরুত্ব দেওয়া হয়, কোন প্রকৃত সমালোচকের মতামতকে ততখানি গুরুত্ব দেওয়া হয় না। রাজনৈতিক নেতাগণ এই যুগের সিংহাসনহীন দেবতা। রাজনৈতিক সচেতনতাই গণতন্ত্রের সাফল্য। তাই ছাত্রগণ রাজনৈতিক সচেতন হইয়া উঠিবেই। ছাত্র জীবনের উত্তর পর্বে ছাত্রদের কোন স্থির লক্ষ্য না থাকায়, কর্ম সংস্থান ও জীবিকা নির্বাহের কোন নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি নাই। তাই ছাত্রদের রাজনীতিতে ঝাপাইয়া পড়াটা নিতান্তই স্বাভাবিক। 

শুধুমাত্র ভারতেই নহে সমগ্র পৃথিবীতে আজ ছাত্রগণ রাজনীতি-সচেতন হইয়া উঠিতেছে। পৃথিবীতে ছাত্রদের কাছে দেখা দিয়াছে এক বিশাল নৈরাশ্যের অন্ধকার। তাহাদের নিকট এই অন্ধকারে, রাজনীতিই কেবল মাত্র আলোর শিখা। 

উপসংহার : তবু মনে রাখা উচিত, ছাত্রগণ স্বভাবতঃই অপরিণত-বুদ্ধি সম্পন্ন। রাজনীতি ধুরন্ধরগণ ছাত্রদেরকে তাঁহাদের রাজনৈতিক অভীষ্ট সিদ্ধির উদ্দেশ্যে নানা কাজে নিয়ো করেন। ইহাতে ছাত্রগণই রাজনৈতিক শহিদ হয়। ইহা বন্ধ হওয়া উচিত। 

৭। আসামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য 2 

আসাম প্রকৃতির লীলাভূমি। বিধাতা যেন সমস্ত সৌন্দর্য অকৃপণ হস্তে এখানে ঢালিয়া দিয়াছেন। আসাম অসামান্যা হইয়া উঠিয়াছে। 

ভারতের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত আসাম। চারিদিকে শ্যামল সবুজের সমারোহ। পাহাড়, নদী, ঝর্ণায় আবৃত আসাম, যেন প্রকৃতির নন্দন কানন। বিভিন্ন ঋতুর আগমনে আসাম লাস্যময়ী হইয়া উঠে। মাঠে-ঘাটে, পাহাড়ে-পর্বতে, বনানীতে সর্বত্রই যৌবনের পূর্ণ প্রকাশ। পাহাড়ী অঞ্চলে রৌদ্রের লুকোচুরি খেলা, রঙ্গ-বেরঙ্গের ফুলের মেলা, জান- অজানা পাখির কল-কাকলী মানুষের মনে আনন্দের উচ্ছলতা আনে। সোনালী ধানের

প্রান্তরে সোনালী রৌদ্রের উজ্জ্বলতা আকর্ষণীয় করিয়া তোলে তাঁহার রূপকে। এক অপূর্ব দৃশ্য। বিস্তীর্ণ প্রান্তর জুড়িয়া চা-বাগানের চায়ের গাছগুলির মাঝে মাঝে আমলকী গাছের সারি দেখিয়া মনে হয় যেন তাহারা পাহারাদারের কর্তব্যে নিযুক্ত। আসামের মধ্য দিয়া প্রবাহিত দীর্ঘতম নদ ব্রহ্মপুত্র। আসামের প্রাণ, আসামের ভরসা, কখনও সে শাস্ত কখনও সে অশান্ত, কখনও তাহার সৌন্দর্য উদ্ভিন্ন যৌবনার মত আবার কখনও হিংস্র নাগিনী। ভীষণ তাণ্ডবে দুই কুল প্লাবিত করিয়া সগৌরবে আপন অস্তিত্বের ঘোষণা করিয়া প্রবাহিত হয়। সাত বোনের দেশ এই আসাম। বিভিন্ন জাতি-উপজাতির সংগম স্থল। বিভিন্ন সংস্কৃতির মিলন ক্ষেত্র। উৎসবের বৈচিত্র্য তাহাকে অনিন্দ্য সুন্দর করিয়া তুলিয়াছে। পাহাড়ে ঘেরা এই আসামের সূর্যোদয় এক অপূর্ব দৃশ্য। নতুন দিনের আগমন ঘোষণা করিয়া প্রভাত সূর্যের রক্তিম আভা তুষারাবৃত পাহাড়ের চূড়াগুলিকে মোহময়ী আকর্ষণীয় করিয়া তুলে। শিলঙের বিডন, বিশপ জলপ্রপাত দেখিয়া মনে হয় কোন্ পাষাণ বক্ষ এত জলরাশিকে যুগ যুগান্তর ধরিয়া সঞ্চিত করিয়া রাখিয়াছে? অবিশ্রান্ত এই মনোহর জলপ্রপাত দেখিয়াই হয়তো কবি রচনা করিয়াছেন কবিতা। “বর্ণা, কর্ণা সুন্দরী ঝর্ণা/তরলিত চন্দ্রিকা চন্দন বর্ণা।” যুগে যুগে বিভিন্ন কবি। বিভিন্ন লেখক আসামের সৌন্দর্যে আকৰ্ষিত হইয়া সাহিত্য সম্ভারকে সমৃদ্ধ করিয়াছেন। 

আসামের সৌন্দর্যের আরও একটি উপকরণ কাজিরাঙ্গা, মানসের বিস্তৃত বনাঞ্চল। হাতী, গণ্ডার প্রভৃতি বিভিন্ন বন্যপ্রাণী। পরিচিত-অপরিচিত বিভিন্ন বিহগ-বিহগীর সুমধুর কলতান বৈচিত্র্যের সৃষ্টি করিয়াছে। 

আসামের বুকে জড়াইয়া রহিয়াছে বহু পৌরাণিক এবং ঐতিহাসিক কাহিনী। যেগুলির অন্বেষণে ঐতিহাসিক এবং পর্যটকেরা আকর্ষিত হন। নীলাচল পাহাড়ে দেবী কামাখ্যার মন্দির, তেজপুরে বান রাজার প্রতিষ্ঠিত “মহাভৈরব” শিবমন্দির। ঊষা এবং অনিরুদ্ধের কাহিনী বিজড়িত ‘অগ্নিগড়’, ‘দহ পৰ্বতীয়া’, উমানন্দ’, ‘বশিষ্ঠাশ্রম’, ‘অশ্বক্লান্ত দর্শনীয় স্থান। প্রাচীন অহোম রাজাদের কীর্তি কাহিনীর প্রমাণ বহন করে জয়দৌল। জয়সাগর, রংঘর, শ্রীমন্ত শঙ্করদেবের স্মৃতিতে নির্মিত “শঙ্করদের কলাকেন্দ্র” মানুষকে আকর্ষণ করে। সবশেষে ইহাই বলা সংগত যে আসাম এক অতুলনীয় রাজ্য। সর্বত্রই তাঁহার সৌন্দর্য বিরাজমান। 

৮। আসামের কুটীর শিল্প 

প্রকৃতির স্রষ্টা অতুলনীয় সুন্দরী অসম মাতাকে সৃষ্টি-কৌশলের সকল প্রকার অকৃপণ মহিমা দ্বারা মনোহর ও মনোরম করিয়া সৃষ্টি করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই। আসাম মাতাকে প্রকৃতির বুকের সকল সম্ভারেই ঐশ্বর্যশালী করিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন। তাই রামাক্ষা মহাভারতের যুগ হইতেই অসম-কামরূপ ঐশ্বর্য এবং কলা-সংস্কৃতির অক্ষয় ভাণ্ডার রূপে পরিগণিত হইয়া আসিয়াছে। শিল্পকলার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসমের খ্যাতি এক সময়ে বিশেষ সুনাম অর্জন

করিয়াছিল, কিন্তু কালের অমোঘ পরিবর্তনে অসম আজ ভারতবর্ষের ভিতরে সবচেয়ে পশ্চাৎপদ রাজ্য। অতুল ঐশ্বর্য ভাণ্ডারের জন্য যেমন করিয়া অসম সোনার অসম বলিয়া খ্যাতি হইয়াছিল, সেইরাপ কুটীর শিল্পের জন্যও আসামের নাম সমগ্র ভারতে ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। একদা অসম কুটীর শিল্পে শ্রেষ্ঠ আসন লাভ করিয়াছিল। অসমের এরী, মুগা, পাট, কপাহী (কার্পাস), বয়নশিল্প, কাঁসা-পিতলের নানাপ্রকার বাসন তৈরির শিল্প, কাষ্ঠ শিল্প, বাঁশ ও বেত শিল্প, মাটির বাসন তৈরির শিল্প, হাতির দাঁতের শিল্প, সোনা-রূপার শিল্প, লৌহ, স্থপতি ও ভাস্কর্য শিল্প ইত্যাদি প্রায় একশত কুটীর শিল্প আসামের বুকে দাপাইয়া চলিয়াছিল এবং অসমকে স্বাবলম্বী করিয়া তুলিতে সাহায্য করিয়াছিল। আবহমান কাল হইতেই অসম বয়ন-শিল্পে ভারত বিখ্যাত ছিল। একদা আসামের পাট, মুগা ও রেশমী বস্ত্র দিল্লী-আগ্রার মোগল হারেম সমূহে আলোড়নের সৃষ্টি করিয়াছিল। চিত্রলেখার অপূর্ব সাজপোশাক কুমার অনিরুদ্ধকে বিস্ময় বিমোহিত করিয়াছিল। 

