SEBA Class-10 Bangla Question Answer| ভাবসম্প্রসারণ

SEBA Class-10 Bangla Question Answer| ভাবসম্প্রসারণ প্রতিটি অধ্যায়ের উত্তর তালিকায় প্রদান করা হয়েছে যাতে আপনি সহজেই বিভিন্ন অধ্যায় জুড়ে ব্রাউজ করতে পারেন এবং আপনার প্রয়োজন SEBA Class-10 Bangla Question Answer| ভাবসম্প্রসারণ এমন একটি নির্বাচন করতে পারেন।

SEBA CLASS 10 (Ass. MEDIUM)

  1. English Solutions
  2. অসমীয়া Questions Answer
  3. বাংলা Questions Answer
  4. বিজ্ঞান Questions Answer
  5. সমাজ বিজ্ঞান Questions Answer
  6. हिंदी ( Elective ) Questions Answer
  7. ভূগোল (Elective) Questions Answer
  8. বুৰঞ্জী (Elective) Questions Answer
  9. Hindi (MIL) Question Answer

SEBA Class-10 Bangla Question Answer| ভাবসম্প্রসারণ

Also, you can read the SCERT book online in these sections Solutions by Expert Teachers as per SCERT (CBSE) Book guidelines. These solutions are part of SCERT All Subject Solutions From above Links . Here we have given SEBA Class-10 Bangla Question Answer|  Solutions for All Subjects, You can practice these here.

১। পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি স্বরূপ। 

উত্তর : মানুষ নিজের ভাগ্যকে নিজেই নির্মাণ করিতে পারে। তাহার ভাগ্য নির্মাণের হাতিয়ার হইতেছে তাহার অক্লান্ত পরিশ্রম। সকলেই সৌভাগ্য চায়। কিন্তু বিনা পরিশ্রমে কোন ব্যক্তি সৌভাগ্যকে জয় করিতে পারেনা। জীবনের বিভিন্ন বাধা-বিপত্তি দেখিয়া নিরাশ না হইয়া পরিশ্রমের মাধ্যমে কর্মে ব্রতী হইয়া থাকিলে ব্যর্থতাকে জয় করা যায়। প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই প্রতিভা থাকে তবে তাহা, সুপ্ত অবস্থায়। পরিশ্রমের দ্বারাই সেই সুপ্ত প্রতিভার জাগরণ ঘটাইতে পারা যায়। পৃথিবীর প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের জীবনে আলোকপাত করিলে দেখা যায় তাহারা অক্লান্ত পরিশ্রমের বিনিময়ে জীবনে উন্নতি করিতে পারিয়াছেন। অলসতা ও কর্মবিমুখতা মানুষের উন্নতির প্রধান অন্তরায়। সৎ পথে অক্লান্ত পরিশ্রম করিয়া কর্ম করিলে অবশ্যই সৌভাগ্য তাহার হাতে ধরা দিবে। পরিশ্রম রূপ অননী ছাড়া সার্থকতা রূপ সন্তান কখনই সম্ভব নয়। তাই বলা হয়, পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি। 

২। যে নদী হারায়ে স্রোত চলিতে না পারে

সহস্র শৈবালদাম বাঁধে আসি তারে।

যে জাতি জীবন হারা অচল অসাড়

পদে পদে বাঁধে তারে জীর্ণ লোকাচার।3] 

-গতিই জীবন, স্থবিরতা মৃত্যুর নামান্তর। ভারতীয় কবি এই সঞ্জীবনী মন্ত্র উচ্চারণ করিয়াছেন—চরৈবেতি, চরৈবেতি।’ অর্থাৎ এগিয়ে চল। ইহাই জীবনের মূলমন্ত্র। যদি কখনও জীবন অগ্রসর হইবার পথে বাধাপ্রাপ্ত হয়, তখন জীবন বিকাশের গৌরব হারাইয়া বিকৃত রূপ ধারণ করে। বিভিন্ন পাপ এবং পঙ্কিলতার আবর্তে জীবন হতশ্রী হইয়া পড়ে। 

ব্যক্তির জীবনে ইহা যেরূপ সত্য, জাতির জীবনেও অনুরূপ সত্য। সকল জাতির ও থাকে এক স্বাভাবিক গতির ছন্দ। সেই গতির ছন্দে অগ্রসর হইয়া জাতি সাফল্য লাভ করে। যদি কখনও সেই জাতি গতির ছন্দ হারাইয়া ফেলে তখন সেই জাতির জীবনে নামিয়া আসে দুর্ভাগ্যের ঘনঘটা। জড়তা প্রগতির পথকে রুদ্ধ করে। ধীরে ধীরে তাহাতে জন্ম নেয় বিভিন্ন বিকৃতি এবং পচন। দেশাচার এবং লোকাচারের আবর্জনা স্তূপ জীবনের ধারাকে পঙ্গু এবং নিশ্চল করিয়া দেয়। দুর্যোগের তমসা ঘন রজনী জাতির অস্তিত্ব বিলুপ্ত করিবার জন্য বিভিন্ন বিধি-নিষেধের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করিয়া নির্মমভাবে ঠেলিয়া দেয়।

৩। বহুরূপে সম্মুখে তোমার

ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর

জীবে প্রেম করে যেইজন

সেইজন সেবিছে ঈশ্বর। 

পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষ তাহার আপন রুচি ও পদ্ধতি অনুসারে ঈশ্বরের আরাধনা । করিয়া তাঁহার কৃপালাভ করিতে চাহে ব্যক্তিগত মুক্তির চেষ্টা করে। এই উদ্দেশ্যে অনেক কঠোর তপস্যা করিয়া আত্মনির্যাতনও সহ্য করিয়া থাকে। কিন্তু তাহারই শ্রেষ্ঠ সৃ আধুনির্যাতন করুক, লিখার তারা আশা করেন না। প্রতিটি জীবের মধ্যেই তিনি বিরাজমান। জীব কষ্ট পাইলে তিনিও কষ্ট পাইয়া থাকেন। কাজেই ভগবদ্প্রীতির উদ্দেশ্যে যাগ-যজ্ঞ, তত্ত্ব- মস্ত, আরাধনা ও পূজার্চনায় সময় না কাটাইয়া তাহারই সৃষ্ট জীবকে সেবা করিলেই তিনি সন্তুষ্ট হইবেন। শাস্ত্রেও কথিত আছে যেখানে জীব, সেখানেই শিব। সর্বজীবেই তাঁহার অধিষ্ঠান। বিচিত্র ভেদাভেদ থাকা সত্ত্বেও পৃথিবীর যাবতীয় ধর্মের প্রবক্তাগণ এবং মনীষীরা এই বিষয়ে একমত যে, জীবের কল্যাণসাধনই মানবের পরম পুণ্য কর্ম হওয়া বাঞ্ছনীয়। স্বামী বিবেকানন্দ অতি সহজ ভাষায় বলিয়াছেন—পৃথিবীর যাবতীয় জীবকে ছাড়িয়া অন্যত্র ঈশ্বরকে খুঁজিয়া লাভ নাই, সর্বজীবের মধ্যেই তিনি বিদ্যমান। কাজেই সকল প্রকারের জীবকে অন্তর দিয়া ভালবাসিলে এবং নিঃস্বার্থভাবে সেবা করিলেই ঈশ্বর সেবা করা হয়। 

৪। শুনহ মানুষ ভাই—

সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই। 

মানুষ দেবতার আরাধনার জন্য দেবালয় প্রতিষ্ঠা করে। যথেষ্ট অর্থাদি ব্যয় করিয়া দেব সেবার আয়োজন করে। যদিও দেব সেবার আয়োজনের মাধ্যমে পরোক্ষে মানবেরই সেবা হইয়া থাকে, তথাপি উহার মধ্যে আয়োজকের গর্বিত ভাবটি ফুটিয়া উঠে। পংক্তি দুইটিতে আপাততঃ দেখা যায়—মানুষই পৃথিবীতে একমাত্র শ্রেষ্ঠ জীব, তাহাকে সেবা করিলে ভগবদ্ সেবার ফল লাভ হয়। কিন্তু কাব্যাংশটি রচনা করিয়াছেন চণ্ডীদাস — দীন চণ্ডীদাস। তাহার সময়ে, এমনকি উনিশ শতকের পূর্ব পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের কোথায়ও মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলা হয় নাই। 

