SEBA Class-9 Bangla Rasana | রচনা

SEBA Class-9 Bangla Rasana | রচনা প্রতিটি অধ্যায়ের উত্তর তালিকায় প্রদান করা হয়েছে যাতে আপনি সহজেই বিভিন্ন অধ্যায় জুড়ে ব্রাউজ করতে পারেন এবং আপনার প্রয়োজন SEBA Class-9 Bangla Rasana | রচনা এমন একটি নির্বাচন করতে পারেন।

SEBA CLASS 9 QUESTION ANSWER (Ass. MEDIUM)

SUBJECTSLink
EnglishClick Here
অসমীয়াClick Here
বাংলাClick Here
বিজ্ঞানClick Here
সমাজ বিজ্ঞানClick Here
हिंदी ( Elective )Click Here
ভূগোল (Elective)Click Here
বুৰঞ্জী (Elective)Click Here

SEBA Class-9 Bangla Rasana | রচনা

Also, you can read the SCERT book online in these sections Solutions by Expert Teachers as per SCERT (CBSE) Book guidelines. These solutions are part of SCERT All Subject Solutions From above Links . Here we have given SEBA Class-9 Bangla Rasana | রচনা Solutions for All Subjects, You can practice these here.

১। নিয়মানুবর্তিতা

যখন যে কাজ করার উপযুক্ত সময় অর্থাৎ যথাসময়ে কার্য সম্পাদন করার নামই হইল নিয়মানুবর্তিতা। সুষ্ঠভাবে মানুষের জীবনের প্রতিটি কর্তব্য করিতে হইলে সময়ের সচেতন ব্যবহার করিতে হইবে। জীবনকালের মূল্যবান সময়কে সচেতনভাবে ভাগ করিয়া লইতে হইবে। প্রকৃতপক্ষে মানুষের জীবন তো কয়েকটি দিনের সমষ্টি ছাড়া আর কিছুই নহে। মানুষের জীবনে সময়ের যথাযথ ব্যবহারের চেতনাই মানুষকে কর্মশীল করিয়া রাখিয়াছে। সচেতন কর্মী মানুষই জীবনের মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ হইতে পারে এবং জীবনকে প্রতিষ্ঠা করিতে পারে।

সময়ের সু-সামঞ্জস্য সমবায়ে মানব জীবনের এবং একটি অধ্যায় এক একটি কর্মের জন্য নির্দিষ্ট হইয়া আছে। বাল্য, শৈশব ও কৈশোরে বিদ্যাশিক্ষা, নীতিশিক্ষা, যৌবনে কর্মজীবন ও গার্হস্থ্য জীবনের কর্তব্যে মনোনিবেশ, আর বৃদ্ধ বয়সে কর্মহীন বিশ্রাম গ্রহণ ও অধ্যাত্মচিন্তা। ইহাই তো প্রকৃত মানব জীবনের সার কথা।

এই বিশ্বপ্রকৃতি এক আশ্চর্য নিয়মের অনুশাসনে বাঁধা পরিয়া আছে। একটু ব্যতিক্রম হইলেই মহা অঘটন ঘটিয়া যাইবার সম্ভাবনা আছে। তাই মানুষের জীবনেই ঐ একটিই নিয়ম প্রযোজ্য নিয়মানুবর্তিতা। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে কাজ করার উদাহরণ খুব কমই পাওয়া যায়। যথাসময়ে কাজ করিবার অর্থই হইল সময়ের সদ্ব্যবহার। বাস্তব জীবনে আমরা দেখিতে পাই যাহারা প্রতিটি কাজে আলস্য ও বিলম্ব করে তাহারা ঠিক সময়ে গাড়ী ধরিতে পারে না, সভাসমিতিতে বিলম্বে পৌঁছে। যথাসময়ে গন্তব্যস্থানে পৌঁছিতে না পারিয়া অন্যের বিরক্তি ভাজন হইয়া থাকে। পরীক্ষার হলে দশ মিনিট দেরিতে গেলে সেই দিনের পরীক্ষার সকল প্রশ্নপত্রের উত্তর দেওয়া সম্ভব হয় না। মোট কথা সময় জ্ঞানের অভাবে জীবনে অনেক সময় অনেক ক্ষেত্রেই অকল্যাণকর দুঃখময় পরিস্থিতির মোকাবিলা করিতে বাধ্য হইতে হয়।

সময় বহমান নদীর স্রোতের মতই কেবল নিয়ম মতো অগ্রসর হইয়া চলিয়াছে। সময়ের সঙ্গে তাল রাখিয়া কর্তব্যকর্ম সম্পাদন করিতে না পারিলে পিছাইয়া পড়িতে হয়। কর্মচঞ্চলতা, জীবনের নিয়মানুসারী অভ্যাস জীবনকে সমৃদ্ধতর করে। পাশ্চাত্য জাতিগুলির উন্নতির মূল কারণ-ই হইল তাহাদের সময়ানুবর্তিতা ও নিয়মানুবর্তিতা। অবশ্য সাম্প্রতিককালের কর্মব্যস্ততা ভারতীয়দের কিছুটা নিয়মানুবর্তিতা করিয়া তুলিতে সক্ষম হইয়াছে। দেশের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা নিয়মের তাগিদেই সকলেই ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে জীবনের গতিকে নিয়ন্ত্রণ করিতেছে। বৃহত্তর সমাজ জীবনের কল্যাণ সাধনে দেশের সাধারণ মানুষকেই সব্যগ্রাসী আলসাকে ত্যাগ করিয়া সময়ানুবর্তী ও নিয়মানুবর্তী হওয়ার অভ্যাস গড়িয়া তোলা প্রয়োজন। জীবনের প্রথম সোপান হইতেই নিয়মানুবর্তিতাকে

অধিগত করিতে হইবে। অভিভাবকগণ চেষ্টা করিলেই শিশুদের যথা ন যথাসময়ে কর্তব্য সম্পাদনের শিক্ষা দিতে পারিবেন। স্কুল-কলেজের বিধিবদ্ধ জীবন যদি বাড়িতেই বাধ্যবন্ধনহারা স্বাধীনতা লাভ করে, তবে নিয়মানুবর্তী বা সময়ানুবর্তী হইবার কোন আশাই নাই।

সময় চলিয়া যায়, নদীর স্রোতের প্রায়”। “Time and tide, wait for none’ ইত্যাদি প্রবচন বাক্যের তাৎপর্য, কিশোর সুকোমল চিত্তভূমিতে মুদ্রিত করিয়া নিবার দায়িত্ব গুরুজন বয়স্কদের উপর রহিয়াছে। দীর্ঘসূত্রতা এবং অবহেলায় কালহরণ করার ক্ষতিকারক অশুভ ফল সমাজের প্রতিটি ব্যক্তি ও সমাজকে ক্রমান্বয়ে অধঃপতনের দিকে লইয়া যায়। তাই পুঁথিগত বিদ্যা-শিক্ষার সাথে সাথে নিয়ম মাফিক সময়ের সদ্ব্যবহার করার অভ্যাস করিতে হইবে। অন্যথায় জীবনে পরাজয়ের গ্লানি বহন করা ছাড়া আর কিছুই উপায় থাকিবে না।

২। ছাত্রসমাজ ও রাজনীতি

সূচনা : ছাত্রজীবন হইতেই পূর্ণাঙ্গ সামাজিক মানুষ হিসাবে গড়িয়া উঠিবার সাধনা করিতে হয়। অধ্যয়ন ছাত্রদের তপস্যা বটে, কিন্তু একমাত্র কর্তব্য নহে। কালের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আজিকার ছাত্রজীবনের আদর্শও পরিবর্তিত হইয়াছে। আজ ছাত্র সমাজের সম্মুখে আসিয়াছে এক নতুন যুগ, আসিয়াছে নতুন জিজ্ঞাসা, তাহারা রাজনীতির ডাকে সাড়া দিবে কিনা? স্বভাবতঃই এই প্রশ্নে ছাত্র-সমাজ সংশয়-বিমূঢ়, অভিভাবকগণ চিন্তাকুল, দেশনেতারা সন্ত্রস্ত এবং শিক্ষক-অধ্যাপকগণ বিরক্ত। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সমাজ-বিন্যাস ভিন্ন; জীবনাদর্শ ভিন্ন। কিন্তু ভারতের মতো দেশে যেখানে ছাত্রগণ গৃহে কৃপার পাত্র, সমাজে উপহাসের পাত্র ও বিদ্যালয়ে শাসনের পাত্র সেইখানে রাজনীতিতে ছাত্রদের যোগদানের প্রশ্নে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। এই যুগে একজন গ্রন্থনিবিষ্ট শিক্ষার্থী হইতে সর্ববিষয়ে উৎসাহী ও সক্রিয় ছাত্র অনেক বেশি প্রশংসাভাজন।

প্রাচীন ভারতের ছাত্রসমাজ : প্রাচীন ভারতের আদর্শ ছিল ‘ছাত্রানাং অধ্যয়নং তপঃ।’ সেই সময় অধ্যয়নই ছিল ছাত্রজীবনের তপস্যা। সেইদিন সামাজিক সমস্যা এত তীব্র আকারের ছিল। না। জীবন-যন্ত্রণা বা জীবন সংকট তখন ছিল অনুপস্থিত। সমাজের জীবন দর্শনই ছিল ‘পরমার্থ’। দুঃখ-দারিদ্র ছাত্রদের বিচলিত করিতে পারিত না। তখন কোন সামাজিক আন্দোলন বা রাজনৈতিক বিপ্লব ঘটে নাই। তখন সমাজের অনুকূল পরিবেশে ছাত্রদের বিদ্যাচর্চার ক্ষেত্র গড়িয়া উঠিয়াছিল।

বিংশ শতাব্দীর ছাত্রসমাজ : ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর পাশ্চাত্য জীবন তরঙ্গ যুগান্তরের ছাত্র সমাজকে নাড়া দিয়াছে। পাশ্চাত্য জীবনাদর্শ ক্রমে সঞ্চারিত হইল ছাত্র সমাজের জীবনে। আসিল সামাজিক উত্থান-পতন, আসিল জীবন-যন্ত্রণা বা জীবন-সংকট। তাহার সঙ্গে ছাত্র উচ্ছৃঙ্খলতা আর সেই দিন হইতে ছাত্রগণ রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজনীতি সকল ক্ষেত্রেই জড়াইয়া পড়িল সত্যানুসন্ধানের দুশ্চর তপস্যায়।

 বিংশ শতাব্দীতে ভারতবর্ষে স্বাধীনতার জন্য বহু আন্দোলন সংঘটিত হইয়াছে। প্রতিটি আন্দোলনেই ছাত্র সমাজের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। পৃথিবীর অন্যান্য স্বাধীন ও স্বাধীনতাকামী দেশগুলির দিকে তাকালেই দেখা যায় যে স্বাধীনতার যুদ্ধে ছাত্র ও যুবশক্তিই হইয়াছে আন্দোলনের প্রধান শক্তি। তাই স্বদেশের ও বিদেশের ইতিহাস দেখিলে ছাত্র ও রাজনীতির

সম্পর্কটি বেশ পরিষ্কার হইয়া উঠে। বর্তমান সামাজিক সংকটে ছাত্রগণ যদি বিচলিত হয়, তবে আশ্চর্য হইবার কোন কারণ নাই। আজকাল ছাত্রদের রাজনীতি হইতে সরিয়া দাঁড়াইতে বলিয়া পুঁথিতে ফিরিয়া যাইতে নির্দেশ দিলেও তাহা তাহাদের পক্ষে কতটুকু যুক্তিসঙ্গত হইবে তাহা ভাবিবার বিষয়।

ছাত্রসমাজ ও রাজনীতিঃ আজকাল আমাদের জীবনে রাজনীতির সার্বিক প্রাধান্য অনস্বীকার্য। আজকাল শিল্পে, সাহিত্যে, শিক্ষায় রাজনীতিবিদদের মতামত যতখানি গুরুত্ব দেওয়া হয়, কোন প্রকৃত সমালোচকের মতামতকে ততখানি গুরুত্ব দেওয়া হয় না। রাজনৈতিক নেতাগণ এই যুগের সিংহাসনহীন দেবতা। রাজনৈতিক সচেতনতাই গণতন্ত্রের সাফল্য। তাই ছাত্রগণ রাজনৈতিক সচেতন হইয়া উঠিবেই। ছাত্র জীবনের উত্তর পর্বে ছাত্রদের কোন স্থির লক্ষ্য না থাকায়, কর্ম সংস্থান ও জীবিকা নির্বাহের কোন নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি নাই। তাই ছাত্রদের রাজনীতিতে ঝাঁপাইয়া পড়াটা নিতান্তই স্বাভাবিক।