কাঁসার ও পিতলের শিল্পের জন্য অসম একদা ভারত বিখ্যাত ছিল। রহার কাঁসার বাসনের খ্যাতি সমগ্র অসমবাসী জানে। হাজো, সবেরী অঞ্চলের শিল্প আজও প্রাচীন ঐতিহ্য এবং গৌরব বহন করিতেছে। বিভিন্ন ধরনের কাঁসা-পিতলের বাসন-বর্তন, বাটা, শরাই প্রভৃতি আজও সম্মানের সামগ্রী হইয়া আছে। কাষ্ঠশিল্পে আসাম অসমীয়া জাতীয় গৌরব বহন করে। অসমীয়া শিল্পীর তৈরি বেদীর সিংহাসন, বিষ্ণুমূর্তি, নানাপ্রকার মুখোস, আসবাবপত্র যথেষ্ট সমাদরের সামগ্রী। হাতীর দাঁতের শিল্প অসমীয়া শিল্পীদের এক অতি পুরানো গৌরবোজ্জ্বল শিল্প। অসমে পূর্বে প্রচুর হাতীর দাঁত পাওয়া যাইত। ইহা হইতে শিল্পীগণ নানা প্রকার কারুকার্যখচিত অলঙ্কার তৈরি ছাড়াও তাঁহারা মসৃণ পাটী তৈরি করিত। ঐরূপ পাটী এখন আর নাই। কেবল মাত্র দুই-একটি সত্রে ইহা দেখা যায়। আসামের সোনারীর কারুকার্য খচিত সোনার অলঙ্কার অতি আদরের দ্রব্য ছিল। লোহার তৈরি নানা প্রকার প্রয়োজনীয় সামগ্রী অসমে অতি বিখ্যাত ছিল। 

অসমের পুরানো মঠ ও মন্দির, দৌল-দেবালয়গুলিতে এক ধরনের ইট ব্যবহার করা হইত। এইগুলি মাস-কলাই, বরাচাউল, বরালি মাছ – ডিম প্রভৃতি দ্রব্য মাটির সহিত মিশাইয়া তৈরি করা হইত। ইহা পাথরের মত শক্ত ছিল। জয়দৌল, শিবদৌল, রংঘর, কারেং ঘর, তলাতল ঘর এবং আসামের অন্যান্য স্থানের দেবালয়গুলিতে এই প্রকার ইট ব্যবহার করা হইয়াছিল। কিন্তু কালের পরিবর্তনে এই শিল্প এখন লুপ্ত হইয়া গিয়াছে। অসমের বিভিন্ন পর্বতবন্দরে, গুহা-গহ্বরে অবস্থিত শিলায় খোদিত মূর্তিগুলি অসমের ভাস্কর্য শিল্পের এক চরম নিদর্শন। 

অসমে এত প্রকার কুটীর শিল্প থাকা সত্ত্বেও আজ অসম আর্থিক অনটনে জর্জরিত এবং শিল্পের দিক দিয়া অত্যন্ত অনগ্রসর হইয়া আছে। অসমের কুটীর শিল্প আজ ধ্বংসের পথে। ইহার কারণ স্বরূপ যন্ত্র সভ্যতার প্রসার, মানুষের নগরমুখিতা, কাঁচা সামগ্রীর অভাব,

কুটার শিল্পে পরিশ্রম বেশি বলিয়া উপযুক্ত কারিগর ও প্রশিক্ষণের অভাব, এবং মানুষের মধ্যে চাকুরির মনোবৃত্তি গড়িয়া উঠায় এই কুটীর শিল্প আজ লুপ্তপ্রায় হইতে চলিয়াছে। বিজ্ঞানের যতই অগ্রগতি হউক না কেন, তথাপিও অসমীয়া জাতীর ঐতিহ্য বহনকারী কুটীর শিল্পগুলিকে জীবন্ত করিয়া রাখার জন্য সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সক্রিয় ভূমিকা থাকারও চেষ্টা করা উচিত তবেই ইহার গৌরব রক্ষা পাইবে। 

৯। তোমার জীবনের লক্ষ্য 

সূচনা : জীবনে সাফল্য লাভের জন্য সকল মানুষেরই স্বপ্ন থাকা প্রয়োজন। কেবল স্বপ্ন থাকিলেই চলিবে না তাহার সহিত নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকা উচিত। মহাসমুদ্রের নাবিক লক্ষ্য স্থির রাখে বলিয়া অকুল সমুদ্রে ঘুরিয়া মরে না। জীবনের লক্ষ্যকে সফল করিবার পথে বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হইতে হয়। কিন্তু তাহাতে বিচলিত না হইয়া জীবন- তরীকে পৌঁছাইয়া দিতে হইবে সেই লক্ষ্যের বন্দরে। 

লক্ষ্য : আমার জীবনের একটি লক্ষ্য আছে। সেই লক্ষ্য হইতেছে একজন আদর্শ শিক্ষক হিসাবে সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। আমরা এইরূপ সঙ্কল্পে সকলেই বিস্মিত। আমার বন্ধুদের মধ্যে কেহ ডাক্তার, কেহ ইঞ্জিনীয়ার, কেহ আই. এ. এস. অফিসার হইতে চার। কারণ, বর্তমানে জীবনে স্বচ্ছল ভাবে থাকিতে হইলে এই সমস্ত বিদ্যাশিক্ষার প্রয়োজন বলিয়া তাহারা মনে করে। কিন্তু আমি বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রদর্শিত আদর্শ গ্রহণ করিতে ইচ্ছুক। 

লক্ষ্যের কারণ : আমার অভিমত শিক্ষকের জীবনে আর্থিক স্বচ্ছলতা খুব বেশি না। হইলেও সমাজে শিক্ষকের স্থান অনেক উর্ধে। শিক্ষক, তিনি যে কোন শ্রেণীরই হন না কেন নিজ ক্ষেত্রে তিনি আপনাকে উজাড় করিয়া শিক্ষা দান করেন। তিনি একটি মহৎ দায়িত্ব পালনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। শিক্ষকদের বলা হয় জাতির মেরুদণ্ড। প্রাণে প্রাণে জ্ঞানের আলোকবর্তিকা জ্বালাইয়া তিনি সমাজের অন্ধকার দূর করেন। কোমলমতি শিশু এবং যুবক-যুবতীদের ভবিষ্যৎ জীবনে উপযুক্ত করিয়া শিক্ষা দান করেন যাহাতে তাহারা সুপ্রতিষ্ঠিত হইতে পারেন। কেবল পুঁথিগত শিক্ষাই নয় প্রকৃত মানুষ হইবার মন্ত্রে তাহাদের দীক্ষিত করিয়া সুনাগরিক করিয়া গড়িয়া তুলেন। তাহাদের এইরূপ মহৎ প্রয়াস আমার মতে অন্য যে কোন বৃত্তির তলনায় শ্রেষ্ঠ। 

সংকল্পের সাধনা : আমি সাহিত্যের ছাত্র। সাহিত্যে স্নাত্তোকত্তর ডিগ্রী অর্জন করিয়া বি.এড. সম্পূর্ণ করিয়া শিক্ষকতার বৃত্তিতে যোগদান করিব। শিক্ষকতার যোগ্যতা অর্জন সহজ সাধ্য নয়। চারিত্রিক বিশুদ্ধতা বজায় রাখিয়া জ্ঞান ভাণ্ডারের অরূপ রতনের অন্বেষণে নিজেকে নিয়োজিত করিতে সাধনা করিব। ইচ্ছাশক্তির সহিত সাধনা যুক্ত হইলে সফল হইতে পারিব বলিয়া আশা করি।

উপসংহার : একান্ত নিষ্ঠা ও চেষ্টায় সংকল্প সিদ্ধি অনিবার্য। মনেপ্রাণে ইহা বিশ্বাস করি যে সংকল্পে অবিচল থাকিলে বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে দিয়াও সুনিশ্চিতভাবে লক্ষ্যে পৌঁছাইতে পারিব। আমার জীবনের লক্ষ্য কেবল জীবিকা নয়, ইহার সাথে রহিয়াছে একটি মহৎ আদর্শ। দেশের নাগরিক হিসাবে দেশের প্রতি কর্তব্য রহিয়াছে। অশিক্ষার অন্ধকার নিমজ্জিত থাকায় দারিদ্র্য, নৈতিক অধঃপতন আমাদের জীবনে আজ অভিশাপ স্বরূপ। একটি প্রদীপের আলো হইতে যেইরূপ শত শত প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত হইয়া তিমির নাশ করে সেইরূপ কয়েকটি প্রাণে আলো জ্বালাইয়া প্ৰকৃত মানুষ তৈরী করিতে পারিলে আমার স্বা আমার প্রয়াস সার্থক হইবে। সেইজন্য ছাত্রজীবনই হইবে তাহার প্রথম সোপান। 

১০। তোমার জীবনের স্মরণীয় ঘটনা 

সংকেত সূত্র ঃ ভূমিকা তোমার জীবনে ঘটে যাওয়া স্মরণীয় ঘটনাটি – তোমার পরবর্তী জীবনে ঘটনাটির প্রভাব— উপসংহার। 

উত্তর : ভূমিকা : স্মরণীয় ঘটনা সেই ঘটনাকেই বলা যায় যাহা অন্তরে চিরজাগ্রত, চিরজীবন্ত। দৈনন্দিন শত কার্যের মধ্যে, শত চেষ্টাতেও যাহা ভুলিতে পারা যায় না। বয়সের স্বল্পতার জন্য আমার জীবনের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট সীমিত। তথাপি যে ভয়ানক ঘটনার আমি প্রত্যক্ষদর্শী ছিলাম তাহা যেন আজও আমাকে শিহরিত করিয়া তোলে। তাই বিস্মৃতির অতলে ডুবিয়া না যাওয়া সেই ঘটনাটিকেই আমার জীবনের স্মরণীয় ঘটন বলিয়া বর্ণনা করিতেছি। 