বস্তুতঃ আলোচ্য পংক্তি দুইটিতে উল্লিখিত দুই মানুষ দুই অর্থে প্রযুক্ত হইয়াছে। প্রথম মানুষটি মান আর হুঁশ যুক্ত দুই চরণবিশিষ্ট জীব মানুষকে উদ্দেশ্য করিয়া বলা হইয়াছে। দ্বিতীয় পংক্তিটিতে উল্লিখিত মানুষ হইতেছে তন্ত্রোক্ত মানুষ যাহার দেহভাগুকে ব্রহ্মাণ্ড বলা। হয়। তান্ত্রিক সাধক দীন চণ্ডীদাস বলেন, পৃথিবীতে এমন কিছু নাই যাহা কিনা মানুষের দেহের মধ্যে নাই। এই দেহের মধ্যেই রহিয়াছে বিশ্ব সৃষ্টির মূল উপাদান পঞ্চভূত, এখানেই আছে তন্ত্রোক্ত মণিপুর, বিষ্ণুলোক, সপ্তর্ষিলোক, ঋষিলোক ইত্যাদি মহাবিশ্বের যাবতীয় সৃষ্টি। সাধকের এই মানবদেহের মধ্যেই মহাবিশ্বের সকল প্রকারের সকল দেবতার উপস্থিতি

অনুভব করেন। কাজেই মানুষের দেহই একমাত্র সত্য বস্তু; ইহার অধিক সত্য পৃথিবীতে আর কিছু নাই। 

৫। মেঘ দেখে কেউ করিস নে ভয়।

আড়ালে তার সূর্য হাসে। 

দুঃখ-দুর্দশাগ্রস্থ মানুষের ধারণা, সংসার একটি দুঃখের কারাগার, ইহা হইতে নিষ্কৃতি লাভের উপায় নাই। কিন্তু এইরূপ ধারণার মধ্যে কোন সত্যতা নাই। যদি তাহাই হইত, তাহা হইলে মানুষের জীবন অর্থহীন হইয়া পড়িত। জীবনের সুখ ও দুঃখ চক্রবং আবর্তিত হয়। দুঃখের পর সুখ আবার সুখের পর দুঃখ আসিতে থাকে। যদি তাহা না হইত, তাহা হইলে আশাহীন হইয়া মানুষের জীবনের অগ্রগতি স্তব্ধ হইয়া যাইত। দুঃখের সময় মানুষ যদি ধৈর্য সহকারে তাহা হইতে উত্তীর্ণ হইবার চেষ্টা করে, তাহা হইলে দেখা যায়, তাহার জন্য এক উজ্জ্বল সুখের প্রভাত আসিয়াছে। 

প্রতিটি মেঘের পিছনে যেমন সূর্যালোকের একটি আলোকরেখা দেখা যায়, প্রতিটি মানুষের জীবনেও সেইরূপ দুঃখের পিছনে সুখের আলোকরেখা রহিয়াছে। এইজন্যে দুঃখে পতিত হইলে ভীত ও নিশ্চেষ্ট হওয়া উচিত নহে। সাংসারিক জীবনে দুঃখকে সহজভাবে গ্রহণ করিয়া উহা হইতে পরিত্রাণের পথ আবিষ্কার করা উচিত। সুখ অবশ্যই আসিবে, কেননা চিরদিন কৃষ্ণপক্ষ থাকে না, ইহার পর শুক্লপক্ষ আসিবেই। কাজেই সংসারে দুঃখে ভীত হওয়া উচিত নহে; মেঘের আড়ালে যেমন সূর্য থাকে, দুঃখের পর তেমনি সুখের আগমন ঘটে। 

৬। প্রাচীরের ছিদ্রে এক নাম গোত্রহীন

ফুটিয়াছে ছোট ফুল অতিশয় দীন।

ধিক্ ধিক্ বলে তারে কাননে সবাই

সূর্য উঠি বলে তারে ভাল আছ, ভাই? 

প্রকৃত মহত চরিত্রের বৈশিষ্ট্য হইতেছে উদারতা। আপন চারিত্রিক উদারতায় সকলের সহিত সম্বন্ধ স্থাপন করে। তাহাদের নিকট বিত্ত-শক্তির ভেদ বৈষম্য কোনরূপ প্রাচীর সৃষ্টি করিতে পারে না। ঔদার্যের মন্ত্রে দীক্ষিত প্রাণ লইয়া আপন অন্তরের তাগিদে সবস্তরে আপনাকে বিলাইয়া দেয়। অপরদিকে যাহারা সংকীর্ণ চিত্ত বিশিষ্ট তাহারা দুর্বল, অসহায়দের উপেক্ষা করিয়া শক্তি ও বিত্তে সমৃদ্ধদের প্রতি আলিঙ্গনের হস্ত প্রসারিত করিয়া দেয়। আভিজাত্যের বর্ম পরিধান করিয়া নিজেদের স্বতন্ত্র বলিয়া অহমিকা প্রকাশ করিয়া গর্ব অনুভব করে। কেবলই স্বার্থচিন্তা ও ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির হিসাব-নিকাশের অন্ধ করিতে ব্যস্ত থাকে। প্রাচীরের গাত্র ভেদ করিয়া এক অনামী চারাগাছ প্রকৃতি আলো-বাতাসে পৃষ্ট হইয়া অনাদরে অবহেলায় ছোট্ট এক ফুলের জন্ম দেয়। মালীর সযত্ন পরিচর্যায় বন্ধিত ফুলেরা আপন সৌন্দর্য ও সৌরভের অহমিকায় তাহাকে অবজ্ঞা করে। উপেক্ষার আবিল দৃষ্টিতে তাহাকে তুচ্ছ, দীন করিয়া রাখে। কিন্তু সূর্য যে প্রাণশক্তির উৎস, তার আলোকধারা হইতে কেহই বঞ্চিত হয় না। সমভাবে সকলের উপর আলোকের ঝর্ণাধারায় সঞ্জীবিত করে। প্রকৃত মহতের নিকট উচ্চ-নীচ, ছোট-বড় ভেদভাব থাকে না। অনাদৃত ফুলের উপরও তার আলো সমভাবে বিলাইয়া দেয়। এখানেই মহতের মহত্ত্ব প্রকাশ পায়। ইহাই শ্রেষ্ঠত্বের চরম নিদর্শন। 

৭। নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস,

ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস।

নদীর ওপার বসি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।

কহে, ‘যাহা কিছু সুখ সকলি ওপারে।’ 

মানুষের আশা-আকাঙক্ষা সীমাহীন। এক অতৃপ্ত মন-প্রাণ লইয়া সে কেবলই নিজেকে নিরাশভাবে। তাহার ধারণা, এই পৃথিবীতে কেবল সে ছাড়া আর বাকী সকলেই সুখী। সংসারের সকল প্রকারের দুঃখ ও যন্ত্রণা কেবল তাহারই জন্য। অথচ অন্য সকলে যেন সকল প্রকারের সাংসারিক সুখভোগ করিতেছে। মানুষের আশা কোনদিনই মিটে না। একটির অভাব পূর্ণ হইলে সে অন্য একটির অভাব অনুভব করে। আপন অবস্থায় কেহই সন্তুষ্ট থাকে না, মানুষের ইহা এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য। একটির পর আরেকটির চাহিদা তাহার বাড়িতেই থাকে সে আরও চায়, আরও বেশি তাহার দরকার। তাই যাহা পায় তাহা লইয়া সে সন্তুষ্ট থাকিতে পারে না। মানুষ আশা করে অন্তহীন, কিন্তু প্রাপ্তিযোগ তাহার ঘটে খুবই কম। তাহার ধারণা অন্যেরা সকল কিছুই পাইতেছে। 