শুধুমাত্র ভারতেই নহে সমগ্র পৃথিবীতে আজ ছাত্রগণ রাজনীতি-সচেতন হইয়া উঠিতেছে। পৃথিবীতে ছাত্রদের কাছে দেখা দিয়াছে এক বিশাল নৈরাশ্যের অন্ধকার। তাহাদের নিকট এই অন্ধকারে, রাজনীতিই কেবল মাত্র আলোর শিখা।

উপসংহার : তবু মনে রাখা উচিত, ছাত্রগণ স্বভাবতঃই অপরিণত-বুদ্ধি সম্পন্ন। রাজনীতি-

ধুরন্ধরগণ ছাত্রদেরকে তাহাদের রাজনৈতিক অভীষ্ট সিদ্ধির উদ্দেশ্যে নানা কাজে নিয়োগ করেন।ইহাতে ছাত্রগণই রাজনৈতিক শাহিন হয়। ইহা বন্ধ হওয়া উচিত।

৩। আসামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য

আসাম প্রকৃতির লীলাভূমি। বিধাতা যেন সমস্ত সৌন্দর্য অকৃপণ হস্তে এখানে ঢালিয়া দিয়াছেন। আসাম অসামান্যা হইয়া উঠিয়াছে।

ভারতের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত আসাম। চারিদিকে শ্যামল সবুজের সমারোহ। পাহাড়, নদী, ঝর্ণায় আবৃত আসাম, যেন প্রকৃতির নন্দন কানন। বিভিন্ন ঋতুর আগমনে আসাম লাস্যময়ী হইয়া উঠে। মাঠে-ঘাটে, পাহাড়ে পর্বতে, বনানীতে সর্বত্রই যৌবনের পূর্ণ প্রকাশ। পাহাড়ী অঞ্চলে রৌদ্রের লুকোচুরি খেলা, রঙ্গ-বেরঙ্গের ফুলের মেলা, জানা-অজানা পাখীর কল-কাকলী মানুষের মনে আনন্দের উচ্ছলতা আনে। সোনালী ধানের প্রান্তরে সোনালী রৌদ্রের উজ্জ্বলতা আকর্ষণীয় করিয়া তোলে তাহার রূপকে। এক অপূর্ব দৃশ্য। বিস্তীর্ণ প্রান্তর জুড়িয়া চা-বাগানের চায়ের গাছগুলির মাঝে মাঝে আমলকী গাছের সারি দেখিয়া মনে হয় যেন তাহারা পাহারাদারের কর্তব্যে নিযুক্ত। আসামের মধ্য দিয়া প্রবাহিত দীর্ঘতম নদ ব্রহ্মপুত্র। আসামের প্রাণ, আসামের ভরসা, কখনও সে শাস্ত কখনও সে অশান্ত, কখনও তাহার সৌন্দর্য উদ্ভিন্ন যৌবনার মত আবার কখনও হিংস নাগিনী। ভীষণ তাণ্ডবে দুই কূল প্লাবিত করিয়া সগৌরবে আপন অস্তিত্বের ঘোষণা করিয়া প্রবাহিত হয়। সাত বোনের দেশ এই আসাম। বিভিন্ন জাতি-উপজাতির সংগম স্থল। বিভিন্ন সংস্কৃতির মিলন ক্ষেত্র। উৎসবের বৈচিত্র্য তাহাকে অনিন্দ্য সুন্দর করিয়া তুলিয়াছে। পাহাড়ে ঘেরা এই আসামের সূর্যোদয় এক অপূর্ব দৃশ্য। নতুন দিনের আগমন ঘোষণা করিয়া প্রভাত সূর্যের রক্তিম

আভা তুষারাবৃত পাহাড়ের চূড়াগুলিকে মোহময়ী আকর্ষণীয় করিয়া তুলে। শিলগ্নের বিডন, বিশপ জলপ্রপাত দেখিয়া মনে হয় কোন্ পাষাণ বক্ষ এত জলরাশিকে যুগ যুগান্তর ধরিয়া সঞ্চিত করিয়া রাখিয়াছে। অবিশ্রান্ত এই মনোহর জলপ্রপাত দেখিয়াই হয়তো কবি রচনা করিয়াছেন কবিতা। “ঝর্ণা, ঝর্ণা সুন্দরী ঝর্ণা/তরলিত চন্দ্রিকা চন্দন বর্ণা।” যুগে যুগে বিভিন্ন কবি। বিভিন্ন লেখক আসামের সৌন্দর্যে আকর্ষিত হইয়া সাহিত্য সম্ভারকে সমৃদ্ধ করিয়াছেন।

আসামের সৌন্দর্যের আরও একটি উপকরণ কাজিরাঙ্গা, মানসের বিস্তৃত বনাঞ্চল। হাতী, গণ্ডার প্রভৃতি বিভিন্ন বন্যপ্রাণী। পরিচিত-অপরিচিত বিভিন্ন বিহগ-বিহগীর সুমধুর কলতান বৈচিত্র্যের সৃষ্টি করিয়াচ্ছে।

আসামের বুকে জড়াইয়া রহিয়াছে বহু পৌরাণিক এবং ঐতিহাসিক কাহিনী। যেগুলির অন্বেষণে ঐতিহাসিক এবং পর্যটকেরা আকর্ষিত হন। নীলাচল পাহাড়ে দেবী কামাখ্যার মন্দির, তেজপুরে বান রাজার প্রতিষ্ঠিত “মহাভৈরব” শিবমন্দির। ঊষা এবং অনিরুদ্ধের কাহিনী বিজড়িত ‘অগ্নিগড়’, ‘দহ পৰ্বতীয়া’, ‘উমানন্দ’, ‘বশিষ্ঠাশ্রম’, ‘অশ্বক্লান্ত’ দর্শনীয় স্থান। প্রাচীন অহোম রাজাদের কীর্তি কাহিনীর প্রমাণ বহন করে জয়দৌল। জয়সাগর, রঙঘর, শ্রীমন্ত শঙ্করদেবের স্মৃতিতে নির্মিত “শঙ্করদেব কলাকেন্দ্র” মানুষকে আকর্ষণ করে। সবশেষে ইহাই বলা সংগত যে আসাম এক অতুলনীয় রাজ্য। সর্বত্রই তাহার সৌন্দর্য্য বিরাজমান।

৪। আসামের কুটীর শিল্প

প্রকৃতির স্রষ্টা অতুলনীয় সুন্দরী অসম মাতাকে সৃষ্টি-কৌশলের সকল প্রকার অকৃপণ মহিমা দ্বারা মনোহর ও মনোরম করিয়া সৃষ্টি করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই। আসাম মাতাকে প্রকৃতির বুকের সকল সম্ভারেই ঐশ্বর্যশালী করিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন। তাই রামায়ণ মহাভারতের যুগ হইতেই অসম-কামরূপ ঐশ্বর্য এবং কলা-সংস্কৃতির অক্ষয় ভাণ্ডার রূপে পরিগণিত হইয়া আসিয়াছে। শিল্পকলার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসমের খ্যাতি এক সময়ে বিশেষ সুনাম অর্জন করিয়াছিল, কিন্তু কালের অমোঘ পরিবর্তনে অসম আজ ভারতবর্ষের ভিতরে সবচেয়ে পশ্চাৎপদ রাজ্য। অতুল ঐশ্বর্য ভাণ্ডারের জন্য যেমন করিয়া অসম সোনার অসম বলিয়া খ্যাতি হইয়াছিল, সেইরূপ কূটার শিল্পের জন্যও আসামের নাম সমগ্র ভারতে ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। একদা অসম কুটীর শিল্পে শ্রেষ্ঠ আসন লাভ করিয়াছিল। অসমের এরী, মুগা, পাট, কপাহী (কার্পাস), বয়নশিল্প, কাঁসা-পিতলের নানাপ্রকার বাসন তৈরির শিল্প, কাষ্ঠ শিল্প, বাঁশ ও বেত শিল্প, মাটির বাসন তৈরির শিল্প, হাতির দাঁতের শিল্প, সোনা-রূপার শিল্প, লৌহ, স্থপতি ও ভাস্কর্য শিল্প ইত্যাদি প্রায় একশত কুটীর শিল্প আসামের বুকে দাপাইয়া চলিয়াছিল এবং অসমকে স্বাবলম্বী করিয়া তুলিতে সাহায্য করিয়াছিল। আবহমান কাল হইতেই অসম বয়ন শিল্পে ভারত বিখ্যাত ছিল। একদা আসামের পাট, মুগা ও রেশমী বস্ত্ৰ দিল্লী-আগ্রার মোগল হারেম সমূহে আলোড়নের সৃষ্টি করিয়াছিল। চিত্রলেখার অপূর্ব সাজপোশাক কুমার অনিরুদ্ধকে বিস্ময় বিমোহিত করিয়াছিল।”

কাঁসার ও পিতলের শিল্পের জন্য অসম একদা ভারত বিখ্যাত ছিল। রহার কাঁসার বাসনের খ্যাতি সমগ্র অসমবাসী জানে। হাজো, সর্থেবরী অঞ্চলের শিল্প আজও প্রাচীন ঐতিহ্য এবং

গৌরব বহন করিতেছে। বিভিন্ন ধরনের কাঁসা-পিতলের বাসন-বর্তন, বাটা, শরাই প্রভৃতি আজও সম্মানের সামগ্রী হইয়া আছে। কাঠশিল্পে আসাম অসমীয়া জাতীয় গৌরব বহন করে। অসমীয়া শিল্পীর তৈরি বেদীর সিংহাসন, বিষ্ণুমূর্তি, নানাপ্রকার মুখোস, আসবাবপত্র যথেষ্ট সমাদরের সামগ্রী। হাতীর দাঁতের শিল্প অসমীয়া শিল্পীদের এক অতি পুরানো গৌরবোজ্জ্বল শিল্প। অসমে পূর্বে প্রচুর হাতীর দাঁত পাওয়া যাইত। ইহা হইতে শিল্পীগণ নানা প্রকার কারুকার্যখচিত অলঙ্কার তৈরি ছাড়াও তাঁহারা মসৃণ পার্টী তৈরি করিত। ঐরূপ পাটী এখন আর নাই। কেবল মাত্র দুই- একটি সূত্রে ইহা দেখা যায়। আসামের সোনারীর কারুকার্য খচিত সোনার অলঙ্কার অতি আদরের দ্রব্য ছিল। লোহার তৈরি নানা প্রকার প্রয়োজনীয় সামগ্রী অসমে অতি বিখ্যাত ছিল।

অসমের পুরানো মঠ ও মন্দির, দৌল-দেবালয়গুলিতে এক ধরনের ইট ব্যবহার করা হইত। এইগুলি মাস-কলাই, বরাচাউল, বরালি মাছ-ডিম প্রভৃতি দ্রব্য মাটির সহিত মিশাইয়া তৈরি করা হইত। ইহা পাথরের মত শক্ত ছিল। জয়দৌল, শিবদৌল, রংঘর, কারেং ঘর, তলাতল ঘর এবং আসামের অন্যান্য স্থানের দেবালয়গুলিতে এই প্রকার ইট ব্যবহার করা হইয়াছিল। কিন্তু কালের পরিবর্তনে এই শিল্প এখন লুপ্ত হইয়া গিয়াছে।

অসমের বিভিন্ন পর্বতকন্দরে, গুহা-গহ্বরে অবস্থিত শিলায় খোদিত মূর্তিগুলি অসমের ভাস্কর্য শিল্পের এক চরম নিদর্শন। 

অসমে এত প্রকার কুটীর শিল্প থাকা সত্ত্বেও আজ অসম আর্থিক অনটনে জর্জরিত এবং

শিল্পের দিক দিয়া অত্যন্ত অনগ্রসর হইয়া আছে। অসমের কুটীর শিল্প আজ ধ্বংসের পথে। ইহার

কারণ স্বরূপ যন্ত্র সভ্যতার প্রসার, মানুষের নগরমুখিতা, কাঁচা সামগ্রীর অভাব, কুটীর শিল্পে