তোমার জীবনে ঘটে যাওয়া স্মরণীয় ঘটনা : প্রত্যেক দিনের মত সেদিনও বিদ্যালয় ছুটির পর আমরা মাঠে ফুটবল খেলিতেছিলাম। হঠাৎ আকাশ ঘন কালো মেঘে আচ্ছন্ন। হইয়া গেল । বৃষ্টি আরম্ভ হইল। আমরা ছুটিয়া নিজেদের বাড়িতে ফিরিয়া গেলাম। ক্রমে ঝড় এবং বৃষ্টির বেগ বাড়িয়াই চলিল। ঝড়ের গর্জন এবং বজ্রপাতের গগন বিদারী শব্দের মধ্যে বিদ্যুৎ চমকানোর চকিত আলোয় আমাদের চোখ-কানের কর্মক্ষমতা হারাইয়া গেল। আমরা যেন মূকবধির হইয়া রহিলাম। ঘরের ভিতর আমরা তিনটি প্রাণী মা, বোন এবং আমি। বাবা কৃষিকার্য করেন বলিয়া ক্ষেতের ফসল কাটায় বাহিরে ছিলেন। ঝড়ের তাণ্ডবে সরকারের তরফ হইতে দেওয়া টিনের চালগুলি যেন নিজের অস্তিত্ব টিকাইয়া রাখিবার জন্য প্রাণপনে লড়াই করিতেছে। একসময় প্রচণ্ড শব্দে টিনের চাল উড়িয়া গেল। ঘরের ভিতরের সবকিছু ভিজিয়া এবং উড়িয়া গিয়া তছনছ করিয়া দিল। মা আমাদের দুইজনকে বুকে। জড়াইয়া ধরিয়া বিছানার নীচে বসিয়া ঝড়ের দ্রুত অবসান কামনা করিতে লাগিলেন। ঝড়ের দাপট যে কত প্রবল হইতে পারে তাহা যেন স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিলাম। এরূপ বিপর্যয়ের মধ্যে বাবার ফিরিয়া না আসায় উৎকণ্ঠার পারদ ক্রমেই বাড়িতে লাগিল। অবশেষে উৎকণ্ঠিত প্রতীক্ষার অবসান ঘটিল। ঘোর তমসাময়ী ঝটিকামুখর রাত্রির অবসান।

হইল। বাহিরে আসিয়া এক নিদারুণ দৃশ্যের সাক্ষী হইলাম। চারদিকে মানুষের আর্তকন্ঠের চিৎকার, গ্রামের বিধ্বস্ত চেহারা, যেন ধ্বংসের দেবতা তাণ্ডবে মাতিয়া গ্রামকে এক মহাশ্মশানে পরিণত করিয়াছেন। কত গাছপালা, ঘর-দুয়ার মাটিতে লুটাইয়া পড়িয়াছে, কত মানুষ তাহাদের প্রিয়জনকে হারাইয়া বুকফাটা হাহাকার করিতেছে। বাবাকে খুঁজিবার জন্য যখন ছোটাছুটি করিতেছি তখন লোকমুখে জানিলাম বাবা গাছ চাপা পড়িয়া মাটিতে লুটাইয়া আছেন। নিথর দেহ। 

তোমার পরবর্তী জীবনে ঘটনাটির প্রভাব সেই অভিশপ্ত দিনটির দুঃসহ স্মৃতির ভারে জর্জরিত হইয়া ভবিষ্যৎ দিকে চলিতে হইতেছে। কালবৈশাখী শব্দটি আমাকে আজও আতঙ্কিত করিয়া তুলে। ইহার কারণ বিশ্লেষণ করিয়া গ্রামের ঘর-বাড়ির একেবারে দৈন্যদশা। দরিদ্রোর জন্য গ্রামবাসীর যেন অনুভব করিলাম ‘নুন আনতে পান্তা ফুরোয়’ অবস্থা। আর্থিক অনটন দূর করিবার জন্য তাহাদের শিক্ষার প্রসার ঘটাইতে হইবে। শিক্ষা, অর্থ এবং বোধ-বুদ্ধি এই তিনটির সমন্বয় ঘটাইতে পারিলে তাহাদের জীবনে উত্তরণ অবশ্যম্ভাবী। প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রতিকূলতায় ও তাহারা নিশ্চিত জীবন-যাপন করিতে পারিবে তাই আমি সংকল্প গ্রহণ করিয়াছি উপযুক্ত শিক্ষা গ্রহণ করিয়া গ্রামের প্রত্যেক শিশুকে শিক্ষার আলোকে আলোকিত করিবার জন্য বিদ্যালয় এবং মহাবিদ্যালয় স্থাপন করিয়া তাহাদের অশিক্ষা এবং দারিদ্র্যের কশাঘাত হইতে মুক্ত করিব। যাহাতে আমার মত অকালে কেহ পিতৃহীন না হয় এবং প্রিয়জনের সান্নিধ্য হইতে বঞ্চিত না হইতে হয়। 

উপসংহার : প্রতিটি দিন আমাদের জীবনে বিভিন্ন অভিজ্ঞতার ডালি উপহার প্রদান করে। তাহা কখনও আনন্দময় কখনও বিষাদময়। সেইদিনের ঝটিকাবিক্ষুব্ধ, গর্জনমুখর, দুর্যোগময় রাত্রির যে সর্বধ্বংসী ভয়াবহ মৃত্যুময় রূপ প্রত্যক্ষ করিয়াছি তাহার নিদারুণ। অভিজ্ঞতার কথা আমি জীবনে ভুলিবনা, ভুলিতে পারিবনা। 

১১। সংবাদপত্র পাঠের প্রয়োজনীয়তা] 

সূচনা : পূর্ব দিগন্তে আলোকের বিজয় ঘোষণার পূর্বেই সমগ্র পৃথিবী আমাদের দুয়ারে আসিয়া করাঘাত করে। গৃহবদ্ধ মানুষকে বিশ্বমানবতা ও বিশ্বনাগরিকতার উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে উত্তীর্ণ করিয়া দেয়। সংবাদপত্র বর্তমান সভ্যতার অপরিহার্য অঙ্গ। সংবাদপত্র দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থার দর্পণ। 

সংবাদপত্র পাঠের প্রয়োজনীয়তা : সংবাদপত্র গণতন্ত্রের সদাজাগ্রত প্রহরী। সংবাদের সূত্র ধরিয়া জনমত গঠিত হয় এবং প্রভাবিত হয় বিশ্বের দেশ তা বিশ্বের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। সংবাদপত্রের গতি সর্বত্র। সাহিত্য, সংস্কৃতি, খেলাধূলা, আমোদ-প্রমোদ সর্বত্র তাহারা অবাধ পদসঞ্চার। একনায়কতন্ত্রের ক্ষমতার অপব্যবহারে যখন “বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে” তখন সংবাদপত্র গর্জন করিয়া মানুষের বিবেক জাগ্রত করে।

জনগণের প্রবল বিক্ষোভের সম্মুখে পরাজিত হয় স্বৈরতন্ত্র। জয় হয় জনমতের, জয় হয় মানবতার। 

গণচেতনার বাহক সংবাদপত্র প্রকাশের প্রথম গৌরব চীনদেশের প্রাপ্য। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভ লগ্নে বাংলা সংবাদপত্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে শ্রীরামপুর খ্রিস্টান মিশনারীদের হাতে। বর্তমান ভারতে প্রচলিত সংবাদপত্রের মোট সংখ্যা ১২, ২১৮। বাংলা ভাষার প্রকাশিত সংবাদপত্রের সংখ্যা ৭৬০। 

আধুনিক জীবনে সংবাদপত্রের গুরুত্ব অসীম। সংবাদপত্র একাধারে মানবমনকে বিশ্বমুখীন। করিয়া তুলে অপরদিকে স্বদেশ এবং স্বজাতি সম্পর্কে সচেতন করিয়া রাখে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে সন্ধ্যা, বঙ্গবাসী, যুগান্তর এবং অমৃতবাজার পত্রিকা প্রভৃতি সংবাদপত্রের অবদান এই কারণেই ঐতিহাসিক স্বীকৃতি পাইয়াছে। 

জনসাধারণের সহিত প্রত্যক্ষ যোগাযোগ স্থাপনের একমাত্র উপায় সংবাদপত্র। কোনও প্রস্তাবের স্বপক্ষে অথবা বিপক্ষে জনসাধারণ চিঠিপত্র অথবা জনমত কলামে নিজেদের বিবেচনা, যুক্তি উত্থাপন করিয়া প্রস্তাবটি সম্পর্কে সুচিন্তিত মতামত তুলিয়া সর্বজনগ্রাহ্য সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে পারে। সরকারের কোন পরিকল্পনায় গণস্বার্থ পদদলিত হইয়া মুষ্টিমেয়র স্বার্থ স্বীকৃত হইলে সংবাদপত্রের নির্ভীক কণ্ঠ সোচ্চার হইয়া উঠে। ইহার ফলে সরকারকে নতজানু হইয়া ক্ষমাভিক্ষা করিতে হয়। সংবাদপত্র সম্বন্ধে যে মন্তব্য রহিয়াছে “It is the People’s Parliament always in session ” সর্বতোভাবে সার্থক। সংবাদপত্রের গুরুত্ব এবং ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী বলিয়া সংবাদপত্র পাঠের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। 

কর্তব্য : সংবাদপত্র যেহেতু মহামানবের দরবার। গণদেবতার বিচারশালা সেইহেতু সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সংবাদদাতার যথেষ্ট কর্তব্য রহিয়াছে। সঠিক এবং নির্ভুল তথ্যের উপর ভিত্তি করিয়া সংবাদদাতাকে সংবাদ পরিবেশন করিতে হয়। নিরপেক্ষভাবে সংবাদ পরিবেশন এবং সম্পাদকীয় স্তম্ভে আলোচনা একটি সংবাদপত্রের মান উন্নত করে। শাসকগোষ্ঠীর তোষামদকারী সংবাদপত্র কখনোই সৎ, আদর্শনিষ্ঠ সংবাদপত্রের স্বীকৃতি পায় না। শাসকগোষ্ঠীর অঙ্গুলি হেলনে যে সমস্ত সংবাদপত্র পরিচালিত হয় সেইগুলি সংবাদপত্রের আদর্শ হইতে বিচ্যুত হয়। মনে রাখিতে হইবে যুক্তিনিষ্ঠ, তথ্যসমৃদ্ধ, নির্ভুল সংবাদ নিরপেক্ষভাবে পরিবেশন করাই সংবাদপত্রের প্রকৃত উদ্দেশ্য। সংবাদপত্র যতক্ষণ নির্ভীকভাবে সত্যকে অনুসরণ করে ততক্ষণ তাহা জাতীয় জীবনের পক্ষে কল্যাণকর হয়। 

উপসংহার : আমাদের দেশের অধিকাংশ সংবাদপত্রই রাজনীতিক গোষ্ঠীভূক্ত অথবা কোন না কোন আদর্শবাদের প্রচারক। সম্পাদকীয় মন্তব্যে যে কোন সংবাদপত্র তাহাদের নিজস্ব চিন্তাধারা অনুসারে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সমালোচনা করিতে পারেন, কিন্তু সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে তাহাদের নিরপেক্ষতা অবলম্বন করা উচিত। কারণ, সংবাদপত্রে সত্য খবরই প্রকাশিত হইবে, সকলে সেইরূপ আশা পোষণ করে। 