বস্তুতঃ মানুষ এক অন্যের সুখ-দুঃখের পরিমাপ করিতে পারে না। তাই আমরা পরস্পর পরস্পরকে ঈর্ষা করিয়া থাকি। সুখ ও দুঃখ প্রতিটি মানুষের জীবনে পর্যায়ক্রমে আসিতে থাকে। কেহ চিরসুখী আবার কেহ চিরদুঃখী — এইরূপ কখনও দেখিতে পাওয়া যায় না। নদীর একটি পাড় যদি মনে করে ভাঙ্গা গড়া কেবল তাহার দিকেই হইতেছে তাহা হইলে ভুল হইবে; নদীতে ভাঙ্গা-গড়া উভয় পাড়েই ঘটিয়া থাকে। কিন্তু মানুষ নিজের দুঃখটাকেই বড় করিয়া দেখিতে অভ্যন্ত বলিয়াই অপরকে চিরসুখী ভাবে, যাহার ফলে আপন দুঃখ ভারাক্রান্ত মনকে আরও অধিক দুঃখী করিয়া তোলে। 

৮। পুষ্প আপনার জন্য ফুটে না।

পরের জন্য তোমার হৃদয় কুসুমকে প্রস্ফুটিত করিও। 

পরের মঙ্গলের জন্য স্বার্থত্যাগ করা পরম ধর্ম। ইহাতে আত্মা গৌরবপ্রাপ্ত হয়। এককভাবে মানুষ কোনদিন পূর্ণ হইতে পারে না। সমাজকে লইয়া অসংখ্য মানুষের সহিত প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হইয়া মানুষ পূর্ণতা লাভ করে। যাহারা ব্যক্তিগত স্বার্থ লইয়াই জগতে ব্যস্ত থাকে. তাহারা বৃহত্তম সমাজ জীবনে কীর্তিমান হওয়া সত্ত্বেও মনুষ্যত্বের দাবী করিতে পারে না। ফুল নিজের জন্য কোনদিন ফুটে না, তাহার জীবনটি পরার্থপরতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মাটি, সূর্যালোক ও বায়ুমণ্ডল হইতে প্রয়োজনীয় উপাদান আত্মসাৎ করিয়া ফুল বিচিত্র বর্ণ ধারণ ২. করে এবং সৌরভ সঞ্চয় করে। অতঃপর নিঃস্বার্থভাবে সে উহা জীবজগতের উদ্দেশ্যে বিলাইয়া দেয়। 

অপরের নয়নের তৃপ্তি ও মানসিক প্রীতি উৎপাদন করিয়াই সে তাহার জীবনকে ধন্য করে। ফুলের স্বার্থত্যাগের এই আদর্শ আমাদের প্রতিটি মানুষের গ্রহণ করা উচিত। অপরের মঙ্গলের জন্য তথা প্রীতি উৎপাদনের জন্য মানুষের হৃদয়-কুসুমকে প্রস্ফুটিত করানো উচিত। যাহার অন্তরটি পরের দুঃখে সহানুভূতিসম্পন্ন হয় এবং পরের হিতসাধনে সদা তৎপর থাকে, তাহার হৃদয়কেই কুসুম কোমল তথা পুষ্প স্বভাবযুক্ত বলা যাইতে পারে। 

৯। অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে,

তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে। 

নীরবে নিশ্চেষ্টভাবে অন্যায়-অবিচার সহ্য করিলে মনুষ্যত্নের অবমাননা করা হয়। অন্যায়কারী যেমন অপরাধী, অন্যায়ের প্রশ্রয়দাতাও অনুরূপ অভিযোগের পাত্র। কারণ প্রশয়লাভে অন্যায়কারীর দুঃসাহস বাড়িয়া গিয়া শেষ পর্যন্ত সমাজের সমূহ অকল্যাণ করে। সুতরাং জ্ঞাতসারে অন্যায় সহ্য করা সামাজিক অপরাধ। কিন্তু সাধারণ মানুষ স্বভাবত দুর্বলচিত্ত বলিয়া প্রবলের বিরুদ্ধে দাঁড়াইতে পারে না। ভীরুতাবশতঃ সে অন্যায়ের নিকট নতজানু হয়। ক্ষমা মহৎগুণ হইলেও অপাত্রে ক্ষমা প্রদর্শন অবিবেচনার পরিচায়ক। শক্তিমানের পক্ষেই ক্ষমা শোভা পায়, দুর্বলের জীবনে তাহা কাপুরুষতা নাম মাত্র। পরম ন্যায়াধীশ ঈশ্বর অন্যায় কর্মের অনুষ্ঠানকে অবশ্য শাস্তি দিয়া থাকেন। কিন্তু অন্যায়ের প্রশয়দাতাকে তিনি ঘৃণা করেন। কারণ সে ঈশ্বরপ্রদত্ত ও মনুষ্যত্বের শক্তি ও মর্যাদাকে ডুলুষ্ঠিত করিয়া অন্যায়ের নিকট আত্মবিলা করে। তাই বিধাতার ক্ষুদ্র রোধ এইরূপ ক্লীবতা ও নির্বিকারত্বের উপর ঝরিয়া পড়ে। 

১০। ইচ্ছা থাকিলেই উপায় হয়। 

বর্তমান পৃথিবীতে ইচ্ছাই মানুষকে অগ্রগতির দিকে ধাবিত করে। মানুষের ইচ্ছাই প্রধান। ইচ্ছা না থাকিলে মানুষ কর্মবিমুখ হইয়া পড়ে। এই ইচ্ছাই মানুষকে উদ্যম দান করিয়া কর্মপরায়ণ করিতে সচেষ্ট করে। ইচ্ছাই মানুষকে উপায় দান করে। যাহার কোন ইচ্ছা না থাকে সেই ব্যক্তি কর্মসাফল্যে বঞ্চিত হয়। জীবনে সতত পরাজয় বরণ করে। মানুষের ইচ্ছা না থাকিলে সে দুর্বলতার দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করে। স্বভাবতই এই নেতিবাচক মনোভাব মানুষকে কর্মবিমুখ ও জীবন সম্বন্ধে বীতস্পৃহ করিয়া তোলে। এই শ্রেণীর মানুষ কেবল ভাগ্যের উপর নির্ভরশীল হইয়া নিষ্ক্রিয় হইয়া অলসভাবে দিনযাপন করে। 

কিন্তু এই নিষ্ক্রিয়তা মৃত্যুর নামান্তর। ইচ্ছাহীন হইয়া জড় পদার্থের ন্যায় নিশ্চল হইয়া থাকিলেই যদি জীবন সার্থক হইত তাহা হইলে সৃষ্টিকর্তা কখনই মানুষকে হাত-পা ও বুদ্ধিবৃত্তি দান করিয়া পৃথিবীতে প্রেরণ করিতেন না। ইচ্ছা ও প্রয়াসের মধ্য দিয়া মানুষ প্রয়োজনীয় সকল কিছু অর্জন করিবে বলিয়াই ঈশ্বর মানুষকে কর্মক্ষমতা প্রদান করিয়াছেন। যাহা কিছু দুর্লভ তাহা মানুষ ইচ্ছার দ্বারা, প্রচেষ্টার দ্বারা অনায়ত্তকে আয়ত্তে আনয়ন করিয়া মানুষ তাহার কর্মশক্তিরই পরিচয় দিতেছে। মরজগতে স্বীয় শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করিতেছে। কিন্তু ইচ্ছা বা উদাম না থাকিলে কোন কিছুই অর্জন করা সম্ভব নহে। ইচ্ছা না থাকিলে তাহাকে পদে পদে অপমানিত, লজ্জিত ও পরাজয় বরণ করিতে হয়।

অতএব ইচ্ছা থাকিলেই সর্বকর্মে কর্ম সাফল্য অর্জিত হয়, উপায় অর্জিত হয়। শাস্ত্রে সেইজন্য কথিত আছে নিদ্রিত সিংহের মুখে মৃগসকল কখনই নিজেই আগমন করিয়া প্রবেশ করে না। সিংহকে আহারের জন্য চেষ্টা করিতে হইবে, ইচ্ছা থাকিতে হইবে। তাহা হইলে তাহার ইচ্ছা উপায়ে রূপান্তরিত হইবে। 