পরিশ্রম বেশি বলিয়া উপযুক্ত কারিগর ও প্রশিক্ষণের অভাব, এবং মানুষের মধ্যে চাকুরির

মনোবৃত্তি গড়িয়া উঠায় এই কুটীর শিল্প আজ লুপ্তপ্রায় হইতে চলিয়াছে।

বিজ্ঞানের যতই অগ্রগতি হউক না কেন, তথাপিও অসমীয়া জাতীর ঐতিহ্য বহনকারী কূটার শিল্পগুলিকে জীবন্ত করিয়া রাখার জন্য সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সক্রিয় ভূমিকা থাকারও চেষ্টা করা উচিত তবেই ইহার গৌরব রক্ষা পাইবে।

৫। তোমার জীবনের লক্ষ্য

সূচনা : জীবনে সাফল্য লাভের জন্য সকল মানুষেরই স্বপ্ন থাকা প্রয়োজন। কেবল স্বপ্ন থাকিলেই চলিবে না তাহার সহিত নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকা উচিত। মহাসমুদ্রের নাবিক লক্ষ্য স্থির রাখে বলিয়া অকুল সমুদ্রে ঘুরিয়া মরে না। জীবনের লক্ষ্যকে সফল করিবার পথে বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হইতে হয়। কিন্তু তাহাতে বিচলিত না হইয়া জীবন-তরীকে পৌঁছাইয়া দিতে হইবে সেই লক্ষ্যের বন্দরে।

লক্ষ্য : আমার জীবনের একটি লক্ষ্য আছে। সেই লক্ষ্য হইতেছে একজন আদর্শ শিক্ষক হিসাবে সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। আমরা এইরূপ সম্বরে সকলেই বিস্মিত। আমার বন্ধুদের মধ্যে কেহ ডাক্তার, কেহ ইঞ্জিনীয়ার, কেহ আই. এ. এস. অফিসার হইতে চায়। কারণ, বর্তমানে জীবনে স্বচ্ছল ভাবে থাকিতে হইলে এই সমস্ত বিদ্যাশিক্ষার প্রয়োজন বলিয়া তাহারা মনে করে। কিন্তু আমি বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রদর্শিত আদর্শ গ্রহণ করিতে ইচ্ছুক।

লক্ষ্যের কারণ : আমার অভিমত শিক্ষকের জীবনে আর্থিক স্বচ্ছলতা খুব বেশি না হইলেও সমাজে শিক্ষকের স্থান অনেক উর্দ্ধে। শিক্ষক, তিনি যে কোন শ্রেণীরই হন না কেন নিজ ক্ষেত্রে তিনি আপনাকে উজাড় করিয়া শিক্ষা দান করেন। তিনি একটি মহৎ দায়িত্ব পালনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। শিক্ষকদের বলা হয় জাতির মেরুদণ্ড। প্রাণে প্রাণে জ্ঞানের আলোকবর্তিকা জ্বালাইয়া তিনি সমাজের অন্ধকার দূর করেন। কোমলমতি শিশু এবং যুবক-যুবতীদের ভবিষ্যৎ জীবনে উপযুক্ত করিয়া শিক্ষা দান করেন যাহাতে তাহারা সুপ্রতিষ্ঠিত হইতে পারেন। কেবল পুঁথিগত শিক্ষাই নয় প্রকৃত মানুষ হইবার মন্ত্রে তাহাদের দীক্ষিত করিয়া সুনাগরিক করিয়া গড়িয়া তুলেন। তাহাদের এইরূপ মহৎ প্রয়াস আমার মতে অন্য যে কোন বৃত্তির তুলনায় শ্রেষ্ঠ।

সংকল্পের সাধনা : আমি সাহিত্যের ছাত্র। সাহিত্যে স্নাত্তোকত্তর ডিগ্রী অর্জন করিয়া বি.এড. সম্পূর্ণ করিয়া শিক্ষকতার বৃত্তিতে যোগদান করিব। শিক্ষকতার যোগ্যতা অর্জন সহজ সাধ্য নয়। চারিত্রিক বিশুদ্ধতা বজায় রাখিয়া জ্ঞান ভাণ্ডারের অরূপ রতনের অন্বেষণে নিজেকে নিয়োজিত করিতে সাধনা করিব। ইচ্ছাশক্তির সহিত সাধনা যুক্ত হইলে সফল হইতে পারিব বলিয়া আশা করি।

উপসংহার : একান্ত নিষ্ঠা ও চেষ্টায় সংকল্প সিদ্ধি অনিবার্য। মনেপ্রাণে ইহা বিশ্বাস করি যে সংকল্পে অবিচল থাকিলে বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে দিয়াও সুনিশ্চিতভাবে লক্ষ্যে পৌঁছিতে পারিব। আমার জীবনের লক্ষ্য কেবল জীবিকা নয়, ইহার সাথে রহিয়াছে একটি মহৎ আদর্শ । দেশের নাগরিক হিসাবে দেশের প্রতি কর্তব্য রহিয়াছে। অশিক্ষার অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকায় দারিদ্র্যা, নৈতিক অধঃপতন আমাদের জীবনে আজ অভিশাপ স্বরূপ। একটি প্রদীপের আলো হইতে যেইরূপ শত শত প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত হইয়া তিমির নাশ করে সেইরূপ কয়েকটি প্রাণে আলো জ্বালাইয়া প্রকৃত মানুষ তৈরী করিতে পারিলে আমার স্বপ্ন, আমার প্রয়াস সার্থক হইবে। সেইজন্য ছাত্রজীবনই হইবে তার প্রথম সোপান।

৬। সংবাদপত্র পাঠের প্রয়োজনীয়তা

সূচনাঃ পূর্ব দিগন্তে আলোকের বিজয় ঘোষণার পূর্বেই সমগ্র পৃথিবী আমাদের দুয়ারে আসিয়া করাঘাত করে। গৃহবদ্ধ মানুষকে বিশ্বমানবতা ও বিশ্বনাগরিকতার উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে উত্তীর্ণ করিয়া দেয়। সংবাদপত্র বর্তমান সভ্যতার অপরিহার্য অঙ্গ। সংবাদপত্র দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থার দর্পণ।

সংবাদপত্র পাঠের প্রয়োজনীয়তা : সংবাদপত্র গণতন্ত্রের সদাজাগ্রত প্রহরী। সংবাদের সূত্র ধরিয়া জনমত গঠিত হয় এবং প্রভাবিত হয় বিশ্বের দেশ তথা বিশ্বের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। সংবাদপত্রের গতি সর্বত্র। সাহিত্য, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, আমোদ-প্রমোদ সর্বত্র তাহারা অবাধ পদসঞ্চার। একনায়কতন্ত্রের ক্ষমতার অপব্যবহারে যখন “বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে” তখন সংবাদপত্র গর্জন করিয়া মানুষের বিবেক জাগ্রত করে। জনগণের প্রবল বিক্ষোভের সম্মুখে পরাজিত হয় স্বৈরতন্ত্র। জয় হয় জনমতের, জয় হয় মানবতার। –

গণচেতনার বাহক সংবাদপত্র প্রকাশের প্রথম গৌরব চীনদেশের প্রাপ্য। ঊনবিংশ শতাব্দীর

প্রারম্ভ লগ্নে বাংলা সংবাদপত্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে শ্রীরামপুর খ্রিস্টান মিশনারীদের হাতে। বর্তমান ভারতে প্রচলিত সংবাদপত্রের মোট সংখ্যা ১২, ২১৮। বাংলা ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রের সংখ্যা ৭৬০।

আধুনিক জীবনে সংবাদপত্রের গুরুত্ব অসীম। সংবাদপত্র একাধারে মানবমনকে বিশ্বমুখীন করিয়া তুলে অপরদিকে স্বদেশ এবং স্বজাতি সম্পর্কে সচেতন করিয়া রাখে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে সন্ধ্যা, বঙ্গবাসী, যুগান্তর এবং অমৃতবাজার পত্রিকা প্রভৃতি সংবাদপত্রের অবদান এই কারণেই ঐতিহাসিক স্বীকৃতি পাইয়াছে।

জনসাধারণের সহিত প্রত্যক্ষ যোগাযোগ স্থাপনের একমাত্র উপায় সংবাদপত্র। কোনও প্রস্তাবের স্বপক্ষে অথবা বিপক্ষে জনসাধারণ চিঠিপত্র অথবা জনমত কলামে নিজেদের বিবেচনা, যুক্তি উত্থাপন করিয়া প্রস্তাবটি সম্পর্কে সুচিন্তিত মতামত তুলিয়া সর্বজনগ্রাহ্য সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে পারে। সরকারের কোন পরিকল্পনায় গণস্বার্থ পদদলিত হইয়া মুষ্টিমেয়র স্বার্থ স্বীকৃত হইলে সংবাদপত্রের নির্ভীক কণ্ঠ সোচ্চার হইয়া উঠে। ইহার ফলে সরকারকে নতজানু হইয়া ক্ষমাভিক্ষা করিতে হয়। সংবাদপত্র সম্বন্ধে যে মন্তব্য রহিয়াছে “It is the People’s Parliament al- ways in session” সর্বতোভাবে সার্থক। সংবাদপত্রের গুরুত্ব এবং ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী বলিয়া সংবাদপত্র পাঠের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না।

কর্তব্য : সংবাদপত্র যেহেতু মহামানবের দরবার। গণদেবতার বিচারশালা সেইহেতু সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সংবাদদাতার যথেষ্ট কর্তব্য রহিয়াছে। সঠিক এবং নির্ভুল তথ্যের উপর ভিত্তি করিয়া সংবাদদাতাকে সংবাদ পরিবেশন করিতে হয়। নিরপেক্ষভাবে সংবাদ পরিবেশন এবং সম্পাদকীয় স্তম্ভে আলোচনা একটি সংবাদপত্রের মান উন্নত করে। শাসকগোষ্ঠীর তোষামদকারী সংবাদপত্র কখনোই সৎ, আদর্শনিষ্ঠ সংবাদপত্রের স্বীকৃতি পায় না। শাসকগোষ্ঠীর অঙ্গুলি হেলনে যে সমস্ত সংবাদপত্র পরিচালিত হয় সেইগুলি সংবাদপত্রের আদর্শ হইতে বিচ্যুত হয়। মনে রাখিতে হইবে যুক্তিনিষ্ঠ, তথ্যসমৃদ্ধ, নির্ভুল সংবাদ নিরপেক্ষভাবে পরিবেশন করাই সংবাদপত্রের প্রকৃত উদ্দেশ্য। সংবাদপত্র যতক্ষণ নির্ভীকভাবে সত্যকে অনুসরণ করে ততক্ষণ তাহা জাতীয় জীবনের পক্ষে কল্যাণকর হয়।

উপসংহারঃ আমাদের দেশের অধিকাংশ সংবাদপত্রই রাজনীতিক গোষ্ঠীভুক্ত অথবা কোন না কোন আদর্শবাদের প্রচারক। সম্পাদকীয় মন্তব্যে যে কোন সংবাদপত্র তাহাদের নিজস্ব চিন্তাধারা অনুসারে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সমালোচনা করিতে পারেন, কিন্তু সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে তাহাদের নিরপেক্ষতা অবলম্বন করা উচিত। কারণ, সংবাদপত্রে সত্য খবরই প্রকাশিত হইবে, সকলে সেইরূপ আশা পোষণ করে। বিভ্রান্তিকর, অসত্য অথবা অর্ধসত্য সংবাদ প্রকাশ দেশ তথা জাতির পক্ষে ক্ষতিকর। বাংলা “সমাচার দর্পণ” হইতে ভারতীয় সংবাদপত্রের যে যাত্রা শুরু হইয়াছে, বর্তমানে তাহার কলেবর স্ফীত হইয়া অজস্র শাখা-প্রশাখায় বিস্তৃতি লাভ করিয়াছে। ন্যায় এবং সত্যের মন্ত্রে দীক্ষিত হইয়া একদিন যে যাত্রা শুরু হইয়াছিল বর্তমানের লোভ—জটিল পৃথিবীতে বিভিন্ন কায়েমী স্বার্থের ক্রীড়নক না হইয়া আপন যাত্রাপথে সেই আদর্শ বজায় রাখিয়া চলিবে ইহাই আমাদের আন্তরিক কামনা।