বিভ্রান্তিক, অসত্য অথবা অর্ধসত্য সংবাদ প্রকাশ দেশ তথা জাতির পক্ষে ক্ষতিকর। বাংলা “সমাচার দর্পণ” হইতে ভারতীয় সংবাদপত্রের যে যাত্রা শুরু হইয়াছে, বর্তমানে তাহার কলেবর স্ফীত হইয়া অজস্র শাখা-প্রশাখায় বিস্তৃতি লাভ করিয়াছে। ন্যায় এবং সত্যের মন্ত্রে দীক্ষিত হইয়া একদিন যে যাত্রা শুরু হইয়াছিল বর্তমানের লোভ—জটিল পৃথিবীতে বিভিন্ন কায়েমী স্বার্থের ক্রীড়নক না হইয়া আপন যাত্রাপথে সেই আদর্শ বজায় রাখিয়া চলিবে ইহাই আমাদের আন্তরিক কামনা। 

Chapter
NO.
Contents
সাগর সঙ্গমে নবকুমার
বাংলার নবযুগ
বলাই
অরুণিমা সিন্হা : আত্মবিশ্বাস
ও সাহসের অন্য এক নাম
তোতা কাহিনী
কম্পিউটার কথা, ইন্টারনেট কথকতা
আদরিণী
প্রার্থনা
প্রতিনিধি
১০গ্রাম্যছবি
১১ বিজয়া দশমী
১২ আবার আসিব ফিরে
১৩দ্রুতপঠন : বৈচিত্র্যপূর্ণ অসম
তিওয়া
দেউরী জনগোষ্ঠী
অসমের নেপালী গোর্খা জনগোষ্ঠী
বড়ো জনগোষ্ঠী
মটক জনগোষ্ঠী
মরাণ জনগোষ্ঠী
মিচিং জনগোষ্ঠী
অসমের মণিপুরী জনগোষ্ঠী
রাভাসকল
সোনোয়াল কছারিসকল
হাজংসকল
অসমের নাথযোগীগণ
আদিবাসীসকল
১৪পিতা ও পুত্র
১৫অরণ্য প্রেমিক : লবটুলিয়ার কাহিনী
১৬ জীবন-সংগীত
১৭কাণ্ডারী হুশিয়ার

ভাবসম্প্রসারণ

রচনা

রচনা (Part-2)

১২। ছাত্রসমাজের দায়িত্ব ও কর্তব্য [

বিদ্যাভ্যাস করাই ছাত্রসমাজের কর্তব্য। এই উদ্দেশ্য লইয়া মানবশিশুকে বিদ্যালয়ে পাঠানো হয়, যাহাতে সে বিদ্যাশিক্ষালাভ করিয়া মনুষ্যত্বের অধিকারী হইতে পারে। 

কিন্তু শিক্ষালাভের উদ্দেশ্য যদি মনুষ্যত্বের পূর্ণ বিকাশ বলিয়া ধরা হয় তাহা হইলে একথা স্বীকার করিতে হইবে যে, কেবলমাত্র পুঁথিগত বিদ্যা আয়ত্ত করিলেই তাহা সিদ্ধ হয়। না। মানবজীবনে অসংখ্য কর্তব্য ও দায়িত্ব পালনের কথা বলা হইয়াছে। শিক্ষালাভের পাশাপাশি ঐ সমস্ত কর্তব্য ও দায়িত্বের প্রতিফলন ছাত্রসমাজের মানসিকতায় ফুটিয়া উঠিতে হইবে। 

শাস্ত্রে আছে “ছাত্ৰানাম্ অধ্যয়নং তপঃ”–অধ্যয়নই ছাত্রের তপস্যা। কিন্তু কেবল বিদ্যার্জনের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী জীবনের কাল কাটাইলে চলিবে না, জীবনের যাবতীয় সকল পাঠই এক সময়ে গ্রহণ করিতে হয়। তাহাতে বিশ্ব সংসার, সমাজ পরিবেশ, আপন দৈহিক স্বাস্থ্য ইত্যাদির প্রতি সজাগ থাকিতে হইবে; বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষায় এবং দুর্গত ও আর্তের সেবায় যোগ দিতে হইবে। কোন একটি দেশের ছাত্র সমাজ উত্তরকালের রাষ্ট্রের কর্ণধার হইবে, আদর্শবান শিক্ষক হইবে, রণক্ষেত্রে সুশৃঙ্খল সৈন্য পরিচালনা করিবে, মুমূর্ষুর সুস্থতার আশ্বাস আনিবে। এই সমস্ত গুরুদায়িত্বের জন্য চাই স্বাস্থ্যোজ্বল জ্ঞানবান ও নম্র স্বভাবের একদল দেশকর্মী। 

আজিকার ছাত্রসমাজের মধ্যেই সুপ্ত আছে ভবিষ্যতের এইরূপ দেশকর্মী। ছাত্রজীবনে অর্জন করিতে হয় সততা, ন্যায়নিষ্ঠা, ক্ষমা, উদারতা প্রভৃতি চারিত্রিক গুণাবলী। কিশোর মনে এই সমস্ত গুণাবলী একবার মুদ্রিত হইলে ইহার মাধুর্য আজীবন ব্যাপ্ত থাকে। চরিত্রহীন বিদ্যা কোন কালেই মানা হয় না। এইজন্য বিদ্যার্থী জীবনে চরিত্রগঠন একটি প্রধান কর্ম। 

কৈশোর ও যৌবনকালে চিত্তবৃত্তি স্বভাবতঃই থাকে উদার। কিন্তু এই উদারতাকে সচেতন প্রয়াসে প্রয়োগ করিতে হইবে। বালক সেবাদল, বালিকা সেবাদল এবং অন্যান্য সেবাদল গঠন করিয়া দেশ ও জাতির সেবা করা ছাত্রসমাজের মহত্তম কর্তব্য। ভাবীকালে মানব কল্যাণের বৃহত্তর প্রেরণা ছাত্রবস্থায়ই অর্জন করিতে হয়। ইহাছাড়া নিজেদের জীবনে শিক্ষার ভূমিকা উপলব্ধি করিয়া দেশের অগণিত অম্ল জনগণের প্রতি শিক্ষাবিস্তারে সচেষ্ট হইবে। প্রয়োজনবোধে নৈশ বিদ্যালয়টি স্থাপন করিয়া বয়স্ক ও দরিদ্রদের মধ্যে শিক্ষাবিস্তারে ব্রতী হইবে।

নিয়মানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলাবোধ ছাত্রসমাজের অন্যতম অনুশীলন হওয়া উচিত। ভারতের বৈদিক সমাজ তাই ছাত্রজীবনে কঠোর ব্রত পালনের নির্দেশ দিয়াছিল। শৃঙ্খলাবে ব্যতিরেকে জীবনের বিকাশ সম্ভব নহে। সরিলা রাজনীতিতে ছাত্রসমাজের অংশগ্রহণ যুক্তিযুক্ত কিনা এই বিষয়ে বিতর্ক চলিতে পারে। কিন্তু একদা এই ছাত্রসমাজ দেশের মুক্তিযজ্ঞে আত্মাহুতি দিয়াছিল । 

অধ্যয়ন ছাত্র সমাজের প্রাথমিক কর্তব্য ও ব্রত; ইহাকে অবলম্বন করিয়াই জীবনের সর্বতোমুখী বিকাশ সম্ভব হইয়া থাকে। সামাজিক কর্তব্যবোধের তথা দায়িত্ববোধের বিকাশের কালই হইল ছাত্রজীবন। কেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া ছাত্রসমাজের উদ্দেশ্য নহে, ইহা মহৎ লক্ষ্যে পৌঁছাইবার একটি উপায় মাত্র। কেননা গ্রন্থের সহায়তায় জীবন পূর্ণ হয় না, কেবল সমৃদ্ধ হয়। তাই পুঁথিগত বিদ্যাশিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে বৃহত্তর জীবনের অপরাপর পাঠগুলি আয়ত্ত করিতে পারিলেই সুপ্ত মানবশক্তির নিদ্রাভঙ্গ হয় এবং জীবনও সার্থক ও সুন্দর হইয়া উঠে। 

১৩। দেশভ্রমণ 

থাকবোনা আর বন্ধ ঘরে, 

দেখবো এবার জগতটাকে, 

কেমন করে ঘুরছে মানুষ, 

যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে। 

(কাজী নজরুল ইসলাম) 

সুদূরের পিয়াসী মানুষের আবক্ষ অনির্বাণ তৃষ্ণা নিবৃত্তি জানে না। অজানাকে জানা, অদেখাকে দেখিবার দুর্বার আকাঙ্ক্ষায় যুগে যুগে মানুষ শান্ত গৃহকোণ ছাড়িয়া বাহির হইয়া পড়ে অজানার পথে, দেশ-দেশান্তরে। বিপুলা এ পৃথিবীর বুকে স্তরে স্তরে এত সম্ভার, এত বিস্ময় ছড়ানো রহিয়াছে যে, যা কেবলমাত্র গ্রন্থপাঠে পরিতৃপ্তি লাভ করিয়া না। এমন নান্দনিক দৃশ্য উপভোগ করিবার জন্য প্রয়োজন দেশভ্রমণ। 

বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করিয়া। কেউ কেউ নয়নভোলানো সৌন্দর্যের বৈচিত্র্য উপভোগ করিবার জন্য ভ্রমণে ব্রতী হন। কেউ শিক্ষা এবং জ্ঞান লাভের জন্য, কেউ। বা নতুন দেশ আবিষ্কারের প্রেরণায়, আবার কেউ কর্মক্লান্ত জীবনের একঘেয়েমি হইতে মুক্তি পাইবার মানসে দেশভ্রমণে ব্রতী হন। দেশভ্রমণের ফলে সাংস্কৃতিক বিনিময় সাধিত হয়। বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের পথ সুগম হয় সর্বোপরি বিশ্বভ্রাতৃত্ব বোধ জাগিয়া ওঠে।