১১। এ জগতে যাঁহারাই বড় হইয়াছেন, তাঁহারা আরামে পালিত লক্ষ্মীর ক্রীতদাস নহেন। 

বর্তমান পৃথিবীতে যাহারা বড় হইয়াছেন, তাহাদিগকে যথেষ্ট পরিশ্রম করিতে হইয়াছে। কারণ ‘Life is not a bed of roses. জীবনে প্রতিষ্ঠিত হইতে হইলে মানুষকে উদ্যমী হইতে হইবে, কষ্ট সহা করিতে হইবে। কঠোর পরিশ্রম বা অধ্যবসায় ছাড়া কেহই বাহি বা খ্যাতি অর্জন করতে সমর্থ হন না। 

লক্ষ্মীদেবী সৌভাগ্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। লক্ষ্মীদেবী স্বয়ং কাহাকেও আরামে পালিত ক্রীতদাস হিসাবে গ্রহণ করেন না। ভাগ্যলক্ষ্মীর কৃপা লাভ করিতে হইলে প্রয়োজন উদ্যম, প্রয়োজন কঠোর পরিশ্রম, ঐকান্তিক অধ্যবসায়। কঠোর অধ্যবসায়ের জন্য জগতে বৃত্তি বৈজ্ঞানিকগণ কীর্তি অর্জনে সমর্থ হইয়াছেন। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, বেঙ্কট রমন, সাহানী প্রমুখ বৈজ্ঞানিকগণ এবং কবি কীটস, মিলটন, সেক্সপিয়র, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্যাসাগর, সুভাষচন্দ্র সকলকেই লক্ষ্মীদেবীর সৌভাগ্য লাভ করিতে অধিক পরিশ্রম করিতে হইয়াছিল। উদ্যমশীল ছাড়া কেহই ভাগ্যবান হইতে পারেন না। উদ্যমশীল ও কর্মনিষ্ঠ ব্যক্তি ভাগ্যের উপর নির্ভর করিয়া নিজ কর্তব্য সাধনে বিরত থাকিয়া কখনই আলস্যে দিন অতিবাহিত করেন না। এইজন্যই ভাগ্যদেবী যত্নশীল, কর্মনিষ্ঠ ও অধ্যবসায়ী ব্যক্তিকে আশ্রয় করেন অর্থাৎ সৌভাগ্য প্রদান করেন। কিন্তু ভীরু ও কর্মবিমুখ ব্যক্তি নিজ কর্ম না করিয়া সম্পূর্ণরূপে অদৃষ্টের উপর নির্ভর করেন এবং আলস্যে দিনযাপন করেন, ইহার ফলে তাঁহারা জীবনে। সৌভাগ্যলাভে বঞ্চিত হন। নিজের কর্মবিমুখতাই যে তাহার দুর্ভাগ্যের কারণ তাহা কর্মবিমুখ ব্যক্তি উপলব্ধি করিতে পারে না। 

সুতরাং প্রত্যেকেরই জীবনে সাফল্য ও সৌভাগ্য অর্জিত হয়, তাহার কর্মনিষ্ঠা, সাহস ও. অধ্যবসায়ের ফলে। ইহাই সনাতন ধর্ম, অতএব এই জগতে যাঁহারাই বড় হইয়াছেন। তাঁহারা নিজেদের পরিশ্রমের জন্য শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হইয়াছেন; তাঁহারা কেহই আরামে পালিত লক্ষ্মীর ক্রীতদাস নহেন উপরন্তু লক্ষ্মীরই কৃপাধন্য ব্যক্তি। 

১২। বন্দীও যেমন বন্দী, বিচারকও তেমন বন্দী। 

ন্যায়ের শুভ্র পাষাণ বেদীর উপর বিচারকের আসন পাতা। আপাতদৃষ্টিতে বিচারকের চারিদিকে কোন বন্ধন দৃষ্টিগোচর হয় না অথচ বন্দীর দিকে লক্ষ্য করিলে দেখা যায় তাহার। হাতে বেড়ি, পায়ে বেড়ি। বিচারক ইচ্ছা করিলে তাহাকে বন্ধনদশা হইতে মুক্তি দিতে। পারেন। কিন্তু তাহা হইতে পারেনা। কারণ বিচারকও আইনের বন্ধনে আবদ্ধ। সেই গভী অতিক্রম করিবার স্বাধীনতা তাহার নাই। আইন বিভিন্ন ধারা উপধারায় বিভক্ত। কোন অপরাধে কোন আইন প্রযুক্ত হইবে তাহা দেশের দণ্ড বিধিতে সুনির্দিষ্ট করা হইয়াছে। সেখানে বিচারকের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোন মূল্য নাই। অতএব বিচারক এবং বন্দী উভয়েই বন্দী। উভয়ের উপর কতকগুলি সুনির্দিষ্ট বিধি-নিষেধের গণ্ডী আঁকিয়া দেওয়া হইয়াছে। যাহা অতিক্রম করিলে অপরাধ বলিয়া গণ্য হয়। বিচারকের আসনে আবেগ, সহানুভূতি ইত্যাদির প্রবেশ নিষেধ। বন্দীর সকরুণ নয়নে যদি কোন বিচারক সমব্যথী হইয়া তাহাকে মুক্তি দেন তাহা হইলে তিনি অযোগ্য বলিয়া বিবেচিত হইবেন এবং বিচারকের আসন হইতে তাহাকে অপসারিত হইতে হইবে। অতএব দেখা যায় বন্দী এবং বিচারক উভয়েই নিজ নিজ সীমায় বন্দী। 

১৩। কহিলা ভিঞ্চার ঝুলি টাকার খলিরে

“আমরা কুটুম্ব দোঁহে ভুলে গেলি কিরে?’

থলি বলে, কুটুম্বিতা তুমিও ভুলিতে

আমার যা আছে গেলে তোমার ঝুলিতে। 

অর্থ সকল অনর্থের মূল। জাগতিক সুখের আশায় মানুষ দিবারাত্র অর্থ উপার্জনে ব্রতী হয়। অর্থ একবার লাভ করিতে পারিলে মানুষকে অর্থ লালসা ধীরে ধীরে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলে। ধীরে ধীরে তাহার অর্থভাণ্ডার পূর্ণ হইয়া উঠে। কিন্তু অর্থের সঙ্গে থাকে অর্থের অহংকার। সেই অহংকারে মানুষ স্ফীত হইয়া উঠে। তখন সে তাহার চারিপাশের মানুষকে মানুষ বলিয়া মনে করেনা। ফলে বন্ধু-বিচ্ছেদ, আত্মীয়-বিচ্ছেদ এবং প্রিয়জন-বিচ্ছেদ অনিবার্য হইয়া দেখা দেয়। দুই হস্ত প্রসারিত করিয়া অর্থভাণ্ডার আঁকড়াইয়া ধরিয়া সে ধনকুবের সাজে। কিন্তু সকলকে হারাইয়া সে এক নিঃসঙ্গ নির্জনতায় নির্বাসিত হয়। অপরদিকে নিরন্তর অর্থচিন্তায় তার হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়। সেখানে মানবিক অনুভূতি স্নেহ, প্রেম, দয়া, ভক্তি এবং দাক্ষিণ্যের প্রবেশ রুদ্ধ হইয়া যায়। তাহাকে অন্তঃসারশূন্য মানবিকতাহীন জানোয়ারের সহিত তুলনা করা যায়। শুন হৃদয় পূর্ণ করিবার জন্য অনিবার্যরূপে দেখা দেয় ঐশ্বর্যের অহংকার। মুদ্রা-রাক্ষস এইভাবে মানুষের হৃদয়ের সমস্ত স্বাভাবিক সরসতা এমন। কি তাহার মনুষ্যত্ব পর্যন্ত অপহরণ করিয়া তাহাকে একটি দয়াহীন, প্রীতিহীন, ছায়াহীন ভয়ংকর মরুভূমিতে পরিণত করে। 

১৪। ‘কে লইবে মোর কার্য কহে সন্ধ্যা রবি,

শুনিয়া জগৎ রহে নিরুত্তর ছবি।

মাটির প্রদীপ ছিল, সে কহিল ‘স্বামী

আমার যেটুকু সাধ্য করিব তা আমি।’ 