৭। ছাত্রসমাজের দায়িত্ব ও কর্তব্য

বিদ্যাভ্যাস করাই ছাত্রসমাজের কর্তব্য। এই উদ্দেশ্য লইয়া মানবশিশুকে বিদ্যালয়ে পাঠানো হয়, যাহাতে সে বিদ্যাশিক্ষালাভ করিয়া মনুষ্যত্বের অধিকারী হইতে পারে। 

কিন্তু শিক্ষালাভের উদ্দেশ্য যদি মনুষ্যত্বের পূর্ণ বিকাশ বলিয়া ধরা হয় তাহা হইলে একথা স্বীকার করিতে হইবে যে, কেবলমাত্র পুঁথিগত বিদ্যা আমার করিলেই তাহা সিদ্ধ হয় না। মানবজীবনে

অসংখ্য কর্তব্য ও দায়িত্ব পালনের কথা বলা হইয়াছে। শিক্ষালাভের পাশাপাশি ঐ সমস্ত কর্তব্য ওদায়িত্বের প্রতিফলন ছাত্রসমাজের মানসিকতায় ফুটিয়া উঠিতে হইবে। 

শাস্ত্রে আছে “ছাত্রানাম্ অধ্যয়নং তপঃ”–অধ্যয়নই ছাত্রের তপস্যা। কিন্তু কেবল বিদ্যার্জনের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী জীবনের কাল কাটাইলে চলিবে না, জীবনের যাবতীয় সকল পাঠই এক সময়ে গ্রহণ করিতে হয়। তাহাতে বিশ্ব সংসার, সমাজ পরিবেশ, আপন দৈহিক স্বাস্থ্য ইত্যাদির প্রতি সজাগ থাকিতে হইবে; বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষায় এবং দুর্গত ও আর্তের সেবায় যোগ দিতে হইবে।

কোন একটি দেশের ছাত্র সমাজ উত্তরকালের রাষ্ট্রের কর্ণধার হইবে, আদর্শবান শিক্ষক হইবে, রণক্ষেত্রে সুশৃঙ্খল সৈন্য পরিচালনা করিবে, মুমূর্ষুর সুস্থতার আশ্বাস আনিবে। এই সমস্ত গুরুদায়িত্বের জন্য চাই স্বাস্থ্যোজ্জ্বল, জ্ঞানবান ও নম্র স্বভাবের একদল দেশকর্মী। আজিকার ছাত্রসমাজের মধ্যেই সুপ্ত আছে ভবিষ্যতের এইরূপ দেশকর্মী। 

ছাত্রজীবনে অর্জন করিতে হয় সততা, ন্যায়নিষ্ঠা, ক্ষমা, উদারতা প্রভৃতি চারিত্রিক গুণাবলী।

কিশোর মনে এই সমস্ত গুণাবলী একবার মুদ্রিত হইলে ইহার মাধুর্য আজীবন ব্যাপ্ত থাকে। চরিত্রহীন বিদ্যা কোন কালেই মান্য হয় না। এইজন্য বিদ্যার্থী জীবনে চরিত্রগঠন একটি প্রধান কর্ম।

কৈশোর ও যৌবনকালে চিত্তবৃত্তি স্বভাবতঃই থাকে উদার। কিন্তু এই উদারতাকে সচেতন প্রয়াসে প্রয়োগ করিতে হইবে। বালক সেবাদল, বালিকা সেবাদল এবং অন্যান্য সেবাদল গঠন করিয়া দেশ ও জাতির সেবা করা ছাত্রসমাজের মহত্তম কর্তব্য। ভাবীকালে মানব কল্যাণের বৃহত্তর প্রেরণা ছাত্রবস্থায়ই অর্জন করিতে হয়। ইহাছাড়া নিজেদের জীবনে শিক্ষার ভূমিকা উপলব্ধি করিয়া দেশের অগণিত অজ্ঞ জনগণের প্রতি শিক্ষাবিস্তারে ব্রতী হইবে। প্রয়োজনবোধে নৈশ বিদ্যালয়টি স্থাপন করিয়া বয়স্ক ও দরিদ্রদের মধ্যে শিক্ষাবিস্তারে ব্রতী হইবে।

নিয়মানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলাবোধ ছাত্রসমাজের অন্যতম অনুশীলন হওয়া উচিত। ভারতের বৈদিক সমাজ তাই ছাত্রজীবনে কঠোর ব্রহ্মচর্য পালনের নির্দেশ দিয়াছিল। শৃঙ্খলাবোধ ব্যতিরেকে জীবনের বিকাশ সম্ভব নহে। সক্রিয় রাজনীতিতে ছাত্রসমাজের অংশগ্রহণ যুক্তিযুক্ত কিনা এই বিষয়ে বিতর্ক চলিতে পারে। কিন্তু একদা এই ছাত্রসমাজ দেশের মুক্তিযজ্ঞে আত্মাহুতি দিয়াছিল।

অধ্যয়ন ছাত্র সমাজের প্রাথমিক কর্তব্য ও রত, ইহাকে অবলম্বন করিয়াই জীবনের সর্বতোমুখী বিকাশ সম্ভব হইয়া থাকে। সামাজিক কর্তব্যবোধের তথা দায়িত্ববোধের বিকাশের কালই হইল ছাত্রজীবন। কেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া ছাত্রসমাজের উদ্দেশ্য নহে, ইহা মহৎ লক্ষ্যে পৌঁছিবার একটি উপায় মাত্র। কেননা গ্রন্থের সহায়তায় জীবন পূর্ণ হয় না, কেবল সমৃদ্ধ হয়। তাই পুঁথিগত

বিদ্যাশিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে বৃহত্তর জীবনের অপরাপর পাঠগুলি আয়ত্ত করিতে পারিলেই সুপ্ত মানবশক্তির নিদ্রাভঙ্গ হয় এবং জীবনও সার্থক ও সুন্দর হইয়া উঠে।

৮। দেশভ্রমণ

থাকবোনা আর বন্ধ ঘরে, 

দেখবো এবার জগতটাকে, 

কেমন করে ঘুরছে মানুষ, 

যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।

(কাজী নজরুল ইসলাম) 

সুদূরের পিয়াসী মানুষের আবক্ষ অনির্বাণ তৃষ্ণা নিবৃত্তি জানে না। অজানাকে জানা, অদেখাকে দেখিবার দুর্বার আকাঙ্ক্ষায় যুগে যুগে মানুষ শান্ত গৃহকোণ ছাড়িয়া বাহির হইয়া পড়ে অজানার পথে, দেশ-দেশান্তরে। বিপুলা এ পৃথিবীর বুকে স্তরে স্তরে এত সম্ভার, এত বিস্ময় ছড়ানো রহিয়াছে যে, যা কেবলমাত্র গ্রন্থপাঠে পরিতৃপ্তি লাভ করিয়া না। এমন নান্দনিক দৃশ্য উপভোগ করিবার জন্য প্রয়োজন দেশভ্রমণ।

বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করিয়া। কেউ কেউ নয়নভোলানো সৌন্দর্যের বৈচিত্র্য উপভোগ করিবার জন্য ভ্রমণে ব্রতী হন। কেউ শিক্ষা এবং জ্ঞান লাভের জন্য, কেউ বা নতুন দেশ আবিষ্কারের প্রেরণায়, আবার কেউ কর্মক্লান্ত জীবনের একঘেয়েমি হইতে মুক্তি পাইবার মানসে দেশভ্রমণে ব্রতী হন। দেশভ্রমণের ফলে সাংস্কৃতিক বিনিময় সাধিত হয়। বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের পথ সুগম হয় সর্বোপরি বিশ্বভ্রাতৃত্ব বোধ জাগিয়া ওঠে।

জ্ঞান অর্জনের অসীম আকর্ষণে দুর্গম গিরি, কান্তার মরু প্রান্তর এবং বিপদ- সকুল সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করিয়া যে সব পর্যটক ঐতিহাসিক প্রসিদ্ধি অর্জন করিয়াছেন তাঁদের মধ্যে হিউয়েন সাঙ, ফা-হিইয়ান, ইবন বতুতার নাম স্মরণীয় হইয়া আছে। ভাস্কো-ডা-গামা, কলম্বাস, মার্কোপোলো দুর্জয়কে জয় করিবার জন্য নিজেদের প্রাণ তুচ্ছ করিয়া বৎসরের পর বৎসর অভিযানে রত হইয়াছেন। ভারতের অতুল বৈভব, ঐশ্বর্যের আকর্ষণে ভারতবর্ষ আবিষ্কারের যাত্রাপথে কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করিয়া চিরস্মরণীয় হইয়া আছেন।

শিক্ষালাভের ক্ষেত্রে ভ্রমণের গুরুত্ব অসীম। কেবলমাত্র গ্রন্থপাঠের মাধ্যমে শিক্ষালकজ্ঞান জীবনে পূর্ণতা আনিতে পারে না। দেশের ভৌগোলিক আয়তন, বিভিন্ন তথ্য, বিভিন্ন দেশের সমাজ জীবন, তাহাদের আচার, সাংস্কৃতিক জীবন স্বচক্ষে দর্শন করিয়া যে জ্ঞান লাভ করা যায় তা অতি সহজেই বাস্তব অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করিয়া। শিক্ষার ক্ষেত্রে দেশভ্রমণের এই অবদান সর্বজন স্বীকৃত বলিয়াই “শিক্ষামূলক ভ্রমণের” সৃষ্টি হইয়াছে।

দেশভ্রমণ একই সাথে মানুষের দেহ ও মনের উন্নতি সাধন করিয়া। উন্মুক্ত প্রকৃতির সূর্যস্নান ও বিশুদ্ধ বায়ু শহরে মানুষের রোগাক্রান্ত দেহকে অনেকখানি সজীব করিয়া তোলে। প্রকৃতির বিচিত্র রূপশোভা দর্শন করিয়া মন ও স্নিগ্ধ হয়। 

দেশভ্রমণের সার্বিক গুরুত্ব অনুধাবন করিয়া সরকার পর্যটন কার্যালয় স্থাপন করিয়াছে। তাহারা

বিভিন্নভাবে ভ্রমণকারীদের সাহায্য করিয়া। রাষ্ট্রসংঘ দেশভ্রমণকে “A Passport to World Peace” বলিয়া অভিহিত করিয়া বিশ্ববাসীকে দেশভ্রমণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করিয়াছেন।

বিপুলা এ পৃথিবীর আমরা প্রায় কিছুই জানি না। বহু বিনিদ্র রজনীর মূল্যে সারাজীবন ধরিয়া গ্রন্থপাঠে নিয়োজিত থাকিলেও ইহার অল্পই জানা যায়। ফলে সুদূর দিগন্ত আমাদের হৃদয়কে প্রতিনিয়ত দেয় নীরব হাতছানি। তাই বলা যাইতে পারে দেশভ্রমণ আমাদের জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার মূল চাবিকাঠি।

৯। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপর্যয়

ভূমিকম্প ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম—এই পঞ্চভূত ঘটিত যে কোন দুর্যোগ বা বিপর্যয়কে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বিপর্যয় বলা হয়। ভূমিকম্প ক্ষিতি পর্যায়ভুক্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ইহার ফলে প্রকৃতিতে নানা পরিবর্তন সংঘটিত হয়।

“ভূমিকম্প হইল মাটির কাঁপুনি। সুরসিক সুকুমার রায় বলেন, “এ কাপুনি বলিতে গেলে রোজই কতবার করিয়া হইতেছে। রাস্তা দিয়া দমকল ছুটিয়া গেল, ঘোড়সোয়ার পল্টন গেল, মাটি গুম্ গুম্ করিয়া কাঁপিতে লাগিল। এমন কি একজন মোটা লোক যদি সিঁড়ি দিয়া খুব উৎসাহ করিয়া নামিতে যায়, তাহাতেও বাড়ির ভিতরে ছোটখাট রকমের ‘ভূমিকম্প’ হয়। যদি বেশ সূক্ষ্ম রকম যন্ত্র দিয়া পরীক্ষা করিয়া দেখ, তবে পাশের ঘরে বিড়াল হাঁটিয়া গেলে এই ঘরে তাহার চলা- ফিরার সাড়া পাইবে। কিন্তু ভূমিকম্প বলিতে আমরা এইরকম কাপুনি বুঝি না। মাটির ভিতর হইতে যে ধাক্কা আসে, মাটির তলে তলে যাহা বহুদূর পর্যন্ত ছড়াইয়া পড়ে, তাহার নাম ‘ভূমিকম্প’। কম্পনের বেগ যখন অধিক থাকে, তখন পৃথিবীর উপরিভাগে নানা পরিবর্তন ঘটে। বহুদূরে কোন কম্পনলিপি যন্ত্র (seismograph) থাকিলে উহাতে ভূমিকম্পের সাড়া পাওয়া যায়। ইহার উৎপত্তিস্থল হইতে কম্পনের সমভাবে সকল দিকে গতি থাকায় পৃথিবীর উপরিভাগ কাঁপিয়া উঠে।