জ্ঞান অর্জনের অসীম আকর্ষণে দুর্গম গিরি, কান্তার মরু প্রান্তর এবং বিপদসঙ্কুল সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করিয়া যে সব পর্যটক ঐতিহাসিক প্রসিদ্ধি অর্জন করিয়াছেন তাদের মধ্যে হিউয়েন সাঙ, ফা-হিইয়ান, ইবন বতুতার নাম স্মরণীয় হইয়া আছে। ভাস্কো-ডা-গামা, কলম্বাস, মার্কোপোলো দুর্জয়কে জয় করিবার জন্য নিজেদের প্রাণ তুচ্ছ করিয়া বৎসরের পর বৎসর অভিযানে রত হইয়াছেন। ভারতের অতুল বৈভব, ঐশ্বর্যের আকর্ষণে ভারতবর্ষ আবিষ্কারের যাত্রাপথে কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করিয়া চিরস্মরণীয় হইয়া আছেন। 

শিক্ষালাভের ক্ষেত্রে ভ্রমণের গুরুত্ব অসীম। কেবলমাত্র গ্রন্থপাঠের মাধ্যমে শিক্ষালব্ধজ্ঞান জীবনে পূর্ণতা আনিতে পারে না। দেশের ভৌগোলিক আয়তন, বিভিন্ন তথ্য, বিভিন্ন দেশের সমাজ জীবন, তাহাদের আচার, সাংস্কৃতিক জীবন স্বচক্ষে দর্শন করিয়া যে জ্ঞান লাভ করা যায় তা অতি সহজেই বাস্তব অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করিয়া। শিক্ষার ক্ষেত্রে দেশভ্রমণের এই অবদান সর্বজন স্বীকৃত বলিয়াই “শিক্ষামূলক ভ্রমণের” সৃষ্টি হইয়াছে। 

দেশভ্রমণ একই সাথে মানুষের দেহ ও মনের উন্নতি সাধন করিয়া। উন্মুক্ত প্রকৃতির সূর্যস্নান ও বিশুদ্ধ বায়ু শহুরে মানুষের রোগাক্রান্ত দেহকে অনেকখানি সঞ্জীব করিয়া তোলে। প্রকৃতির বিচিত্র রূপশোভা দর্শন করিয়া মন ও হিগ্ধ হয়। 

দেশভ্রমণের সার্বিক গুরুত্ব অনুধাবন করিয়া সরকার পর্যটন কার্যালয় স্থাপন করিয়াছে। তাহারা বিভিন্নভাবে ভ্রমণকারীদের সাহায্য করিয়া। রাষ্ট্রসংঘ দেশভ্রমণকে “A Passport to World Peace” বলিয়া অভিহিত করিয়া বিশ্ববাসীকে দেশভ্রমণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করিয়াছেন। বিপুলা এ পৃথিবীর আমরা প্রায় কিছুই জানি না। বহু বিনিদ্র রজনীর মূল্যে সারাজীবন। ধরিয়া গ্রন্থপাঠে নিয়োজিত থাকিলেও ইহার অল্পই জানা যায়। ফলে সুদূর দিগন্ত আমাদের হৃদয়কে প্রতিনিয়ত দেয় নীরব হাতছানি। তাই বলা যাইতে পারে দেশভ্রমণ আমাদের জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার মূল চাবিকাঠি। 

১৪। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপর্যয় 

ভূমিকম্প ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম—এই পঞ্চভূত ঘটিত যে কোন দুর্যোগ বা বিপর্যয়কে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বিপর্যয় বলা হয়। ভূমিকম্প ক্ষিতি পর্যায়ভুক্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ইহার ফলে প্রকৃতিতে নানা পরিবর্তন সংঘটিত হয়। 

“ভূমিকম্প’ হইল মাটির কাপুনি। সুরসিক সুকুমার রায় বলেন, “এ কাঁপুনি বলিতে গেলে রোজই কতবার করিয়া হইতেছে। রাস্তা দিয়া দমকল ছুটিয়া গেল, ঘোড়সোয়ার পল্টন গেল, মাটি গুম্ গুম্ করিয়া কাঁপিতে লাগিল। এমন কি একজন মোটা লোক যদি সিঁড়ি দিয়া খুব উৎসাহ করিয়া নামিতে যায়, তাহাতেও বাড়ির ভিতরে ছোটখাট রকমের ‘ভূমিকম্প’ হয়। যদি বেশ সূক্ষ্ম রকম যন্ত্র দিয়া পরীক্ষা করিয়া দেখ, তবে পাশের ঘরে বিড়াল হাঁটিয়া গেলে এই ঘরে তাহার চলা-ফিরার সাড়া পাইবে। কিন্তু ভূমিকম্প বলিতে আমরা এইরকম কাপুনি বুঝি না। মাটির ভিতর হইতে যে ধাক্কা আসে, মাটির তলে তলে যাহা বহুদূর পর্যন্ত ছড়াইয়া পড়ে, তাহার নাম ‘ভূমিকম্প’। কম্পনের বেগ যখন অধিক থাকে, তখন পৃথিবীর উপরিভাগে নানা পরিবর্তন ঘটে। বহুদূরে কোন কম্পনলিপি যন্ত্র (seismograph) থাকিলে উহাতে ভূমিকম্পের সাড়া পাওয়া যায়। ইহার উৎপত্তিস্থল হইতে কম্পনের সমভাবে সকল দিকে গতি থাকায় পৃথিবীর উপরিভাগ কাঁপিয়া উঠে। ভূমিকম্প নানা কারণে হইতে পারে। ভূ-সংকোচন, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, হিমানী সম্প্রপাত ও ভূমিস্থলনের জন্য ভূ-পৃষ্ঠে ভূমিকম্প হইয়া থাকে। ইহার ফলে (১) ভূ-পৃষ্ঠের কোন কোন অংশ নিচে নামিয়া যায় অথবা কোন কোন নিচু অংশ উপরে উঠিয়া যায়। এইভাবে ভঙ্গিল পর্বত ও গ্রন্থ উপত্যকার সৃষ্টি হয়। (২) সাগরের তলদেশ উপরে উঠিয়া বিস্তৃত সমতল ভূমি বা দ্বীপের সৃষ্টি হয়, আবার বিস্তৃত সমভূমি সাগরে ডুবিয়া যায়। (৩) সমুদ্রের তলদেশে ভূমিকম্প হইলে ইহার প্রচণ্ড ঢেউ পার্শ্ববর্তী উপকূল অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করিয়া থাকে। (৪) ইহার ধ্বংসাত্মক কাজই বেশি। ইহা ঘরবাড়ি, গাছপালা, পশুপক্ষী ও মানুষের বিস্তর ক্ষতিসাধন করিয়া থাকে। 

ভূমিকম্পের রুদ্ররূপ পৃথিবীতে নানা সময়ে নানাভাবে দেখা গিয়াছে। ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরিজাত ভূমিকম্পের ফলে বহুকাল পূর্বে পম্পিয়াই শহর ধ্বংস স্তূপে পরিণত হইয়াছিল। সুমাত্রা ও যবদ্বীপের মাঝামাঝি একটি দ্বীপ ছিল কাকাতোয়া। ইহাতে ছিল একটি সুপ্ত আগ্নেয়গিরি। প্রায় দুইশত বৎসর সুপ্ত থাকিয়া ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দ হইতে উহা জাগ্রত হয়। তখন হইতেই সেখানে বেশ বড় রকমের ভূমিকম্প হইতে থাকে, যাহার ধাক্কা সমুদ্র পার হইয়া সুদূর অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত পৌঁছাইত। তিন বৎসর ধরিয়া ভূমিকম্প চলিতে থাকে। তারপর একটি প্রচণ্ড বিক্রমে উহা জাগ্রত হয় এবং সাত মাইল উঁচু হইয়া চতুর্দিকে অগ্নিবর্ষণ করিতে থাকে। ইহারই গরম ধূলার বৃষ্টি গিয়া পড়িয়াছিল একশত মাইল দুরে বাটাভিয়া শহরের উপর। তিনমাস এইভাবে অগ্নিবর্ষণ করিয়া ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দের ২৬শে আগস্ট কাকাতোয়ায় আট মাইল ডাঙ্গা শূন্যে মিলাইয়া গেল এবং গভীর সমুদ্র আসিয়া তাহার স্থান দখল করিল। সেই বিস্ফোরণের শব্দ তিন হাজার মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হইয়াছিল। আগুনের পাহাড় সমুদ্রে গিয়া পড়ায় পার্শ্ববর্তী উপকূল অঞ্চলের প্রচুর ক্ষতি সাধিত হইয়াছিল, প্রায় চল্লিশ হাজার লোকের মৃত্যু হইয়াছিল। 

ভূমিকম্পের ধাক্কা মাটির ভিতর দিয়া ঢেউয়ের মত ছড়াইয়া পড়ে। ইহাতে ভূ-পৃষ্ঠ টলমল করিতে থাকে, ঘর-বাড়ি ভাঙ্গিয়া পড়ে রেলের লাইন মোচড়াইয়া বাঁকিয়া যায়। ১৭৯৭ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ আমেরিকার কুইটো শহরে যে ভূমিকম্প হয়, ইহাতে শহরের কোন কোন স্থানের মানুষগুলিকে ফুটবলের মত ছুঁড়িয়া দিয়াছিল। সান-ফ্রান্সিসকোর ভূমিকম্পে শহরে বিরাট আগুন ধরিয়া যায়। 

১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে, ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে এবং ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে অসম ও পার্শ্ববর্তী রাজসমূহে প্রচণ্ড ভূমিকম্প হয়। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের তৎকালীন পূর্ববঙ্গ ও অসমে ব্যাপক ক্ষতি হয়। ইহার ধাক্কা পশ্চিমবঙ্গেও পড়ে। ইহাতে বহুলোকের প্রাণহানি ঘটে। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে ১৫ই আগস্ট রাত্রিতে অসমে হয় বিরাট ভূমিকম্প। ইহাতে উত্তর অসমের প্রচুর ক্ষতি সাধিত হয়। নদীর গতি পরিবর্তিত হয়। বাড়ি-ঘর, রাস্তাঘাট, গাছপালারও অনেক বিপর্যয় ঘটে। মানুষ ও পশুর মৃতদেহ পাশাপাশি পড়িয়া থাকিতে দেখা যায়। 