পৃথিবীতে সকলের শক্তি সমান নয়। যাহার যতটুকু শক্তি আছে তাহা লইয়াই বিশ্বের বিশাল কর্মযজ্ঞে ঝাপাইয়া পড়িতে হয়। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শক্তির সমন্বয়ে রচিত হয় যে বিশাল শক্তি সংঘ তাহা দ্বারাই পৃথিবীতে অনেক অসাধ্যও সাধন করা সম্ভবপর হয়। কিন্তু প্রত্যেক মহৎ কর্মানুষ্ঠানের মধ্যে আছে দুঃখ, আছে অকুণ্ঠ ত্যাগ স্বীকার, মহাপুরুষেরা অসীম ত্যাগ স্বীকার করিয়া পৃথিবীর দুঃখ-কষ্ট দূর করিবার জন্যে জীবনপণ প্রয়াস করেন। যে আদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত হইয়া তাঁহারা কর্মে ঝাপাইয়া পড়েন, সাধারণ স্বার্থ সন্ধানী মানুষ তাহা উপলব্ধি করিতে পারে না। প্রতিনিয়ত ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং ব্যক্তিগত লাভক্ষতির মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখে। এইভাবে মহান ব্রত হইতে নিজেদের দূরে রাখে। যাঁহারা নিজেদের বুকের পাঁজর জ্বালাইয়া অন্ধকারে পথ দেখান, পৃথিবীতে আলো আনিবার জন্য জীবনপণ করেন, তাঁহাদেরই আদর্শে অনুপ্রাণিত হইয়া পরবর্তী সেবাব্রতীরা ছুটিয়া আসে। ক্ষমতা যত সীমিত হউক তাহা লইয়াই তাহারা সেবাব্রতে ঝাপাইয়া পড়ে। তাহারাই পৃথিবীর মহত্ত্বের আলোর শিখাকে বহন করে। 

১৫। উত্তম নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথে,

তিনিই মধ্যম যিনি চলেন তফাতে। 

যাহারা প্রকৃত জ্ঞানী তাহাদের নিকট সকলেই সমান। সকলের সহিত তাহারা সম্পর্ক স্থাপন করে। নিজের বিচার-বিবেচনা এবং প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তায় তাহারা অধম, নিকৃষ্টের সহিত ও নির্দ্বিধায় মিশিতে পারেন। ‘সঙ্গ দোষে শত গুণ নাশে।’—এ প্রবাদ বাক্যে তাহারা বিশ্বাসী নয়। কারণ তাহাদের চারিত্রিক দৃঢ়তার বর্ম ভেদ করিয়া দুর্জনের অসৎ বুদ্ধি কখনই তাহাদের অন্তরে প্রবেশ করিতে পারেনা। সেই হেতু তাহারা সৎ-অসৎ কোনরূপ বাছ বিচার করে না। কারণ তাহাদের স্থির বিশ্বাস যে অধম, হীন ব্যক্তির মালিন্য তাহাদের অন্তরকে কলুষিত করিতে পারিবেনা। মহতের উদারতাই আভরণ। সূর্যের আলো যেরূপ সর্বত্র প্রকাশিত মহৎ ব্যক্তিরও সেইরূপ সর্বত্র গমনাগমন। অপরদিকে সাধারন মানুষ যাহাদের চারিত্রিক দৃঢ়তা নাই তাহারা সর্বদাই সঙ্গী নির্বাচন করে। তাহারা ভালোত্বের আবরণে নিজেকে আবৃত করিয়া দুর্জনের সংস্পর্শ বাঁচাইয়া চলিবার প্রয়াস করে। এইরূপ চরিত্রের ব্যক্তিরাই মধ্যম বলিয়া পরিগণিত হয়। তাহাদের অন্তরে শক্তি, সাহস নাই বলিয়া সহজে প্রভাবিত হইবার আশঙ্কায় একটা ব্যবধান গড়িয়া তুলে। 

১৬। কেন পান্থ ক্ষান্ত হও হেরি দীর্ঘ পথ

উদ্যম বিহনে কার পুরে মনোরথ? 

এই পৃথিবী সংগ্রাম ক্ষেত্র। এখানে প্রত্যেক মানুষকে নিজের আশা-আকাঙ্খা পূর্ণ করিবার জন্যে শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী পরিশ্রম করিতে হয়। পরিশ্রমকে হাতিয়ার করিয়া জীবন সংগ্রামে জয়লাভ করিতে হইবে। পৃথিবীতে যাহারা উদ্যোগী, যাহারা পরিশ্রমী, তাহারাই সৌভাগ্য লক্ষ্মীর হাত হইতে বিজয় মালা ছিনাইয়া আনিতে সমর্থ হয়। সার্থকতা তাহাদের পদ চুম্বন করে। 

কর্মই ভাগ্যদেবীর পূজার বোধন মন্ত্র। উদ্যম তথা উদ্যোগ কর্মের ভিত্তি ভূমির প্রধান প্রস্তর। পৃথিবীতে যাঁহারা বড় হইয়াছেন। খ্যাতি অর্জন করিয়াছেন তাহারা সকলেই যে কর্মা, উদ্যোগী ছিলেন তাহা সুনিশ্চিত। সিংহ বনের রাজা। কিন্তু তাহাকেও খাদ্য সংগ্রহ করিবার জন্য উদ্যোগী হইতে হয়। “নহি সুপ্তস্য সিংহস্য প্রবিশত্তি মুখে মৃগাঃ” অর্থাৎ নিদ্রিত সিংহের মুখে হরিণ কখনই প্রবেশ করেনা। খাদ্য অন্বেষণে তাহাকেও ইতঃস্তত বিচরণ করিতে হয়। 

অতএব “উত্তিষ্ঠত জাগ্ৰত প্ৰাপ্য বরান্ নিবোধত” । সৌভাগ্য লক্ষ্মী প্রতিনিয়ত মানুষকে। কর্মের পথে আহ্বান জানায়। উদ্যোগী হইয়া সেই কর্মযজ্ঞে ঝাপাইয়া পড়িতে হইবে এবং বিজয় মালার অধিকারী হইতে হইবে। 

১৭। যে করে ধর্মের নামে

বিদ্বেষ সঞ্চিত

ঈশ্বরকে অর্ঘ্য হতে

সে করে বঞ্চিত।

ধর্মের নামে পৃথিবীতে দেখা দিয়াছে হানাহানি, মারামারি। মানুষ তাহার স্বাভাবিক ঈশ্বর-প্রীতির প্রেরণায় যুগে যুগে দেবতার উদ্দেশ্যে রচনা করিয়াছে পূজার অর্ঘ্য। কিন্তু সেই অর্ঘ্য দেবতার নিকট পৌঁছায়না। তাই মানুষ ঈশ্বরের কৃপা লাভে বঞ্চিত। কারণ মানুষ ধর্মীয় সঙ্কীর্ণতায় ঈশ্বরের মধ্যেও এক গণ্ডী অঙ্কন করিয়াছে। প্রকৃতপক্ষে ঈশ্বর এক, মন্দির, মসজিদ, গীর্জায় যে যেইরূপে তাঁহাকে ভজনা করে, সেই ভজন তাঁহার দরবারে পৌঁছায়। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে মানুষ আজ আচ্ছন্ন। ধর্মের নামে তাহারা নানা চক্রান্তে লিপ্ত। সেই ঘৃণ্য চক্রান্ত হইতে তাহারা অপর ধর্মকে কলঙ্কিত করে। অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করে। নিত্য নূতন রক্তাক্ত সংঘাত এবং সংঘর্ষে মত্ত হয়। 

ঈশ্বর মানুষের সৃষ্ট সমস্ত ভেদ-বিভেদের উচ্চে অবস্থিত। মানবতা যেখানে লাঞ্ছিত। ধর্মের নামে হিংসায় যখন মানুষ উন্মত্ত। ঈর্ষা-বিদ্বেষের এইরূপ মানসিকতায় দেবতার জন্য উৎসর্গীকৃত শ্রদ্ধাভক্তির নৈবেদ্য কখনই ঈশ্বর গ্রহণ করেন না। ভগবান ভক্তের নির্মল হৃদয়ের অর্ঘ্য গ্রহণ করেন। বিদ্বেষভাবাপন্ন, মসীমারা অন্তরের অর্থ তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। পবিত্র হৃদয়ের আহ্বানে তিনি সাড়া দেন। 