ভূমিকম্প নানা কারণে হইতে পারে। ভূ-সংকোচন, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, হিমানী সম্প্রপাত ও ভূমিস্থলনের জন্য ভূ-পৃষ্ঠে ভূমিকম্প হইয়া থাকে। ইহার ফলে (১) ভূ-পৃষ্ঠের কোন কোন অংশ নিচে নামিয়া যায় অথবা কোন কোন নিচু অংশ উপরে উঠিয়া যায়। এইভাবে ভঙ্গিল পর্বত ও গ্রস্থ উপত্যকার সৃষ্টি হয়। (২) সাগরের তলদেশ উপরে উঠিয়া বিস্তৃত সমতল ভূমি বা দ্বীপের সৃষ্টি হয়, আবার বিস্তৃত সমভূমি সাগরে ডুবিয়া যায়। (৩) সমুদ্রের তলদেশে ভূমিকম্প হইলে ইহার প্রচণ্ড ঢেউ পার্শ্ববর্তী উপকূল অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করিয়া থাকে। (৪) ইহার ধ্বংসাত্মক কাজই বেশি। ইহা ঘরবাড়ি, গাছপালা, পশুপক্ষী ও মানুষের বিস্তর ক্ষতিসাধন করিয়া থাকে।

ভূমিকম্পের রুদ্ররূপ পৃথিবীতে নানা সময়ে নানাভাবে দেখা গিয়াছে। ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরিজাত ভূমিকম্পের ফলে বহুকাল পূর্বে পম্পিয়াই শহর ধ্বংস স্তূপে পরিণত হইয়াছিল। সুমাত্রা ও যবদ্বীপের মাঝামাঝি একটি দ্বীপ ছিল কাকাতোয়া। ইহাতে ছিল একটি সুপ্ত আগ্নেয়গিরি। প্রায় দুইশত বৎসর সুপ্ত থাকিয়া ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দ হইতে উহা জাগ্রত হয়। তখন হইতেই সেখানে বেশ বড় রকমের ভূমিকম্প হইতে থাকে, যাহার ধাক্কা সমুদ্র পার হইয়া সুদূর অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত পৌঁছাইত। তিন বৎসর ধরিয়া ভূমিকম্প চলিতে থাকে। তারপর একটি প্রচণ্ড বিক্রমে উহা জাগ্ৰত

হয় এবং সাত মাইল উঁচু হইয়া চতুর্দিকে অগ্নিবর্ষণ করিতে থাকে। ইহারই গরম ধূলার বৃষ্টি ি পড়িয়াছিল একশত মাইল দূরে বাটাভিয়া শহরের উপর। তিনমাস এইভাবে অগ্নিবর্ষণ করিয়া ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দের ২৬শে আগস্ট কাকাতোয়ায় আট মাইল ডাঙ্গা শূন্যে মিলাইয়া গেল এবং গভীর সমুদ্র আসিয়া তাহার স্থান দখল করিল। সেই বিস্ফোরণের শব্দ তিন হাজার মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হইয়াছিল। আগুনের পাহাড় সমুদ্রে গিয়া পড়ায় পার্শ্ববর্তী উপকূল অঞ্চলের প্রচুর ক্ষতি সাধিত হইয়াছিল, প্রায় চল্লিশ হাজার লোকের মৃত্যু হইয়াছিল।

ভূমিকম্পের ধাক্কা মাটির ভিতর দিয়া ঢেউয়ের মত ছড়াইয়া পড়ে। ইহাতে ভূ-পৃষ্ঠ টলমল করিতে থাকে, ঘর-বাড়ি ভাঙ্গিয়া পড়ে রেলের লাইন মোচড়াইয়া বাঁকিয়া যায়। ১৭৯৭ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ আমেরিকার কুইটো শহরে যে ভূমিকম্প হয়, ইহাতে শহরের কোন কোন স্থানের মানুষগুলিকে ফুটবলের মত ছুড়িয়া দিয়াছিল। সান ফ্রান্সিসকোর ভূমিকম্পে শহরে বিরাট আগুন ধরিয়া যায়।

১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে, ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে এবং ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে অসম ও পার্শ্ববর্তী রাজসমূহে প্রচণ্ড ভূমিকম্প হয়। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের তৎকালীন পূর্ববঙ্গ ও অসমে ব্যাপক ক্ষতি হয়। ইহার ধাক্কা পশ্চিমবঙ্গেও পড়ে। ইহাতে বহুলোকের প্রাণহানি ঘটে। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে ১৫ই আগস্ট রাত্রিতে অসমে হয় বিরাট ভূমিকম্প। ইহাতে উত্তর অসমের প্রচুর ক্ষতি সাধিত হয়। নদীর গতি পরিবর্তিত হয়। বাড়ি-ঘর, রাস্তাঘাট, গাছ-পালারও অনেক বিপর্যয় ঘটে। মানুষ ও পশুর মৃতদেহ পাশাপাশি পড়িয়া থাকিতে দেখা যায়।

১০। জাতীয় সংহতি

সমগ্র জাতির ভাগ্যাকাশে আজ এক দুর্যোগের ঘনঘটা। ভারতের জাতীয় সংহতি আজ তাই বিপন্ন।

ভারতের মত বিশাল দেশে বিভিন্ন বৈচিত্র্য ও পার্থক্যের ভিতরেও একটি ঐক্যধারা প্রবাহিত হইয়াছে। পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু যাহাকে “Unity in diversity” বলিয়াছেন। প্রাচীন কাল হইতে আর্য, অনার্য, দ্রাবিড়, শক, রূপ, মোগল, পাঠান প্রভৃতি বিভিন্ন জাতি এই ভারতের মাটিতে “একদেহে লীন হইয়া গিয়াছে। ইংরেজ শাসনকালে পরাধীনতার গ্লানি জনগণের জীবনকে এরূপ দুবির্ষহ করিয়া তুলিয়াছিল যে জাতীয় জীবনে বিপুল ঐক্যবোধ জাগ্রত হইয়া দেশ প্রেমের জোয়ারে সকলকে ভাসাইয়াছিল।

কূটকুশলী ইংরেজ ভারত ত্যাগ করিলেও যে বিষবৃক্ষ বপন করিয়া গিয়াছিল তাহার বিষময় পরিণাম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে আজ সমগ্র ভারতের আকাশ-বাতাস কলুষিত। সাম্প্রতিকতম প্রমাণ অযোধ্যার রাম জন্মভূমি এবং বাবরি মসজিদ সমস্যা। স্বাধীনতা লাভের পর আমাদের স্বদেশ প্রেমে ভাটা পড়িয়াছে। সাম্প্রদায়িক, প্রাদেশিক এবং রাজনৈতিক ভেদবুদ্ধির কদর্য পঙ্কিলতা প্রকটরূপে আত্মপ্রকাশ করিয়াছে। অসমের “বিদেশী হঠাও” আন্দোলন পৃথক কামতাপুর রাজ্য, গোর্খাল্যাণ্ড এবং বোরোল্যাণ্ডের দাবীতে সহিংস আন্দোলন ইহার জাজ্বল্যমান উদাহরণ। ইহা ছাড়াও দেশব্যাপী ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, বেকারসমস্যা, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং ধনবৈষম্য প্রভৃতি বিভিন্ন কারণে জাতীয় ঐক্যচেতনা ক্রমশই ক্ষীণ হইয়া পড়িয়াছে।

চারিদিকের সংঘর্ষ জর্জরিত পরিবেশের মধ্যেও ভারতের জাতীয় ঐক্য নির্মূল হইয়া যায় নাই। পাকিস্তান এবং চীনের ভারত আক্রমণের সময় ভারতীয় জনগণের উদ্যম। ঐক্যচেতনার প্রমাণ পাই। দেশপ্রেমের শিকড় কত গভীরভাবে জনগণের অন্তরে প্রসারিত তাহা সঙ্কটকালে উপলব্ধি করা যায়।

প্রবল প্রতাপী ইংরেজ বহু প্রাণক্ষয় ঘটাইয়াও এদেশে সাম্রাজ্যকে টিকাইয়া রাখিতে পারে নাই। নিষ্পাপ রক্তপাত কখনই ভারত ভাগ্য বিধাতা সহ্য করিবে না। একদিন ভারত জননীর সকল সন্তানের মনে শুভবুদ্ধির উদয় হবে। ভ্রাতৃ-বিরোধ এবং বিভেদের অবসানে এক নতুন ভারত জন্মলাভ করিবে। দীর্ঘ-প্রতিক্ষিত মাতৃ-অভিষেকের পবিত্র লগ্নে ধ্বনিত হইবে।

“মার অভিষেকে এসো এসো ত্বরা 

মঙ্গলঘট হয় নি যে ভরা

সবার পরশে পবিত্র করা তীর্থনীরে- 

এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে।।

১১। দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞানের দান

বর্তমান শতাব্দী বিজ্ঞানের যুগ। আধুনিক জীবনে বিজ্ঞানের প্রভাব এত সুদুরপ্রসারী যে তাহাকে কোন মতেই অস্বীকার করা যায় না। বিজ্ঞানের দান মানুষের জীবনকে সুস্থ-সমৃদ্ধিতে ভরিয়া তুলিয়াছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে বিজ্ঞান মানুষকে সভ্যতার অগ্রগতিতে আগাইয়া লইয়া চলিয়াছে। বিজ্ঞান ছাড়া মানুষ আজকালকার দিনে একটি দিনও চলিতে পারে না। এই যুগকে বিজ্ঞানের যুগ বলা হয়। বিজ্ঞানের যুগ আসলে বুদ্ধিবৃত্তির স্বাধীন বিকাশ ও অনুশীলনের যুগ। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে পৌঁছিয়া মনে হইতেছে যে বিজ্ঞানের রাজ্যে অসাধ্য বলিয়া কিছুই নাই।

বর্তমান যুগের প্রতিটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কর্ম প্রণালী ও জীবনযাত্রার দিকে লক্ষ করিলে দেখা যাইবে যে, বিচিত্র বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারই তাহার অবলম্বন। ভোরে নিদ্রা ভাঙ্গার পর হইতে বিজ্ঞানের সাহায্য লইয়া মানুষ যাত্রা শুরু করে, আবার রাত্রিতে শয্যাগ্রহণের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত বিজ্ঞানকেই নানা উপায়ে প্রয়োজন সাধনে নিযুক্ত করে। কোন শহরের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা অনুসরণ করিলে আমরা দেখিতে পাই যে সর্বত্রই বিজ্ঞানের জয়জয়কার। শহরের মানুষ শয্যা ত্যাগ করিয়া এক কাপ গরম চা সহযোগে যে সংবাদপত্রখানি পাঠ করে তাহা মুদ্রিত। হইয়াছে আধুনিকতম বৈদ্যুতিক মেশিনে। মুখ ধুইতে হ্রাস, বৈদ্যুতিক হিটারে জল গরম করিয়া স্নান, বামের টেপের জল ব্যবহার, রান্নাঘরের প্রায় সকল প্রকার প্রয়োজনীয় জিনিষপত্রই আমরা বিজ্ঞানের দান হিসাবে পাইয়াছি। ট্রেনে বা বাসে করিয়া অফিস যাত্রা, লিস্টের সাহায্যে পাঁচতলায় অফিসরুমে গিয়া স্ত্রীংয়ের চেয়ারে আসন গ্রহণ, মাথার উপরে ফ্যানের হাওয়ায় ক্লান্তি দূর করা সকলই বিজ্ঞানের প্রভাবেই আমরা পাইয়াছি। টাইপরাইটারে টাইপ করা, কিংবা ঝর্ণা কলমে লেখা, দুপুরে বিরতির সময় ফ্রিজের শীতল পানীয়; কিংবা চা, টোস্ট খাওয়া সকলই বিজ্ঞানের আবিষ্কারের ফলেই সম্ভব হয়। ছুটির পর কর্মক্রান্ত অফিসকর্মী পুনরায় যন্ত্রযানের সাহায্যে বাড়ী ফিরিয়া আসেন। আসার সময় ছেলের জন্য বিস্কুট, রুখ স্ত্রীর জন্য আনেন নানা প্রকার ঔষধ