১৫। জাতীয় সংহতি 

সমগ্র জাতির ভাগ্যাকাশে আজ এক দুর্যোগের ঘনঘটা। ভারতের জাতীয় সংহতি আজ তাই বিপন্ন। 

ভারতের মত বিশাল দেশে বিভিন্ন বৈচিত্র্য ও পার্থক্যের ভিতরেও একটি ঐক্যধারা প্রবাহিত হইয়াছে। পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু যাহাকে “Unity in diversity” বলিয়াছেন। প্রাচীন কাল হইতে আর্য, অনার্থ, দ্রাবিড়, শক, হূণ, মোগল, পাঠান প্রভৃতি বিভিন্ন জাতি এই ভারতের মাটিতে “একদেহে লীন হইয়া গিয়াছে। ইংরেজ শাসনকালে পরাধীনতার মানি জনগণের জীবনকে এরূপ দুবির্ষহ করিয়া তুলিয়াছিল যে জাতীয় জীবনে বিপুল ঐক্যবোধ জাগ্রত হইয়া দেশ প্রেমের জোয়ারে সকলকে ভাসাইয়াছিল। 

কূটকুশলী ইংরেজ ভারত ত্যাগ করিলেও যে বিষবৃক্ষ বপন করিয়া গিয়াছিল তাহার বিষময় পরিণাম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে আজ সমগ্র ভারতের আকাশ-বাতাস কলুষিত। সাম্প্রতিকতম প্রমাণ অযোধ্যার রাম জন্মভূমি এবং বাবরি মসজিদ সমস্যা। স্বাধীনতা লাভের পর আমাদের স্বদেশ প্রেমে ভাটা পড়িয়াছে। সাম্প্রদায়িক, প্রাদেশিক এবং রাজনৈতিক ভেদবুদ্ধির কদর্য পঙ্কিলতা প্রকটরূপে আত্মপ্রকাশ করিয়াছে। অসমের “বিদেশী হঠাও” আন্দোলন পৃথক কামতাপুর রাজ্য, গোর্খাল্যাণ্ড এবং বোরোল্যাণ্ডের দাবীতে সহিংস আন্দোলন ইহার জাজ্বল্যমান উদাহরণ। ইহা ছাড়াও দেশব্যাপী ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, বেকারসমস্যা, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং ধনবৈষম্য প্রভৃতি বিভিন্ন কারণে জাতীয় ঐক্যচেতনা ক্রমশই ক্ষীণ হইয়া পড়িয়াছে। 

চারিদিকের সংঘর্ষ জর্জরিত পরিবেশের মধ্যেও ভারতের জাতীয় ঐক্য নির্মূল হইয়া যায় নাই। পাকিস্তান এবং চীনের ভারত আক্রমণের সময় ভারতীয় জনগণের উদ্যম। ঐক্যচেতনার প্রমাণ পাই। দেশপ্রেমের শিকড় কত গভীরভাবে জনগণের অন্তরে প্রসারিত তাহা সঙ্কটকালে উপলব্ধি করা যায়। 

প্রবল প্রতাপী ইংরেজ বহু প্রাণক্ষয় ঘটাইয়াও এদেশে সাম্রাজ্যকে টিকাইয়া রাখিতে পারে নাই। নিষ্পাপ রক্তপাত কখনই ভারত ভাগ্য বিধাতা সহ্য করিবে না। একদিন ভারত জননীর সকল সম্ভানের মনে শুভবুদ্ধির উদয় হবে। ভ্রাতৃ-বিরোধ এবং বিভেদের অবসানে এক নতুন ভারত জন্মলাভ করিবে। দীর্ঘ-প্রতিক্ষিত মাতৃ-অভিষেকের পবিত্র লগ্নে ধ্বনিত হইবে। -“

মার অভিষেকে এসো এসো ত্বরা মঙ্গলঘট হয় নি যে ভরা  সবার পরশে পবিত্র করা তীর্থনীরে— এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে।।

১৬। দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞানের দান 

বর্তমান শত্রু।ব্দী বিজ্ঞানের যুগ। আধুনিক জীবনে বিজ্ঞানের প্রভাব এত সুদূরপ্রসারী যে তাহাকে কোন মতেই অস্বীকার করা যায় না। বিজ্ঞানের দান মানুষের জীবনকে সুস্থ- সমৃদ্ধিতে ভরিয়া তুলিয়াছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে বিজ্ঞান মানুষকে সভ্যতার অগ্রগতিতে আগাইয়া লইয়া চলিয়াছে। বিজ্ঞান ছাড়া মানুষ আজকালকার দিনে একটি দিনও চলিতে পারে না। এই যুগকে বিজ্ঞানের যুগ বলা হয়। বিজ্ঞানের যুগ আসলে বুদ্ধিবৃত্তির স্বাধীন বিকাশ ও অনুশীলনের যুগ। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে পৌঁছিয়া মনে হইতেছে যে বিজ্ঞানের রাজ্যে অসাধ্য বলিয়া কিছুই নাই। 

বর্তমান যুগের প্রতিটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কর্ম প্রণালী ও জীবনযাত্রার দিকে লক্ষ্য করিলে দেখা যাইবে যে, বিচিত্র বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারই তাহার অবলম্বন। ভোরে নিদ্রা ভাঙ্গার পর হইতে বিজ্ঞানের সাহায্য লইয়া মানুষ যাত্রা শুরু করে, আবার রাত্রিতে শয্যাগ্রহণের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত বিজ্ঞানকেই নানা উপায়ে প্রয়োজন সাধনে নিযুক্ত করে। কোন শহরের মানুষের দৈনন্দিন জীবন যাত্রা অনুসরণ করিলে আমরা দেবতে পাই যে সর্বত্রই বিজ্ঞানের জয়জয়কার। শহরে মানুষ শয্যা ত্যাগ করিয়া এক কাপ গরম চা সহযোগে বে সংবাদপত্রখানি পাঠ করে তাহা মুদ্রিত হইয়াছে আধুনিকতম বৈদ্যুতিক মেশিনে। মুখ ধুইতে ব্রাস, বৈদ্যুতিক হিটারে জল গরম করিয়া স্নান, বাথরুমের টেপের জল ব্যবহার, রান্নাঘরের প্রায় সকল প্রকার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রই আমরা বিজ্ঞানের দান হিসাবে পাইয়াছি। ট্রেনে বা বাসে করিয়া অফিস যাত্রা, লিস্টের সাহায্যে পাঁচতলায় অফিসরুমে গিয়া স্প্রীংয়ের চেয়ারে আসন গ্রহণ, মাথার উপরে ফ্যানের হাওয়ায় ক্লান্তি দূর করা সকলই বিজ্ঞানের প্রভাবেই আমরা পাইয়াছি। টাইপরাইটারে টাইপ করা, কিংবা ঝর্ণা কলমে লেখা, দুপুরে বিরতির সময় ফ্রিজের শীতল পানীয় কিংবা চা, টোস্ট খাওয়া সকলই বিজ্ঞানের আবিষ্কারের ফলেই সম্ভব হয়। ছুটির পর কর্মক্লান্ত অফিসকর্মী পুনরায় যন্ত্রযানের সাহায্যে বাড়ি ফিরিয়া আসেন। আসার সময় ছেলের জন্য বিস্কুট, রুগ্ন স্ত্রীর জন্য আনেন নানা প্রকার ঔষধ ও ইনজেকশন। ডাক্তার বলিয়া গিয়াছেন রুক্মিনীর এ-রে করাইলে ভাল হয়। সন্ধ্যা হইতে না হইতেই ঘর বৈদ্যুতিক আলোতে আলোকময় হইয়া উঠে। ঘড়িতে সাতটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঘরে দূরদর্শন ও রেডিওর মাধ্যমে দূর দুরান্তের নানা খবর ভাসিয়া আসে পৃথিবীর নানা প্রাস্ত হইতে। রাত্রির আহারের পর যখন আমরা বিছানায় শুইতে যাই তখন হাত বাড়াইয়া বেড় সুইস্ টিপিতেই সারাঘর অন্ধকারে ডুবিয়া যায়। বিজ্ঞান আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রতি মুহূর্তে কাজ করিয়া চলিয়াছে। 

পৃথিবীর নানা প্রান্ত হইতে মানুষ তাহাদের আত্মীয়-স্বজনের নিকট হইতে প্রতি নিয়তই টেলিগ্রাফ্ ও টেলিফোনের সাহায্যে প্রয়োজনীয় খবরাখবর পাইয়া থাকে। উপরে উল্লেখিত দৈনন্দিন জীবন যাত্রা লক্ষ্য করিলে সহজেই অনুমান করা যায় যে আধুনিক মানুষের প্রতিটি কর্মেই কোনো না কোনো দিকদিয়া বিজ্ঞান যুক্ত রহিয়াছে। ইহাতো

হইল সাধারণ মানুষের জীবনের কথা। আরও যে কত ব্যাপারে মানুষকে বিজ্ঞানের সাহায্য লইতে হয় তাহার সীমা সংখ্যা নাই। পীড়িতনের চিকিৎসায়, আর্তের সেবায় আমোদ- প্রমোদের উপকরণ হিসাবে, খেলাধুলায়, বিদেশ যাত্রায় বা যোগাযোগ ব্যবস্থায়, যুদ্ধের মারণাস্ত্র হিসাবে বিজ্ঞান মানব জীবনে একদিকে আশীর্বাদ এবং অপর দিকে অভিশাপ আনিয়া দিয়াছে। আধুনিক মানুষ আজ আর বিজ্ঞানের প্রভাব হইতে মুক্ত নহে। বিজ্ঞান মানব জীবনে ওতঃপ্রোতভাবে জড়িত হইয়া আছে। 