১৮। সকলের তরে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে। –

মানুষ বিভিন্ন সম্পর্কে অসংখ্য মানুষের সহিত আবদ্ধ। এইভাবে তাহার চাওয়া- পাওয়ার পূর্ণতা ঘটে এবং মনুষ্য জীবন সুন্দর ও সার্থক হয়। একক মানুষ বড় অসহায়। তাহার জীবন নিষ্ফল। পার্থিব জীবনের সুখ, সমৃদ্ধির জন্য সমাজের প্রত্যেক মানুষ একে অপরের উপর নির্ভরশীল। একে অপরের পরিপূরক। 

ধূলার এই ধরণীতে মানুষের আবির্ভাবের ঊষালগ্ন হইতেই একে অপরের প্রয়োজনে দাঁড়াইয়াছে। তাহারই ফলে মানুষ প্রকৃতির রাজ্যে দুর্জয়। পৃথিবীকে করিয়াছে সুন্দর, সমৃদ্ধ এবং বাসযোগ্য। 

প্রাত্যহিক জীবনের দিকে দৃষ্টিপাত করিলে দেখা যায় যে বিধাতা প্রত্যেক মানুষকে প্রত্যেকের প্রয়োজনে সৃষ্টি করিয়াছে। প্রত্যেকের বিভিন্ন কর্মসত্তার দ্বারা প্রত্যেকের চাহিদা তৃপ্ত হইতেছে। পৃথিবীতে কেহই নিজেকে স্বয়ং সম্পূর্ণ বলিতে পারেনা। সকলের সহিত সকলের এক যোগসূত্রে আবদ্ধ। 

১৯। যেই জন পুণ্যবান কেনা তারে বাসে ভাল?

তাহাতে মহত্ত্ব কিবা আর?

পাপীরে যে ভালবাসে, আমি ভালবাসি তারে

সেই জন প্রেম-অবতার। 

ধার্মিক এবং পুণ্যবান ব্যক্তিকে সকলেই শ্রদ্ধা করে। তাঁহারা সৎ কর্মের জন্য সর্বত্র প্রশংসা পাইয়া থাকেন। ইহা স্বাভাবিক। ইহাতে প্রশংসাকারী ব্যক্তির মহত্ত্ব প্রকাশিত হয় না। অপরপক্ষে যে পাপ কর্ম করিয়া পাপী বলিয়া পরিচিত হয় সকলের ঘৃণা, বিদ্বেষ যেন তাহার উপর আছড়াইয়া পড়ে। সমাজের নিকট সে অবহেলিত। ইহা মানুষের স্বাভাবিক ধর্ম। 

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মানুষের মহত্ত্ব, তথা শ্রেষ্ঠত্ব বিচার করিবার জন্য প্রয়োজন তার দৃষ্টিভঙ্গীর। পাপকর্ম অবশ্যই গর্হিত। কিন্তু পাপী কখনই নিন্দিত হইতে পারে না। কারণ তাঁহার পাপকর্মের অন্তরালে হয়তো বহু কারণ থাকিতে পারে। প্রকৃত মহৎ ব্যক্তি সমস্ত কিছু বিবেচনা করিয়া তাহাকে পাপ কর্ম হইতে নিবৃত্ত করিবার জন্য সচেষ্ট হয়। বাইবেলে উল্লেখ আছে, “পাপকে ঘৃণা করিও, পাপীকে নয়”। শ্রী চৈতন্যদেব জগাই-মাধাইয়ের পাপকর্ম সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অবগত ছিলেন। তথাপি তিনি তাহাদের ঘৃণা করিয়া দূরে ঠেলিয়া না দিয়া তাহাদের প্রতি প্রেমের হস্ত প্রসারিত করিয়াছিলেন। ফলে তাহারা শ্রীচৈতন্যের প্রেম ও ভক্তি সাগরে অবগাহন করিয়া নিজেদের অন্তরের মলিনতা হইতে মুক্ত হইতে পারিয়াছিলেন। প্রকৃতপক্ষে মহৎ ব্যক্তির মহত্ত্ব এইরূপে প্রকাশ পায়। 

Chapter
NO.
Contents
সাগর সঙ্গমে নবকুমার
বাংলার নবযুগ
বলাই
অরুণিমা সিন্হা : আত্মবিশ্বাস
ও সাহসের অন্য এক নাম
তোতা কাহিনী
কম্পিউটার কথা, ইন্টারনেট কথকতা
আদরিণী
প্রার্থনা
প্রতিনিধি
১০গ্রাম্যছবি
১১ বিজয়া দশমী
১২ আবার আসিব ফিরে
১৩দ্রুতপঠন : বৈচিত্র্যপূর্ণ অসম
তিওয়া
দেউরী জনগোষ্ঠী
অসমের নেপালী গোর্খা জনগোষ্ঠী
বড়ো জনগোষ্ঠী
মটক জনগোষ্ঠী
মরাণ জনগোষ্ঠী
মিচিং জনগোষ্ঠী
অসমের মণিপুরী জনগোষ্ঠী
রাভাসকল
সোনোয়াল কছারিসকল
হাজংসকল
অসমের নাথযোগীগণ
আদিবাসীসকল
১৪পিতা ও পুত্র
১৫অরণ্য প্রেমিক : লবটুলিয়ার কাহিনী
১৬ জীবন-সংগীত
১৭কাণ্ডারী হুশিয়ার

ভাবসম্প্রসারণ

রচনা

রচনা (Part-2)

২০। বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে। 

প্রত্যেকেরই নিজস্ব এক একটি পরিবেশ আছে। সেই পরিবেশেই তাহার সৌন্দর্য প্রকাশিত হয়। দেবতার স্থান যেরূপ মন্দিরে, মাছ যেরূপ জলে, পুষ্প যেরূপ উদ্যানের শোভা বর্ধন করে সেইরূপ বন্যপ্রাণীকে বনে এবং শিশুকে মাতৃক্রোড়ে অধিকতর সুন্দর দেখায়। উন্মুক্ত গগনে আপন খুশীতে গান গাহিয়া যে পাখী ঘুরিয়া বেড়ায় তাহাকে খাঁচায় আবদ্ধ করিয়া রাখিলে তাহার সেই সৌন্দর্য ম্লান হইয়া যায়। অরণ্য মধ্যে বসবাসকারী মানুষকে যদি সত্য জগতের সংস্পর্শে আনা যায় তাহা হইলে সে অত্যন্ত বেমানান হইবে সেই পরিবেশ। এবং তাহাকে কুৎসিৎ বলিয়া বোধ হইবে। অথচ বনের পরিবেশে যেন তাহাকে আকর্ষণীয় বলিয়া মনে হয়। মাতৃক্রোড়ই শিশুর সৌন্দর্য প্রকাশের প্রকৃত স্থান। শিশু যত কালো বনের হউক না কেন। দেখিতে কুৎসিৎ হউক না কেন তাহাকে যখন মাতৃক্রোড়ে দেখা যায় তখন তাহার মুখে যেন এক স্বর্গীয় অনুপম সৌন্দর্য বিরাজ করে। ইহা সত্য যে স্বস্থানে প্রত্যেকের মহিমা ফুটিয়া উঠে। স্বস্থান ত্যাগ করিলে মহিমার হানি ঘটে।

২১। সময় চলিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায়

যে জন জানেনা তারে ধিক্ শত ধিক্। 

চলমানতার জন্য সময় মানুষের নিকট এক অমূল্য সম্পদ। নদীর স্রোতের মত সময়। ও দ্রুত বহমান। “Time and Tide wait for none.” সময় কাহারও প্রতীক্ষা করে না। মানুষের জীবন ও সময়ের চলার ছন্দে সুর মিলাইয়া চলিয়াছে জন্ম হইতে মৃত্যুর অভিমুখে কবি সুইনবার্ণ বলিয়াছেন, “His life is a vision or a watch between a sleep and a sleep.” দুই প্রান্তেই ঘুম, ঘুমের মত অন্ধকার। মধ্যখানের নামই জীবন। 