ও ইনজেকশন। ডাক্তার বলিয়া গিয়াছেন কগিনীর একস্-রে করাইলে ভাল হয়। সন্ধ্যা হইতে না হইতেই ঘর বৈদ্যুতিক আলোতে আলোকময় হইয়া উঠে। ঘড়িতে সাতটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঘরে দূরদর্শন ও রেডিওর মাধ্যমে দূর দুরান্তের নানা খবর ভাসিয়া আসে পৃথিবীর নানা প্রাস্ত হইতে। রাত্রির আহারের পর যখন আমরা বিছানায় শুইতে যাই তখন হাত বাড়াইয়া বেড় সুইস্ টিপিতেই সারাঘর অন্ধকারে ডুবিয়া যায়। বিজ্ঞান আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রতি-মুহূর্তে কাজ করিয়া চলিয়াছে।

পৃথিবীর নানা প্রাপ্ত হইতে মানুষ তাহাদের আত্মীয়-স্বজনের নিকট হইতে প্রতি নিয়তই টেলিগ্রাফ ও টেলিফোনের সাহায্যে প্রয়োজনীয় খবরাখবর পাইয়া থাকে। উপরে উল্লেখিত দৈনন্দিন জীবন যাত্রা লক্ষ্য করিলে সহজেই অনুমান করা যায় যে আধুনিক মানুষের প্রতিটি কর্মেই কোনো না কোনো দিকদিয়া বিজ্ঞান যুক্ত রহিয়াছে। ইহাতো হইল সাধারণ মানুষের জীবনের কথা। আরও যে কত ব্যাপারে মানুষকে বিজ্ঞানের সাহায্য লইতে হয় তাহার সীমা সংখ্যা নাই। পীড়িতদের চিকিৎসায়, আর্তের সেবায় আমোদ-প্রমোদের উপকরণ হিসাবে, খেলাধুলায়, বিদেশ যাত্রায় বা যোগাযোগ ব্যবস্থায়, যুদ্ধের মারণাস্ত্র হিসাবে বিজ্ঞান মানব জীবনে একদিকে আশীর্বাদ এবং অপর দিকে অভিশাপ আনিয়া দিয়াছে। আধুনিক মানুষ আজ আর বিজ্ঞানের প্রভাব হইতে মুক্ত নহে। বিজ্ঞান মানব জীবনে ওতঃপ্রোতভাবে জড়িত হইয়া আছে।

১২। ভূমিকম্প

প্রকৃতির রাজ্যে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন প্রকার প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বিপর্যয় সংঘটিত হইয়া চলিয়াছে। ইহাদের মধ্যে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং ভূমিকম্পই প্রধান। ভয়াবহতা এবং মারাত্মক ক্ষতিকারক দিক হিসাবে ভূমিকম্পকেই সকলের চেয়ে প্রলয়ঙ্কর বলা যায় কারণ অন্য দুইটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় সম্বন্ধে পূর্বানুমান করা সম্ভব, কিন্তু ভূমিকম্প সম্পর্কে কোন পূর্বানুমান বা পূর্ব হইতে প্রস্তুতি লইবার কোন বিজ্ঞানসম্মত উপায় আজ পর্যন্তও উদ্ভাবন করা সম্ভব হয় নাই। প্রকৃতিতে কখন কোথায় ভূমিকম্প হইবে তাহা কেহই জানে না। এই ভূমিকম্প সম্বন্ধে পৃথিবীর সকল মানুষকে এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে থাকিতে হয়। কারণ ভূমিকম্পের জন্য পূর্ব হইতে কোন সতর্কতা অবলম্বন করা সম্ভব নহে। ইহাকে রোধ করারও কোন উপায় নাই। ইহা যেন মানুষের ভাগ্যে নিয়তির এক করুণ পরিহাস। পৃথিবীর উপরিভাগের ভূত্বক বিশেষভাবে নড়িয়া উঠাকে বা কাঁপিয়া উঠাকেই মাটি কাঁপা বা ভূমিকম্প বলে। পৃথিবীর এই পরিঘটনাটি কতগুলি বিশেষ কারণে ঘটিয়া থাকে। পৃথিবীর বিজ্ঞানীগণ ভূমিকম্পরূপ প্রলয়ঙ্কারী বিপর্যয় সংঘটিত হওয়ার কতগুলি কারণ উল্লেখ করিয়াছেন।

(১) কখনো কখনো পৃথিবীর অভ্যন্তরে কোন রাসায়নিক ক্রিয়ার ফলে ভূমিকম্প হয়।

(২) কখনো কখনো পৃথিবীর বিভিন্ন স্তরগুলির অনিয়মিত স্থান পরিবর্তন ভূমিকম্প সৃষ্টির কারণ হয়।

(৩) বিরাট আগ্নেয়গিরির উদিগ্রণের ফলেও ভূমিকম্প হইতে পারে 

(৪) তাপ বিকিরণের ফলে ভূগর্ভস্থ পদার্থসমূহ শীতল হয় ও ইহাদের সংকোচন ঘটে এই ভূ-

সংকোচনের ফলে এবং হিমানী সম্প্রপাতের ফলে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। ভূমিকম্প কখনো ধীরে আবার অনেক সময় জোরেও হয়। ভূমিকম্পের কম্পন দুই প্রকারের হয়। নীচ-উপর এবং অনুভূমিক। যে কোন সময় পৃথিবীর যে কোনো স্থানে ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্প সংঘটিত হইতে পারে।

বিগত ২০০ বৎসরের মধ্যে পৃথিবীতে বহুবার বড় ধরনের ভূমিকম্প হইয়াছে। ফলে ইহাতে অগণিত মানুষ, প্রচুর ধনসম্পত্তি, শহর ও জনপদের ক্ষতি সাধন হইয়াছে। ১৮৯৭ সালে বেশ বড় ধরনের ভূমিকম্প ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সংঘটিত হইয়াছিল। ১৯৫০ সালের ভূমিকম্প আসামের বিস্তর ক্ষতিসাধন করিয়াছে। ১৯৯২ এবং ১৯৯৩ সালে দুইটি পর পর বড় ধরনের ভূমিকম্প উত্তর প্রদেশের গাড়োয়াল পাহাড়ীয়া অঞ্চলের এবং মহারাষ্ট্রের হাজার হাজার মানুষের জীবন নষ্ট করিয়াছে। ভূমিকম্প দেখা দিলে ধ্বংস এবং মৃত্যু অবধারিত কারণ ইহাকে নিয়ন্ত্র এবং বাধা দেওয়ার কোন পূর্ব প্রস্তুতি থাকে না। গত ২৬শে জানুয়ারিতে সংঘটিত হওয়া গুজরাটের ভূমিকম্পটি যথেষ্ট ভয়ংকর এবং ক্ষতিকারক ছিল। কারণ এই অঞ্চলটির মাটি বালিযুক্ত বলিয়া ইহার ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ বেশি হইয়াছে। গুজরাটের ভুজ, কাছ, আহমেদাবাদ, আজার, রাপার, ভাচাউ এবং সুরাট ইত্যাদি স্থানগুলিতে প্রবল ভূমিকম্পের ফলে প্রায় ২০,০০ লোকের প্রাণহানি ঘটিয়াছে এবং প্রায় লক্ষেরও অধিক লোক আহত হয় ও প্রচুর ধনসম্পত্তি নষ্ট হইয়াছে। গত ১০ বৎসরে ভারতে ভূমিকম্পের প্রবণতা বাড়িয়াছে। উত্তর কাশী, লাতুর, জব্বলপুর ও গুজরাটের মর্মান্তিক ঘটনার পর আমাদের নূতন করিয়া ভাবিতে হইতেছে যে কিভাবে ইহা হইতে রক্ষা পাওয়া যাইতে পারে।

সম্মানীয় ‘বাদিয়া’ ইন্সস্টিটিউট অব্ হিমালয়ান জিওলজির বিজ্ঞানীগণ সমগ্র ভারতবর্ষকে পাঁচটি ভূমিকম্প মণ্ডলে ভাগ করিয়াছেন। তাহাদের মতে গুজরাট জম্মু-কাশ্মীর, উত্তরপ্রদেশ, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, হিমালয়ের কিছু অংশ, উত্তরাঞ্চল এবং আন্দামান-নিকোবরকে লইয়া এই বিশাল অঞ্চলটি সবচেয়ে বেশি ভূমিকম্প প্রবণ মণ্ডল। এই মণ্ডলটি ‘V’ (ভি) মণ্ডলের অন্তর্গত। আর এইখানে ভূমিকম্পের সম্ভাবনা সর্বাধিক। এই মণ্ডলের ভূমিকম্পের প্রাবল্য রিখটার স্কেলে ৮.০ পর্যন্ত হইতে পারে বলিয়া বিজ্ঞানীগণ মনে করেন। ইন্সস্টিটিউট অব হিমালয়ান জিওলজির বিজ্ঞানীগণ গুজরাটের ভূমিকম্পটি হওয়ার একদিন পূর্বে ‘V’ (ভি) মণ্ডলে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করিয়াছিলেন কিন্তু ভূমিকম্প কখন এবং কোথায় হইবে সেই বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করিতে তাহারা অসমর্থ ছিলেন। ইন্সস্টিটিউটটির বিজ্ঞানীগণ ভূমিকম্পের বিষয়ে পূর্ব হইতে অনুমান পাওয়ার জন্য গ্লোবেল পজিসনিং সিস্টেমের সাহায্য লইতেছেন। এই ব্যবস্থার দ্বারা তাঁহারা ভূগর্ভের টেটিক প্লেইটগুলির অবস্থান বিষয়ে জানিতে পারেন।

নতুন দিল্লীর সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে গুজরাটের কালান্তর ভূমিকম্পটি প্রত্যাশিত ছিল। কারণ আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ গুজরাটসহ পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল, কঙ্কন, কেরালা এবং দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল হইল প্রবল ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক ডঃ সৌমিত্র মুখার্জি বলেন যে তিনি এই ভূমিকম্পের পূর্ব সতর্কতা সংকেত দিয়াছিলেন। ইহা ছাড়া চতুর্দশ দালাইলামা ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে ভারতে ভয়াবহ দুর্যোগ ঘটিবে বলিয়া পূর্বানুমান দিয়াছিলেন।

পৃথিবীর কয়েকটি বিধ্বংসী ভূমিকম্প উল্লেখ করা হইল। ২০০১ সালের ২৬ জানুযারি গুজরাট (ভারত)। ১৯৯৯ সালের ২১শে সেপ্টেম্বর তাইওয়ান। ১৯৯৯ সালের ১৭ই আগস্ট পশ্চিমতুর্কী। ১৯৯৯ সালের ২৫ জানুয়ারি পশ্চিম কলম্বিয়া। ১৯৯৮ সালের ৩০শে মে উত্তর আফগানিস্তান। ১৯৯৭ সালের ১০ই মে উত্তর ইরান ১৯৯৫ সালের ১৭ই জানুয়ারি জাপানের কোবে। ১৯৯৩ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর ভারতের লাতুর। ১৯৯০ সালের ২১শে জুন উত্তর ইরান। ১৯৮৮ সালের ৭ ডিসেম্বর উত্তর আর্মেনিয়া। ১৯৭৫ সালের ২৮শে জুলাই চীন ইত্যাদি।

ভূমিকম্পজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় জনসাধারণকে কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থার জন্য প্রস্তুত থাকিতে হয়।

(১) গৃহ নির্মাণ করার সময় কাজের মানদণ্ড ও নীতি নির্দেশনা পালন করা দরকার। 

(২) পুরানো অথবা ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির সংস্কার করা দরকার।

(৩) ঘরের আসবাবপত্র নিয়মিত সাজাইয়া রাখিয়া দরজাগুলি মুক্ত রাখা দরকার। 

(৪) হঠাৎ বাহির হওয়ার জন্য ঘরে উপযুক্ত ও স্বতন্ত্র দরজা রাখা দরকার।

(৫) ভারি দ্রব্য উপরে না রাখাই ভাল। 

(৬) ভূমিকম্প অনুভব হইলে রন্ধন গ্যাস, জল, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বন্ধ রাখা প্রয়োজন।