১৭। ভূমিকম্প 

প্রকৃতির রাজ্যে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন প্রকার প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বিপর্যয় সংঘটিত হইয়া চলিয়াছে। ইহাদের মধ্যে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং ভূমিকম্পই প্রধান। ভয়াবহতা এবং মারাত্মক ক্ষতিকারক দিক হিসাবে ভূমিকম্পকেই সকলের চেয়ে প্রলয়ঙ্কর বলা যায় কারণ অন্য দুইটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় সম্বন্ধে পূর্বানুমান করা সম্ভব, কিন্তু ভূমিকম্প সম্পর্কে কোন পূর্বানুমান বা পূর্ব হইতে প্রস্তুতি লইবার কোন বিজ্ঞানসম্মত উপায় আজ পর্যন্তও উদ্ভাবন করা সম্ভব হয় নাই। প্রকৃতিতে কখন কোথায় ভূমিকম্প হইবে তাহা কেহই জানে না। এই ভূমিকম্প সম্বন্ধে পৃথিবীর সকল মানুষকে এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে থাকিতে হয়। কারণ ভূমিকম্পের জন্য পূর্ব হইতে কোন সতর্কতা অবলম্বন করা সম্ভব নহে। ইহাকে রোধ করারও কোন উপায় নাই। ইহা যেন মানুষের ভাগ্যে নিয়তির এক করুণ পরিহাস। পৃথিবীর উপরিভাগের ভূত্বক বিশেষভাবে নড়িয়া উঠাকে বা কাঁপিয়া উঠাকেই মাটি কাঁপা বা ভূমিকম্প বলে। পৃথিবীর এই পরিঘটনাটি কতগুলি বিশেষ কারণে ঘটিয়া থাকে। পৃথিবীর বিজ্ঞানীগণ ভূমিকম্পরূপ প্রলয়ঙ্কারী বিপর্যয় সংঘটিত হওয়ার কতগুলি কারণ উল্লেখ করিয়াছেন। 

(১) কখনো কখনো পৃথিবীর অভ্যন্তরে কোন রাসায়নিক ক্রিয়ার ফলে ভূমিকম্প হয়। 

(২) কখনো কখনো পৃথিবীর বিভিন্ন স্তরগুলির অনিয়মিত স্থান পরিবর্তন ভূমিকম্প সৃষ্টির কারণ হয়। 

(৩) বিরাট আগ্নেয়গিরির উদিগ্রণের ফলেও ভূমিকম্প হইতে পারে। 

(৪) তাপ বিকিরণের ফলে ভূগর্ভস্থ পদার্থসমূহ শীতল হয় ও ইহাদের সংকোচন ঘটে। এই ভূ-সংকোচনের ফলে এবং হিমানী সম্প্রপাতের ফলে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। ভূমিকম্প কখনো ধীরে আবার অনেক সময় জোরেও হয়। ভূমিকম্পের কম্পন দুই প্রকারের হয়। নীচ-উপর এবং অনুভূমিক। যে কোন সময় পৃথিবীর যে কোনো স্থানে ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্প সংঘটিত হইতে পারে। 

বিগত ২০০ বৎসরের মধ্যে পৃথিবীতে বহুবার বড় ধরনের ভূমিকম্প হইয়াছে। ফলে ইহাতে অগণিত মানুষ, প্রচুর ধনসম্পত্তি, শহর ও জনপদের ক্ষতি সাধন হইয়াছে। ১৮৯৭ সালে বেশ বড় ধরনের ভূমিকম্প ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সংঘটিত হইয়াছিল। ১৯৫০ সালের ভূমিকম্প আসামের বিস্তর ক্ষতিসাধন করিয়াছে। ১৯৯২ এবং ১৯৯৩ সালে দুইটি পর পর বড় ধরনের ভূমিকম্প উত্তর প্রদেশের গাড়োয়াল পাহাড়ীয়া অঞ্চলের এবং মহারাষ্ট্রের হাজার হাজার মানুষের জীবন নষ্ট করিয়াছে। ভূমিকম্প দেখা দিলে ধ্বংস এবং মৃত্যু অবধারিত কারণ ইহাকে নিয়ন্ত্রণ এবং বাধা দেওয়ার কোন পূর্ব প্রস্তুতি থাকে না। গত ২৬শে জানুয়ারিতে সংঘটিত হওয়া গুজরাটের ভূমিকম্পটি যথেষ্ট ভয়ংকর এবং ক্ষতিকারক ছিল। কারণ এই অঞ্চলটির মাটি বালিযুক্ত বলিয়া ইহার ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ বেশি হইয়াছে। গুজরাটের ভূজ, কচ্ছ, আহমেদাবাদ, আজার, রাপার, ভাচাউ এবং সুরাট ইত্যাদি স্থানগুলিতে প্রবল ভূমিকম্পের ফলে প্রায় ২০,০০ লোকের প্রাণহানি ঘটিয়াছে এবং প্রায় লক্ষেরও অধিক লোক আহত হয় ও প্রচুর ধনসম্পত্তি নষ্ট হইয়াছে। গত ১ বৎসরে ভারতে ভূমিকম্পের প্রবণতা বাড়িয়াছে। উত্তর কাশী, লাতুর, জব্বলপুর ও গুজরাটের মর্মান্তিক ঘটনার পর আমাদের নূতন করিয়া ভাবিতে হইতেছে যে কিভাবে ইহা হইতে রক্ষা পাওয়া যাইতে পারে। 

সম্মানীয় ‘বাদিয়া’ ইন্সস্টিটিউট অব হিমালয়ান জিওলজির বিজ্ঞানীগণ সমগ্র ভারতবর্ষকে পাঁচটি ভূমিকম্প মণ্ডলে ভাগ করিয়াছেন। তাহাদের মতে গুজরাট জম্মু-কাশ্মীর, উত্তরপ্রদেশ, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, হিমালয়ের কিছু অংশ, উত্তরাঞ্চল এবং আন্দামান-নিকোবরকে লইয়া এই বিশাল অঞ্চলটি সবচেয়ে বেশি ভূমিকম্প প্রবণ মণ্ডল। এই মণ্ডলটি ‘V’ (ভি) মণ্ডলের অন্তর্গত। আর এইখানে ভূমিকম্পের সম্ভাবনা সর্বাধিক। এই মণ্ডলের ভূমিকম্পের প্রাবল্য রিখটার স্কেলে ৮:০ পর্যন্ত হইতে পারে বলিয়া বিজ্ঞানীগণ মনে করেন। ইন্সস্টিটিউট অব হিমালয়ান, জিওলজির বিজ্ঞানীগণ গুজরাটের ভূমিকম্পটি হওয়ার একদিন পূর্বে ‘V’ (ভি) মণ্ডলে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করিয়াছিলেন কিন্তু ভূমিকম্প কখন এবং কোথায় হইবে সেই বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করিতে তাহারা অসমর্থ ছিলেন। ইন্সস্টিটিউটটির বিজ্ঞানীগণ ভুমিকম্পের বিষয়ে পূর্ব হইতে অনুমান পাওয়ার জন্য গ্লোবেল পজিসনিং সিস্টেমের সাহায্য লইতেছেন। এই ব্যবস্থার দ্বারা তাঁহারা ভূগর্ভের টেটিক প্লেইটগুলির অবস্থান বিষয়ে জানিতে পারেন। নতুন দিল্লীর সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে গুজরাটের কালান্তর ভূমিকম্পটি প্রত্যাশিত ছিল। কারণ আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ গুজরাটসহ পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল, কঙ্কন, কেরালা এবং দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল হইল প্রবল ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। জওহরলাল নেহরু। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক ডঃ সৌমিত্র মুখার্জি বলেন যে তিনি। এই ভূমিকম্পের পূর্ব সতর্কতা সংকেত দিয়াছিলেন। ইহা ছাড়া চতুর্দশ দালাইলামা ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে ভারতে ভয়াবহ দুর্যোগ ঘটিবে বলিয়া পূর্বানুমান দিয়াছিলেন। পৃথিবীর কয়েকটি বিধ্বংসী ভূমিকম্প উল্লেখ করা হইল। ২০০১ সালের ২৬ জানুয়ারি গুজরাট (ভারত)। ১৯৯৯ সালের ২১শে সেপ্টেম্বর তাইওয়ান। ১৯৯১ সালের ১৭ই আগস্ট

পশ্চিমতুর্কী। ১৯৯৯ সালের ২৫ জানুয়ারি পশ্চিম কলম্বিয়া। ১৯৯৮ সালের ৩০শে মে উত্তর আফগানিস্তান। ১৯৯৭ সালের ১০ই মে উত্তর ইরান ১৯৯৫ সালের ১৭ই জানুয়ারি জাপানের কোবে। ১৯৯৩ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর ভারতের লাতুর। ১৯৯০ সলের ২১শে জুন উত্তর ইরান। ১৯৮৮ সালের ৭ ডিসেম্বর উত্তর আর্মেনিয়া। ১৯৭৫ সালের ২৮শে জুলাই চীন ইত্যাদি। 

ভূমিকম্পজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় জনসাধারণকে কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থার জন্য প্রস্তুত থাকিতে হয়। 

(১) গৃহ নির্মাণ করার সময় কাজের মানদণ্ড ও নীতি নির্দেশনা পালন করা দরকার। 

(২) পুরানো অথবা ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির সংস্কার করা দরকার। 

(৩) ঘরের আসবাবপত্র নিয়মিত সাজাইয়া রাখিয়া দরজাগুলি মুক্ত রাখা দরকার। 

(৪) হঠাৎ বাহির হওয়ার জন্য ঘরে উপযুক্ত ও স্বতন্ত্র দরজা রাখা দরকার। 

(৫) ভারি দ্রব্য উপরে না রাখাই ভাল। 

(৬) ভূমিকম্প অনুভব হইলে রন্ধন গ্যাস, জল, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বন্ধ রাখা প্রয়োজন। 

(৭) প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম হাতের কাছে রাখা দরকার। 

(৮) ঘরের গৃহপালিত পশুগুলিকে মুক্ত করিয়া দেওয়া প্রয়োজন। 

(৯) ভূমিকম্পের সময় হঠাৎ হতাশ না হইয়া ঘরের উপযুক্ত বড় থাম বা কোলামের পার্শ্বে আশ্রয় নেওয়া দরকার। 

(১০) ভূমিকম্পের সময় পরিত্রাণের জন্য মোটা রশ্মি, মই বা অন্য কোন হাতিয়ার হাতের কাছে রাখা দরকার। 