জীবনের এই সংক্ষিপ্ত সীমার উপযুক্ত ব্যবহারের মাধ্যমে জীবন হয় সার্থক, হয় সুন্দর। যদি কেহ এই দুর্লভ সময় আলস্যভরে বৃথা অপচয় করে তবে তাহার সমস্ত জীবনই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। তখন বুকফাটা আর্তনাদ এবং অনুতাপের অন্তর্দাহে পরবর্তী জীবন দগ্ধ হয়। সময়ের যথার্থ মূল্যবোধই জীবনে সাফল্য অর্জনের প্রথম সোপান। সীমিত জীবনে আমাদের সময় খুবই কম। সুতরাং সময় বোধ সম্বন্ধে প্রথম হইতেই সচেতন হওয়া উচিত। ভবিষ্যৎ জীবনকে সুন্দর, সার্থক ও সমৃদ্ধ করিতে হইলে সময়ের মূল্য দিতে হইবে। সময় রূপ অমূল্য রতনই সাফল্যের চাবিকাঠি। তাহাকে অবহেলা না করিয়া উপযুক্ত ব্যবহারের মাধ্যমেই রহিয়াছে মানব-জীবনের চরম সার্থকতা। 

২২। অদৃষ্টেরে শুধালেম, “চিরদিন পিছে

অমোঘ নিষ্ঠুর বলে কে মোরে ঠেলিছে?”

সে কহিল, “ফিরে দেখো।” দেখিলাম থামি–

সম্মুখে ঠেলিছে মোরে পশ্চাতের আমি। 

অহং বোধ মানুষের অবনতির কারণ। প্রগতির অন্তরায়। সমস্ত দুঃখ, সমস্ত পাপের মূল এই অহমিকায়। অহংকে যে মানুষ পরম এবং চরম সত্য বলিয়া জ্ঞান করে তাহার জীবন বিড়ম্বনাময় হয়। বিদ্রূপ বাক্যবানে তাহাকে জর্জরিত হইতে হয়। সমাজে অপাত্তের হইয়া থাকিতে হয় অবশেষে সে বিনাশ প্রাপ্ত হয়। 

অহমিকার তাড়নায় সে সকলকে হীন, তুচ্ছ জ্ঞান করে। নিজস্ব ভাবধারায় চালিত হইয়া অপরের ধ্যান-ধারণাকে নস্যাৎ করিতে দ্বিধা বোধ করে না। তখন বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়- পরিজন তাহার সহিত দূরত্ব বজায় রাখিয়া চলে। এইভাবে নিঃসঙ্গ জীবনে চলিতে চলিতে যখন তাহার হুঁশ হয় তখন নিজেকে আবিষ্কার অন্য গ্রহের মানুষ বলিয়া। অদৃষ্টের নিকট কৈফিয়ৎ দাবী করে এইরূপ হীন অবস্থার কারণ আত্মবিশ্লেষণের মাধ্যমে তখন তাহার মোহভঙ্গ সম্বন্ধে হয়। চোখের সম্মুখে ফুটিয়ে ওঠে ‘আমিত্ব’, অহং বোধ। অহমিকা যখন মানুষের চেতনাকে আচ্ছন্ন করিয়া রাখে তখন সে আর সম্মুখ পথে চলিতে পারে না। চলার পথে পিছাইয়া পড়ে।

২৩। সুসময়ে অনেকেই বন্ধু বটে হয়,

অসময়ে হায় হায় কেহ কারো নয়। 

মানব জীবন সুখ দুঃখ এই দুইয়ের সমন্বয়েই গঠিত। শুধুমাত্র সুখ বা শুধুমাত্র সুখে কোন জীবনেই আসে না। তাই সুখ দুঃখকে মানিয়া লইয়া সময়ে অসময়ে যে বন্ধু পাশাপাশি থাকিয়া সুখ দুঃখকে ভাগ করিয়া লইতে পারে, সেই প্রকৃত বন্ধুর দাবী করিতে পারে। এই পৃথিবীতে প্রকৃত বন্ধু বিরল। সকলেই বসন্তের কোকিল, বর্ষার কেহ নয়। 

বন্ধুত্ব করা সহজ কিন্তু বন্ধুত্ব রক্ষা করা কঠিন। আজকাল একসাথে দুই পা চলিলেই বন্ধুত্ব হইয়া যায় কিন্তু সেই বন্ধুত্ব ক্ষণস্থায়ী। কারণ সাধারণতঃ দেখা যায় মানুষ স্বার্থের বশবর্তী হইয়া বন্ধুত্ব করিতে আসে, আর যখন স্বার্থ ধরা পড়িয়া যায়, তখন আর বন্ধুর নাগাল পাওয়া যায় না, প্রকৃত্ব বন্ধুত্ব স্বার্থগন্ধহীন হইয়া থাকে। বন্ধুত্ব হইল এক স্বর্গীয় বন্ধন, ইহা অনাবিল, নিষ্পাপ ও নিঃস্বার্থপর হয়। 

মানুষের সুখের দিনে অনেকেই বন্ধুত্ব করিতে আসে। কিন্তু সুসময় যখন চলিয়া যায়। তখন তাহারা বসন্তের কোকিলের মত সরিয়া পড়ে, যে বন্ধু সুখে দুঃখে, আনন্দে নিরানন্দে, দুর্ভিক্ষে, রাষ্ট্র বিপর্যয়ে, এমনকি শ্মশানেও পাশে পাশে থাকে সেই তো প্রকৃত বন্ধু। প্রকৃত বন্ধুর পরিচয় অসময়ে বা দুঃখের দিনেই পাওয়া যায়। 

২৪। কাঁটাহেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে

দুঃখ বিনা সুখলাভ হয়। কী মহীতে।

এই পৃথিবী কর্মবহুল। কর্মই ধর্ম। কর্মোদ্দীপনা হারাই মানুষ জীবন সংগ্রামে জয়ী হইতে পারে। 

মানব জীবনে প্রতিকূলতার অভাব নাই। জীবনের প্রতিপদেই আস নানা বাধা ও বিপত্তি। এই বাধাবিপত্তিকে উপেক্ষা করিয়াই মানুষকে তাহার জীবনের ধ্রুব ও লক্ষ্যপথে অগ্রসর হইতে হয়। জীবনের উন্নতির ও অগ্রগতির জন্য চাই প্রতিকূলতা ও বাধার সহিত মোকাবিলা করিবার মানসিকতা। 

সরোবরে কমল তুলিতে গিয়া তাহার কাঁটা দেখিয়া ভগ্নমনোরথ হইয়া ফিরিয়া আসিলে চলিবে না। কাঁটার জ্বালা সহ্য করিতে না পারিলে কমলের সৌন্দর্য উপভোগ করা সম্ভব নহে। বাঞ্ছিত ফল পাইতে হইলে সকল প্রকার ভীতিকে জয় করিতে হইবে। সকল প্রকার বাধা বিঘ্ন প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করিয়া দৃঢ় পদক্ষেপে চলিতে পারিলেই প্রকৃত লক্ষ্যে পৌঁছাইতে পারা যায়। 

এই পৃথিবী দুঃখবহুল। দুঃখকে সহ্য করিবার ক্ষমতা না থাকিলে, সুখের সন্ধান পাওয়া অসম্ভব। কারণ দুঃখ ছাড়া এই পৃথিবীতে সুখ পাওয়ার আশা নাই। 

২৫। যারে তুমি নীচে ফেল, সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে

পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে।

সমাজের সর্বস্তরের মানুষের যখন উন্নতি ঘটে তখনই দেশ তথা জাতির সমৃদ্ধি ঘটে। সমাজের অধিকাংশ মানুষ দারিদ্র, অশিক্ষা ও কুসংস্কারের তিমিরে রহিয়াছে। কেবলমাত্র একটি অংশের উন্নতিতে কখনই সামগ্রিক কল্যাণ সম্পূর্ণতা প্রাপ্ত হয় না। এই অশিক্ষিত কুসংস্কারাচ্ছন্ন জনসমাজ সামাজিক প্রগতির অন্তরায়। ইহাদিগের অন্তরে শিক্ষার আলোক জ্বালাইতে হইবে, চেতনাকে জাগ্রত করিতে হইবে। তাহা না হইলে মুষ্টিমেয়ের দ্বারা সামগ্রিক বিকাশ কখনই পরিপূর্ণতা প্রাপ্ত হইবে না। উপরন্তু তাহারাই একদিন সমাজের প্রগতির চাকাকে পরাগতির পথে টানিয়া আনিবে। ব্যক্তিবিশেষের উন্নতি নয় সমাজের তৃণমূল স্তরের সর্বাঙ্গীন বিকাশ আমাদের ব্রতী হওয়া প্রয়োজন। কারণ ইহাতেই সার্বিক বিকাশ নিহিত। 

২৬। কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক

কে বলে তাহা বহুদূর ?