(৭) প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম হাতের কাছে রাখা দরকার।

(৮) ঘরের গৃহপালিত পশুগুলিকে মুক্ত করিয়া দেওয়া প্রয়োজন। 

(৯) ভূমিকম্পের সময় হঠাৎ হতাশ না হইয়া ঘরের উপযুক্ত বড় থাম বা কোলামের পার্শ্বে আশ্রয় নেওয়া দরকার। 

(১০) ভূমিকম্পের সময় পরিত্রাণের জন্য মোটা রশ্মি, মই বা অন্য কোন হাতিয়ার হাতের কাছে রাখা দরকার।

১৩। মহাপুরুষের জীবনী—

স্বামী বিবেকানন্দ

সূচনা : ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে পাশ্চাত্য শিক্ষা এবং সভ্যতার সংঘর্ষে ভারত যখন বিভ্রান্ত ও দ্বিধাগ্রস্ত তখন ১৮৬৩ খ্রীষ্টাব্দে উত্তর কলিকাতার শিমুলিয়ার প্রসিদ্ধ দত্তবংশে জন্মগ্রহণ করেন স্বামী বিবেকানন্দ। তাঁহার পিতার নাম বিশ্বনাথ দত্ত এবং মাতার নাম ছিল ভুবনেশ্বরী দেবী। পরাধীনতার অন্ধকারে নিমজ্জিত তরুণ ভারতীয়গণ বিদেশী চিন্তাভাবনা উন্মাদনার ঐতিহ্যভ্রষ্ট হইয়া জাতির দেহ-মনে যখন প্রবল প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করিয়াছিল, তখন ঐ জড়তাগ্রস্থ তন্দ্রাচ্ছন্ন ভারতবাসীকে জড়তা ত্যাগ করিয়া আপন ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হইবার জন্য ভারতের অন্যতম দ্রষ্টা পুরুষ বীরবেশরী স্বামী বিবেকানন্দ নিষ্কাম কর্মযোগের মহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হইবার আহ্বান জানাইলেন। মানুষের সেবার মধ্য দিয়াই যে ঈশ্বরের করুণা লাভ করা যায়—এই সত্যকে তিনি ভারতের মোহমুগ্ধ, আত্মবিস্মৃত জাতির নিস্প্রভ প্রাণে সঞ্চারিত করিয়া দিলেন কর্মযোগের মহামন্ত্র বাণী। তিনি অন্ধকারে দিশাহারা বুভক্ষু হৃদয়কে দিলেন মুক্তি পথের সন্ধান।

বাল্যজীবন ও শিক্ষা : স্বামী বিবেকানন্দের প্রথম জীবনের নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ দত্ত। অত্যন্ত দুরন্ত বলিয়া তাহার জননী বাল্যকালে তাহার নাম দিয়াছিলেন বীরেশ্বর তথা বিলে। তাঁহার নিত্য নতুন দুরন্তপনায় সকলেই ছিলেন তটস্থ। কেবল শিব নাম উচ্চারণেই তিনি শাস্ত হইতেন। তাঁহার স্মৃতিশক্তি ছিল অপরিমেয় । নরেন্দ্রনাথের সুন্দর সুঠাম চেহারা ও সুধাকণ্ঠের সুললিত সঙ্গীত পাড়া-প্রতিবেশী ও বন্ধু-বান্ধব সকলকেই আকৃষ্ট ও মুগ্ধ করিত। শুধু প্রশ্ন করা এবং সকল বিষয় স্বয়ং পরীক্ষা করিয়া দেখা ছিল তাঁহার আবাল্য প্রকৃতি। মাত্র চৌদ্দ বৎসর বয়সে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং পরে যথা সময়ে তিনি জেনারেল এসেম্বলীজ কলেজ হইতে সম্মানের সহিত বি. এ. পরীক্ষায় পাশ করেন।

ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে সংশয় : পাঠ্যজীবন হইতেই স্বামী বিবেকানন্দের ব্যায়াম, খেলাধূলা ও সঙ্গীতচর্চার প্রতি ছিল প্রবল আকর্ষণ। কলেজে পড়ার সময় হইতেই তাঁহার জ্ঞান পিপাসা ক্রমে ক্রমে বৃদ্ধি পাইতে থাকে। এই সময় তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শনশাস্ত্র বিশেষ নিষ্ঠা সহকারে পাঠ করেন। পাশ্চাত্য দর্শন পাঠে তাহার মনে ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্বন্ধে সন্দেহ জাগে। তাহার যুক্তিপ্রবণ মন অন্ধবিশ্বাসে তৃপ্ত হয় নাই, অথচ কেহ তাহাকে যুক্তি দ্বারা ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করিয়া দিতে পারেন নাই। বি. এ. পাশ করার পরই তাঁহার পিতার মৃত্যু হয়। পিতার মৃত্যুর পর তিনি পড়াশুনা ছাড়িয়া দিয়া অর্থোপার্জনে মন দেন। এই সময় হঠাৎই যেন একদিন দক্ষিণেশ্বরের কালী সাধক শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সান্নিধ্যে আসেন। ঠাকুর রামকৃষ্ণের মধ্যে কি যেন এক অজানা আকর্ষণ শক্তি ছিল। সেই শক্তির আকর্ষণে নরেন্দ্রনাথের মনের দ্বন্দ্ব কাটিয়া গেল। নাস্তিক নরেন্দ্রনাথের মনের সংশয়-মেঘ কাটিয়া গেল। তিনি রামকৃষ্ণের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে ক্রমে প্রধান শিষ্যে পরিণত হইলেন। 

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ঠাকুরের মৃত্যুর পর তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। তখন তাঁহার নাম হইল স্বামী বিবেকানন্দ। 

পরিব্রাজক বিবেকানন্দ : সন্ন্যাস গ্রহণের পর স্বামীজী পরিব্রাজকের বেশে হিমালয় হইতে

কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত ভ্রমণ করেন। অধঃপতিত জীবস্মৃত ভারতীয় জাতিকে তিনি জনসেবায় উদ্বুদ্ধ করিলেন। ভারতের জাতিভেদ প্রথা দূর করিতে সচেষ্ট হইলেন। ভারতবাসীকে বিরাট ঐক্যবোধ, দেশপ্রেম ও আধ্যাত্মিক শক্তির প্রেরণা দিলেন। ভারতবর্ষ যেন নবজন্ম লাভ করিল। সেই সময় ১৮৯৩ সালে আমেরিকায় শিকাগো শহরে এক বিশ্ব ধর্মসভায় কয়েকজন ভক্তের অনুরোধে তিনি সনাতন হিন্দুধর্মের প্রতিনিধি হিসাবে যোগ দেন। তনি ঐ সভায় বহু চেষ্টা করিয়া মাত্র পাঁচ মিনিট বক্তৃতা দানের অনুমতি লাভ করেন। কিন্তু তিনি এক ঝড়ের মতো বিপুল হৃদয়াবেগে হিন্দুধর্মের মূল সূত্রগুলির ব্যাখ্যা করিয়া বিশ্বের নানা প্রাপ্ত হইতে আগত শ্রোতৃবৰ্গকে এক প্রাচীন ধর্মের অমৃতময়ী বাণীর সিঞ্চনে বিমোহিত করিয়া দিলেন। সেইদিন বিশ্ববাসী জানিল, হিন্দু ধর্ম বলিয়া একটি ধর্ম আছে যাহা সকল ধর্মের শ্রেষ্ঠ, যাহা ব্যথাতুর মানব সন্তানকে প্রকৃত মুক্তির সন্ধান দানে সক্ষম। তিনি তথায় চারি বৎসর কাল থাকিয়া ১৮৯৬ সালে ভারতে ফিরিলেন। আমেরিকার বহু জ্ঞানী-গুণী তাঁহার শিষ্যত্ব গ্রহণ করিয়াছিলেন। যেমন মার্গরেট নোবেল, ভগিনী নিবেদিতা যাহার পরবর্তী নাম হয়।

রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা : ভারতে প্রত্যাবর্তন করিয়া স্বামীজী সর্বরিক্ত দেশবাসীকে পুনর্গঠন করিবার কাজে মন দেন এবং ১৮৯৭ সালে ‘রামকৃষ্ণ মিশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৯৯ সালে তাঁহার অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই স্থাপিত হয় ‘বেলুড় মঠ (গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে)। ১৯০০ সালে প্যারিসে যে বিশ্ব ধর্ম সম্মেলন হয় তাহাতে যোগদান করেন। ১৯০২ সালের ৪ঠা জুলাই যোগাভ্যাসে নিরত অবস্থায় স্বামীজীর মহাপ্রয়াণ ঘটে।

১৪। তোমার বিদ্যালয় জীবনের অভিজ্ঞতা 

সূচনা : বিদ্যালয় হইল বিদ্যা বা জ্ঞান অর্জনের পীঠস্থান।

আমার যেন মনে হয় বিদ্যালয় আমার দ্বিতীয় বাসগৃহ। কখনো কখনো মনে হয় আমার বাসগৃহ হইতেও আমি বিদ্যালয়কে বেশি ভালবাসি। আমার বিদ্যালয়ে নিয়মিত আসা-যাওয়ার মধ্যে এক অতি অনিন্দ সুন্দর মানবিক পরিবেশ গড়িয়া উঠিয়াছে। কোনো দিন বিশেষ কারণে বিদ্যালয়ে আসিতে না পরিলে সেইদিন মনে এক অপূর্ণ অনুভূতি জাগে। মনে হয় বিদ্যালয়ে যাইতে না পারিয়া যেন অনেক কিছু হারাইয়াছি। আমার প্রাথমিক বর্ণমালার জ্ঞান বাড়ীতে মায়ের কাছেই হইয়াছে একটু বড় হইয়াই আমি প্রথম বিদ্যালয়ে গিয়াছি।

প্রথম ভর্তির দিন : আমার বাবার হইল বদলীর চাকুরী। আমাকে সেইজন্য অনেকবার বিদ্যালয় বদলাইতে হইয়াছে। আমার প্রাথমিক শিক্ষা গ্রামের কোন এক অখ্যাত বিদ্যালয়েই সমাপ্ত হইয়াছে। যখন একটু বড় হইয়াছি, পঞ্চম মান শ্ৰেণীতে উঠিয়াছি তখন আমার বাবা আসামের বিখ্যাত শহর গৌহাটির এক নাম করা বিদ্যালয়ে আমাকে ভর্তি করাইয়া দিলেন। ভর্তির দিনটি আমার এখন সঠিক মনে নাই তবে ঐ দিনটি যতদূর মনে পড়েজানুয়ারি মাসের ১০ তারিখ ছিল। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মহাশয় আমাকে ভর্তির প্রপত্র দেওয়ার আগে আমার পরীক্ষা নিলেন। ইংরেজীতে আমার নিজের নাম এবং পিতার নাম ও ঠিকানা লিখিতে দিলেন। আমার মনে আছে, আমি প্রশ্নগুলির উত্তর খুব সুন্দর ও শুদ্ধ করিয়া করিতে পারিয়াছিলাম তাই প্রধান শিক্ষক মহাশয় পঞ্চম শ্রেণীতে আমার নাম ভর্তি করাইয়া লইয়াছিলেন। ভর্তির প্রথম দিনই আমার, এত বড় দুইতলা বিশিষ্ট বিদ্যালয় বাড়ীটিতে প্রবেশ করিতে ভয় ভয় করিয়াছিল। ঐ দিন ভর্তি হইয়াই বাড়ী ফিরিয়া আসিলাম। জানিয়া আসিয়াছিলাম এক সপ্তাহ পর হইতে বিদ্যালয়ের পাঠদান শুরু হইবে।