১৮। মহাপুরুষের জীবনীগ্রন্থ পাঠের সার্থকতা 

মহাপুরুষের জীবন সম্পর্কে জীবনীগ্রন্থ রচিত হয়। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যাঁরা প্রতিকূল অবস্থায় থেকে সাফল্য অর্জন করেছেন তাঁদের জীবনকথা জীবনীগ্রন্থের বিষয়। জীবনীগ্রন্থ পাঠ করলে সুফল পাওয়া যায়। জীবনের নানা পথনির্দেশ জীবনীগ্রন্থে থাকে। মনীষী মহাপুরুষের জীবনীগ্রন্থ যেন মহাকাব্য। এতে মহাপুরুষের জীবন সংগ্রামের ইতিহাস, জীবন দর্শন এবং সেকালের সমাজের পরিচয় পাওয়া যায়। জীবনীগ্রন্থ স্মরণীয় নমস্য ব্যক্তি জীবনের তথ্যের সংকলন। 

জীবনীগ্রন্থ পাঠের উপযোগিতা বহুমুখী। জীবনীগ্রন্থ পাঠ বিভিন্ন প্রয়োজন সাধন করে। জীবনী পাঠে বিচারশীলতা এবং আনন্দ পাওয়া যায়। মহাপুরুষদের কীর্তির উজ্জ্বল আদর্শ আমাদের প্রেরণা দেয়। তাঁর চরিত্রের মহত্ত্ব আমাদের শিক্ষা দান করে। চরিত্রগ্রন্থ এক কথায় শিক্ষার উপায়। জানলাভের উপায়। দেশের জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ধাপে মনীষী মহাপুরুষেরা কীরূপ পথ অবলম্বন করে জাতির কল্যাণসাধন করেছেন, তা শিক্ষামূলক।

জীবনীগ্রন্থ থেকে মহাপুরুষের চরিত্রের কথা জানা যায়। তাঁর সামাজিক এবং রাজনৈতিক চিন্তা ও আদর্শের কথা জানা যায়। সেই ভাবে শিক্ষা গ্রহণ করে সমাজ উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে পারে। এ ভাবে মহৎ জীবনী যত পাঠ করা যাবে তত ব্যক্তির কল্যাণ ও সমাজের মঙ্গল সাধিত হবে। 

১৯। মহাপুরুষের জীবনী— স্বামী বিবেকানন্দ 

সূচনা : ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে পাশ্চাত্য শিক্ষা এবং সভ্যতার সংঘর্ষে ভারত যখন বিভ্রান্ত ও দ্বিধাগ্রস্ত তখন ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে উত্তর কলিকাতার শিমুলিয়ার প্রসিদ্ধ দত্তবংশে জন্মগ্রহণ করেন স্বামী বিবেকানন্দ। তাঁহার পিতার নাম বিশ্বনাথ দত্ত এবং মাতার নাম ছিল ভুবনেশ্বরী দেবী। পরাধীনতার অন্ধকারে নিমজ্জিত তরুণ ভারতীয়গণ বিদেশী চিন্তাভাবনা উন্মাদনার ঐতিহ্যভ্রষ্ট হইয়া জাতির দেহ-মনে যখন প্রবল প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করিয়াছিল, তখন ঐ জড়তাগ্রস্থ তন্দ্রাচ্ছন্ন ভারতবাসীকে জড়তা ত্যাগ করিয়া আপন ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হইবার জন্য ভারতের অন্যতম দ্রষ্টা পুরুষ বীরকেশরী স্বামী বিবেকানন্দ নিষ্কাম কর্মযোগের মহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হইবার আহ্বান জানাইলেন। মানুষের সেবার মধ্য দিয়াই যে ঈশ্বরের করুণা লাভ করা যায়—এই সত্যকে তিনি ভারতের মোহমুগ্ধ, আত্মবিস্মৃ জাতির নিষ্প্রভ প্রাণে সঞ্চারিত করিয়া দিলেন কর্মযোগের মহামন্ত্র বাণী। তিনি অন্ধকারে দিশাহারা বুভক্ষু হৃদয়কে দিলেন মুক্তি পথের সন্ধান। 

বাল্যজীবন ও শিক্ষা : স্বামী বিবেকানন্দের প্রথম জীবনের নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ দত্ত। অত্যন্ত দূরত্ত বলিয়া তাঁহার জননী বাল্যকালে তাহার নাম দিয়াছিলেন বীরেশ্বর তথা বিলে। তাঁহার নিত্য নতুন দুরত্তপনায় সকলেই ছিলেন তটস্থ। কেবল শিব নাম উচ্চারণেই তিনি শান্ত হইতেন। তাঁহার স্মৃতিশক্তি ছিল অপরিমেয় । নরেন্দ্রনাথের সুন্দর সুঠাম চেহারা ও সুধাকণ্ঠের সুললিত সঙ্গীত পাড়া-প্রতিবেশী ও বন্ধু-বান্ধব সকলকেই আকৃষ্ট ও মুগ্ধ করিত। শুধু প্রশ্ন করা এবং সকল বিষয় স্বয়ং পরীক্ষা করিয়া দেখা ছিল তাঁহার আবাল্য প্রকৃতি। মাত্র চৌদ্দ বৎসর বয়সে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং পরে যথা সময়ে তিনি জেনারেল এসেম্বলীজ কলেজ হইতে সম্মানের সহিত বি. এ. পরীক্ষায় পাশ করেন। 

ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে সংশয় : পাঠ্যজীবন হইতেই স্বামী বিবেকানন্দের ব্যায়াম, খেলাধূলা ও সঙ্গীতচর্চার প্রতি ছিল প্রবল আকর্ষণ। কলেজে পড়ার সময় হইতেই তাঁহার জ্ঞান পিপাসা ক্রমে ক্রমে বৃদ্ধি পাইতে থাকে। এই সময় তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শনশাস্ত্র বিশেষ নিষ্ঠা সহকারে পাঠ করেন। পাশ্চাত্য দর্শন পাঠে তাহার মনে ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্বন্ধে সন্দেহ জাগে। তাঁহার যুক্তিপ্রবণ মন অন্ধবিশ্বাসে তৃপ্ত হয় নাই, অথচ কেহ তাহাকে যুক্তি দ্বারা ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করিয়া দিতে পারেন নাই। বি. এ. পাশ করার পরই তাঁহার পিতার মৃত্যু হয়। পিতার মৃত্যুর পর তিনি পড়াশুনা ছাড়িয়া দিয়া অর্থোপার্জনে মন দেন। এই সময় হঠাৎই যেন একদিন দক্ষিণেশ্বরের কালী সাধক শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সান্নিধ্যে আসেন। ঠাকুর রামকৃষ্ণের মধ্যে কি যেন এক অজানা আকর্ষণ শক্তি ছিল। সেই শক্তির আকর্ষণে নরেন্দ্রনাথের মনের দ্বন্দ্ব কাটিয়া গেল। নাস্তিক নরেন্দ্রনাথের মনের সংশয়-মেঘ কাটিয়া গেল। তিনি রামকৃষ্ণের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে ক্রমে প্রধান শিষ্যে পরিণত হইলেন। 

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ঠাকুরের মৃত্যুর পর তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। তখন তাঁহার নাম হইল স্বামী বিবেকানন্দ। 

পরিব্রাজক বিবেকানন্দ : সন্ন্যাস গ্রহণের পর স্বামীজী পরিব্রাজকের বেশে হিমালয় হইতে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত ভ্রমণ করেন। অধঃপতিত জীবত ভারতীয় জাতিকে তিনি জনসেবায় উদ্বুদ্ধ করিলেন। ভারতের জাতিভেদ প্রথা দূর করিতে সচেষ্ট হইলেন। ভারতবাসীকে বিরাট ঐক্যবোধ, দেশপ্রেম ও আধ্যাত্মিক শক্তির প্রেরণা দিলেন। ভারতবর্ষ যেন নবজন্ম লাভ করিল। সেই সময় ১৮৯৩ সালে আমেরিকায় শিকাগো শহরে এক বিশ্ব ধর্মসভায় কয়েকজন ভক্তের অনুরোধে তিনি সনাতন হিন্দুধর্মের প্রতিনিধি হিসাবে যোগ দেন। তনি ঐ সভায় বহু চেষ্টা করিয়া মাত্র পাঁচ মিনিট বক্তৃতা দানের অনুমতি লাভ করেন। কিন্তু তিনি এক ঝড়ের মতো বিপুল হাদয়াবেগে হিন্দুধর্মের মূল সূত্রগুলির ব্যাখ্যা করিয়া বিশ্বের নানা প্রাপ্ত হইতে আগত শ্রোতৃবর্গকে এক প্রাচীন ধর্মের অমৃতময়ী বাণীর সিঞ্চনে বিমোহিত করিয়া দিলেন। সেইদিন বিশ্ববাসী জানিল, হিন্দু ধর্ম বলিয়া একটি ধর্ম আছে যাহা সকল ধর্মের শ্রেষ্ঠ, যাহা ব্যথাতুর মানব-সন্তানকে প্রকৃত মুক্তির সন্ধান দানে সক্ষম। তিনি তথায় চারি বৎসর কাল থাকিয়া ১৮৯৬ সালে ভারতে ফিরিলেন। আমেরিকার বহু জ্ঞানী-গুণী তাঁহার শিষ্যত্ব গ্রহণ করিয়াছিলেন। যেমন মার্গরেট নোবেল, ভগিনী নিবেদিতা যাহার পরবর্তী নাম হয়। 

রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা : ভারতে প্রত্যাবর্তন করিয়া স্বামীজী সর্বরিক্ত দেশবাসীকে পুনর্গঠন করিবার কাজে মন দেন এবং ১৮৯৭ সালে ‘রামকৃষ্ণ মিশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৯১ সালে তাঁহার অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই স্থাপিত হয় ‘বেলুড় মঠ (গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে। ১৯০০ সালে প্যারিসে যে বিশ্ব ধর্ম সম্মেলন হয় তাহাতে যোগদান করেন। ১৯০২ সালের ৪ঠা জুলাই যোগাভ্যাসে নিরত অবস্থায় স্বামীজীর মহাপ্রয়াণ ঘটে। 

Leave a Reply