মানুষেরই মাঝে স্বর্গ নরক-

মানুষেতেই সুরাসুর। 

অনাদিকাল হইতে মানুষ ধারণা করিয়া আসিতেছে যে স্বর্গ সুখ-শান্তির স্থান এবং নরক দুঃখকষ্টের স্থান। মাটির পৃথিবী হইতে ইহারা বহুদূরে অবস্থিত। প্রকৃতপক্ষে স্বর্গ ও নরক মানুষের অলীক কল্পনা। ইহাদের অস্তিত্ব কোন সুদুরলোকে নাই। মানুষের হৃদয়েই স্বর্গ ও নরকের অবস্থান। যখন মানুষের হৃদয় হইতে মানবীয় কোমল বোধগুলি যথা স্নেহ, প্রেম, দয়া, ভক্তি ইত্যাদি শুভবোধগুলি লুপ্ত হইয়া যায়, তখন কাম, ক্রোধ, হিংসা, দ্বেষ ইত্যাদি অশুভ বোধগুলির আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তখনই তাহা হইয়া উঠে নরক। চতুর্দিকে বীভৎস, কুৎসিতের আত্মপ্রকাশ ঘটে। যখন মানুষের মনে এই অশুভবোধগুলি মুছিয়া গিয়া শুভবোধ জাগ্রত হয়, তখনই পৃথিবী পরিণত হয় চির-বাঞ্ছিত যথার্থ পবিত্র স্বর্গভূমিতে। সুতরাং বলা যায় যে, মাটির পৃথিবীতে, মানুষের মনোরাজ্যেই স্বর্গ ও নরক, সুর এবং অসুর বিরাজিত। 

২৭। জন্ম হউক যথা তথা কর্ম হউক ভান। 

মানুষ তাহার কর্মের মাধ্যমে বাঁচিয়া থাকেন। জন্ম লইয়া উচ্চ কুলে, কেবল কুলের গৌরবের বড়াই করিয়া যদি কেহ কোন প্রতিভার স্বাক্ষর রাখিতে না পারে, তাহা হইলে সে হাসির পাত্র হইয়া উঠে সকলের সম্মুখে। অপরপক্ষে অতি নিম্নকুলে জন্মগ্রহণ করিয়াও যদি কেহ অসাধারণ প্রতিভার অবদান রাখিতে পারেন তখন কেহ তাহার জন্মকুল লইয়া আলোচনা করিবে না। তাহার কীর্তি, তাহার প্রতিভা তাহাকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করিবে। তাহার কর্মের দ্বারাই তিনি মৃত্যুর পরও মানুষের অন্তরে অমর হইয়া রহিবেন। এই নশ্বর পৃথিবীতে সকল কিছুই একদিন বিলুপ্ত হইবে। কেবল মানুষের কীর্তি, মানুষের কর্ম চিরকাল অমর হইয়া থাকিবে। যেরূপ জগতের বিভিন্ন বরেণ্য ব্যক্তিগণ আজিও আমাদের অন্তরে শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত হইয়া আছেন। সুতরাং বলা যায় যে মানুষ মৃত্যুর পরও সকলের অন্তরে বাঁচিয়া থাকে কেবল তাহার কর্মরাজির মাধ্যমে।

২৮। অন্ন চাই, প্রাণ চাই, আলো চাই, চাই মুক্ত বায়ু

চাই বল, চাই স্বাস্থ্য, আনন্দ-উজ্জ্বল পরমায়ু

সাহসবিস্তৃত বক্ষপট। 

এই জগতে সমস্ত সম্পদের ওপরে সবারই সমান অধিকার আছে। কিন্তু মানুষের স্বার্থপরতা, লোভ, হিংসা প্রভৃতি মানুষের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণীর সৃষ্টি করিয়াছে। সমাজে অতি অল্প সংখ্যক মানুষ সমস্ত ক্ষমতা ও সম্পদ কুক্ষিগত করিয়া রাখিয়াছে। কৃষক, শ্রমিক প্রভৃতি সাধারণ মানুষ তাহাদের কঠোর পরিশ্রমে সমাজকে, দেশকে সমৃদ্ধ করিয়াছে। অথচ তারা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা সবকিছু থেকে বঞ্চিত। তাহারা অসহায়, দুর্বল— সবরকম প্রতিবাদের ভাষা হারাইয়াছে। কিন্তু এইভাবে দীর্ঘকাল চলিতে পারে না। তাদেরও মানুষের মর্যাদা নিয়ে বাঁচিয়া থাকার অধিকার ফিরিয়ে দিতে হইবে। তাহারা যাতে সুস্থ, সবলভাবে এবং দীর্ঘ পরমায়ু নিয়ে বাঁচিতে পারে সেইদিকে নজর দিতে হইবে। তাহাদের বুকে সাহস, মনে বল ফিরিয়ে দিতে হইবে।

২৯। শুধু হাত দিয়ে সেবা নয়, নাহি সেবে যদি প্রাণ।’ 

সেবা ধর্ম এক মহৎ কর্ম। সেবা ব্রতে আন্তরিকতার যথেষ্ট প্রয়োজন। সেবাব্রতের প্রধান ভিত্তি আন্তরিক মমতা ও প্রাণের স্পর্শ। কেবল মাত্র কর্তব্যের খাতিরে যাহারা সেবা কর্মে আত্মনিয়োগ করেন তাহারা কখনই পীড়িতের যন্ত্রণার লাঘব করিতে পারেন না। তাহা নিছক লোক দেখানো ব্যাপার বলিয়া পরিগণিত হয়। তাহারা সেবা কর্মের অযোগ্য বলিয়া বিবেচিত হয়। আর্দ্র, অসহায় ব্যক্তির পাশে থাকিয়া ব্যাধিগ্রস্তের যন্ত্রণাকে স্নেহ, মায়া, মমতার স্পর্শে যে প্রলেপ লাগাইয়া হাসি ফুটাইয়া তুলিতে পারেন তিনি অবশ্যই সকলের শ্রদ্ধাভাজন। সেবাব্রতীর আন্তরিকতা, প্রাণের উত্তপ্ত স্পর্শে পীড়িতের যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখে যে হাসি ফুটিয়া উঠে তাহা সত্যই অতুলনীয়। এখানেই সেবাব্রতীর কর্মের সার্থকতা। 

৩০। যার ভয়ে তুমি ভীত সে অন্যায় ভীরু তোমা চেয়ে, যখনি জাগিবে তুমি তখনি সে পলাইবে ধেয়ে; 

দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার সর্বযুগের। নিপীড়িতের হাহাকার ধ্বনি আজিও বাতাসে বহিয়া যায়। সহায় সম্বলহীন মানুষ বলবানের সদস্ত হুঙ্কারে ভীত, সন্ত্রস্ত। প্রাণধারণের মানি লইয়া শক্তিধরের পদপ্রান্তে তাহারা নতজানু। তাহারা দুর্বল। কিন্তু সমাজে সংখ্যাগরিষ্ঠ তাহারাই। তাহারা সংঘবদ্ধ হইয়া অত্যাচারীর বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়াইলে বলনপীর বল কর্পূরের মত উড়িয়া যাইবে। অত্যাচারী মাত্রই ভীরু, কাপুরুষ। যুগ যুগ ধরিয়া শোষণ, বন্ধনা, অবিচার এবং উৎপীড়নের প্রায়শ্চিত্ত করিতে হইবে তাহাদের। ইহাই কালের বিধান।

Leave a Reply