বিদ্যালয়ে প্রথম দিন : বিদ্যালয় ১০টার সময় বসে। নির্ধারিত দিনে বিদ্যালয় শুরু হওয়ার প্রায় আধা ঘণ্টা পূর্বেই আমি উপস্থিত হইয়াছিলাম। বিদ্যালয়ের দপ্তরী আমাদের শ্রেণীকক্ষটি দেখাইয়া দিলে আমি সোজা শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করিয়া প্রথম বেঞ্চের এক কোণে আমার আসন ঠিক করিয়া বসিলাম। আমাকে আমার বড়দাদা বিদ্যালয়ে পৌঁছাইয়া দিতে আসিয়াছিলেন। দেখিলাম অনেক ছাত্র বাসে করিয়া কেহ বা পারে ইটিয়া বিদ্যালয়ে আসিয়াছে। বড় রাস্তার পার্শ্বে হলুদ রঙের বিশাল বিদ্যালয় গৃহটি প্রথম দৃষ্টিতেই আমাকে ভীষণভাবে আকর্ষণ করিয়াছিল। বিদ্যালয়ের প্রধান ফটক, সিঁড়ি ও প্রশস্ত বারান্দা সবই বেশ দেখার মত সুন্দর। মাত্র পনের মিনিটের মধ্যেই প্রচুর ছাত্রের উপস্থিতিতে দুই তলা বিদ্যালয় গৃহটি চেঁচামেচিতে মুখরিত হইয়া উঠিল। যথাসময়ে প্রার্থনার পর বিদ্যালয় শুরু হইল। কিছুক্ষণ পরেই একজন শিক্ষক মহাশয় শ্রেণীতে প্রবেশ করিলেন।

আমার বুকটা হঠাৎ যেন একটু কাপিয়া উঠিয়া পরক্ষণেই শান্ত হইল। শিক্ষক মহাশয় প্রত্যেকের নাম ধরিয়া ডাকিলেন এবং পরিচয় লইলেন। কে কোথা হইতে আসিয়াছে জিজ্ঞাসা করিলেন। তাহাকে বেশ হাসিখুশি মনে হইল। প্রথম দিন তিনি কোন পাঠ পড়াইলেন না। গল্প গুজবের পর প্রথম ঘণ্টা শেষ হইল। এইভাবে প্রথম দিন শেষ হইল।

পড়াশুনা ঃ আমি সর্বদাই বিদ্যালয়ে নিয়মিত যাতায়াত করিতাম। পড়াশুনার ব্যাপারে আমার এতটুকু অবহেলা ছিল না। বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ আমাকে বেশ সুনজরে দেখিতেন। আমি প্রায় পাঁচ বৎসর কাল ঐ বিদ্যালয়ে পড়িয়াছিলাম। এই সময়ের মধ্যে কোন দিনই আমার বিশেষ কোন দোষ বা অন্যায় শিক্ষক মহাশয়দের নিকট ধরা পড়েনাই।

বিদ্যালয়ে কি কি শিখিয়াছি : বিদ্যালয় এক পবিত্র মন্দির। এই স্থানে শুধু পড়াশুনাই নয় বিভিন্ন বিষয়ে নানা জ্ঞান আহরণ করার ইহা উপযুক্ত স্থান। জীবনে উন্নতি করিবার নানা সুবিধা এইখানে রহিয়াছে। আচার-আচরণ, সভ্যতা-ভদ্রতা, খেলাধূলা, বক্তৃতা শিক্ষা সবকিছুই এই স্থানেশিক্ষা করা যায়। এই স্থানের অর্জিত জ্ঞানই ভবিষ্যৎ জীবনের উন্নতির প্রবেশ দ্বার। 

বাৎসরিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও আমি যথারীতি অংশগ্রহণ করিয়াছি। এইসকল বিষয়ে আমিই ছিলাম প্রথম উদ্যোগী। নাটক প্রতিযোগিতায়, ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় আমি প্রতি বৎসরই যথেষ্ট পুরস্কার লাভ করিতে সমর্থ হইয়াছি। আমি একবার বিদ্যালয়ের ম্যাগাজিনের সম্পাদকও হইয়াছিলাম। তখন আমি দশম শ্রেণীর ছাত্র। বিদ্যালয়ের ফুটবল প্রতিযোগিতা, ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় যথেষ্ট সুনাম অর্জন করিতে না পারিলেই সকল কাজেই আমি আমাকে নিয়োজিত রাখিয়াছিলাম। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন পরীক্ষায় আমার নাম কখনও প্রথম কখনও বা দ্বিতীয় স্থানে থাকিত। বিদ্যালয় শিক্ষান্ত পরীক্ষার পূর্বে আয়োজিত বিনারসভায় আমি আমার বিদায়ী ভাষণে শিক্ষক ও শিক্ষিকাদের বাহবাও পাইয়াছিলাম। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মহাশয় আমার শান্ত ভদ্র স্বভাবের জন্য আমাকে যথেষ্ট স্নেহ ও আদর করিতেন। বিদ্যালয় শিক্ষাস্ত পরীক্ষায় আমি বিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান পাইয়াছিলাম। ইংরেজী, গণিত ও সাধারণ বিজ্ঞানে আমার শতকরা ৮০ ভাগ নম্বর ছিল। আজ সকলই অতীত, শুধু স্মৃতি। নানা অনুভূতিতে জড়াইয়া আছে আমার বিদ্যালয় জীবনের সকল অধ্যায়। এখন শুধু অভিজ্ঞতায় বিলীন মাত্র।

১৫। নিরক্ষরতা দূরীকরণে ছাত্রসমাজের ভূমিকা

ভূমিকা : বিশ্বের প্রতিটি দেশের প্রতিটি সমাজের উচ্চ-নীচ সর্বস্তরের মানুষের শিক্ষা গ্রহণ করা এক মানবিক অধিকার ও জন্মগত অধিকার। এই অধিকার হইতে বর্তমান পৃথিবীতে ঈশ্বর প্রেরিত কোন শিশুকেই বঞ্চনা করা চলিবে না। অশিক্ষা ও অজ্ঞতা মনুষ্য জীবনের এক নিদারুণ অভিশাপ। শিক্ষা প্রতিটি মানুষকে বিশ্বের জ্ঞান ভাণ্ডারে প্রবেশ করিতে ছাড়পত্র যোগায়। বিধাতার সৃষ্টি এই বিশ্ব চরাচর অনন্ত জ্ঞানের পারাবার। যাহারা শিক্ষার অভাবে বিশ্বের জ্ঞান ভাণ্ডারের তালা খুলিতে পারে না তাহারা বড়ই অভাগা। তাহারা শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান হইতে বঞ্চিত নহে, ব্যক্তিগত বা ব্যক্তি জীবন এবং সামাজিক জীবনের নানা দিক হইতেও বঞ্চিত হয়। নিরক্ষর কাহারা? লেখাপড়া না-জানা লোকদিগকে নিরক্ষর বলা হয়। নিরক্ষর লোকেরা সাধারণ শিক্ষার নিম্নতম সুবিধাটুকু হইতেও বঞ্চিত হয়, তাই নিরক্ষরতা একটি সামাজিক সমস্যা। নিরক্ষরতাই দেশের স্বাভাবিক প্রগতিতে প্রধান বাধার স্বরূপ হইয়া দাঁড়ায়, ইহা একটি সামাজিক অভিশাপও বটে।

নিরক্ষরতা একটি অভিশাপ : ভারতবর্ষের প্রায় ৭০ শতাংশ লোকই ি লোকেদের ব্যক্তিত্বের বিকাশ এবং জ্ঞানের বিকাশ বা শুভবুদ্ধির উন্মেষ ঘটে না। নিরক্ষর লোকেদের মধ্যে অন্ধবিশ্বাস, সাম্প্রদায়িকতা এবং বিভিন্ন কু-প্রথা সহজেই গভীর ভাবে প্রবেশ করিয়া থাকে। নিরক্ষর লোক গণতান্ত্রিক দেশের দায়িত্ব, অধিকার, কতনা ইত্যাদির তাৎপর্য সহজে উপলব্ধি করিতে সক্ষম হয় না। সেই জন্য সমাজের সর্বস্তরের মানুষ যাহাতে উপযুক্ত শিক্ষা লাভ করিতে পারে তাহার জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টার নিতান্ত প্রয়োজন। ভারতবর্ষের নাগরিকদের মধ্যে শতকরা ৩০ ভাগ লোক শিক্ষিত বা স্বাক্ষরজ্ঞান প্রাপ্ত। নগর অঞ্চল অপেক্ষা পল্লী অঞ্চলে নিরক্ষরতা বেশী। আবার পুরুষ অপেক্ষা নারীদের মধ্যে নিরক্ষর লোক বেশী। নিরক্ষর লোকেরা নিজের ঘরের ছেলেমেয়েদের পড়াশুনায় সাহায্য করিতে পারে না। বিদ্যালয়ে ভালভাবে শিক্ষাদান করা সম্ভব না হওয়ায় নিরক্ষর দরিদ্র ব্যক্তিদের ছেলেমেয়েদের নীচু শ্রেণীতে পড়ার সময়েই বিদ্যালয়ের পড়া বন্ধ হইয়া যায়। এইভাবে নিরক্ষর লোকের সংখ্যা সমাজে বাড়িতে থাকে।

নিরক্ষরতা দূরীকরণে ব্যবস্থা গ্রহণ : বর্তমান ভারতে যে সকল সমস্যা জাতীয় জীবনের উন্নতির পক্ষে অন্তরায় হইয়া দাঁড়াইয়াছে নিরক্ষরতা তাহাদের মধ্যে অন্যতম। ভারত সরকার সর্বভারতীয় নিরক্ষরতা দূরীকরণের জন্য বিশেষ কিছু প্রকল্প হাতে লইয়াছেন। ভারতের সংবিধানে ১৯৬০ সালের মধ্যে ১৪ বৎসর বয়স পর্যন্ত সমাজের সর্বস্তরের মানুষের ছেলে-মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রকল্প গ্রহণ করিয়াছিলেন। যদিও নানা কারণে এই প্রকল্প যথাযথভাবে রূপায়ণ করা সম্ভব হয় নাই তথাপি ইহার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করা হইতেছে। যেই সকল গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় নাই সেই সকল গ্রামে বিদ্যালয় গৃহ নির্মাণ ও শিক্ষক নিযুক্তির ব্যবস্থা করিয়াছেন। প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার ব্যবস্থাও করা হইয়াছে। বর্তমানে ভারত সরকার সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি করার জন্য “সর্বশিক্ষা অভিযান মিশন” নামে একটি ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছেন। এই ব্যবস্থাকে রূপায়িত করার জন্য আসামের “জ্ঞান বিজ্ঞান” সমিতি ইহার বহুলভাবে প্রচারে নামিয়াছে। কিন্তু ভারতের নিরক্ষরতা দূরীকরণে শুধুমাত্র সরকারী প্রচেষ্টাই যথার্থ নহে। ইহার জন্য চাই ছার সমাজের একান্ত প্রচেষ্টা।

নিরক্ষরতা দূরীকরণে ছাত্র সমাজের ভূমিকা : ভারতবর্ষ একটি বৈচিত্র্যময় দেশ। এখানে বৈষম্যও রহিয়াছে যথেষ্ট। এখানকার সমাজে দারিদ্র্য, অশিক্ষা, স্বাস্থ্যহীনতা ও কুসংস্কার আজও ভীষণভাবে প্রকট। সকল প্রকার সমস্যা দূরীকরণে একমাত্র সরকারী নগণ্য প্রয়াসই যথেষ্ট নহে। এই সকল সমস্যা দূরীকরণের জন্য চাই সমাজের স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, সমাজসেবী প্রতিষ্ঠান ও ছাত্র সমাজের সচেতনতা। দেশের আপৎকালীন পরিস্থিতিতে দেশের প্রাণোচ্ছল ত্যাগৱতী ছাত্রসম্প্রদায় যুগে যুগে নানা সমাজকল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণ করিয়া আসিতেছে। তাহারা এখনও এই সকল কাজে পিছাইয়া নাই। ভারতের প্রায় ৭০ শতাংশ নিরক্ষর মানুষ শিক্ষাহীনতার অভিশাপে আক্রান্ত, দেশের ত্যাগৱতী ছাত্রসম্প্রদায় নিজেদের বিদ্যাচর্চার অবসরে গ্রামে ও শহরের প্রতাস্ত

বস্তিতে নৈশ বিদ্যালয়, বয়স্ক শিক্ষার বিদ্যালয় পরিচালনা করিয়া নিরক্ষরতা দূর করিতে পারে। স্বল্প শিক্ষিতদের হাতের কাজ ও কুটির শিল্পের বিষয়ে উৎসাহিত করিতে পারে। সবসময়ই দেখা যায় যে সমাজ সেবায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছাত্ররাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করিয়া থাকে। সমাজের স্বার্থপর বয়স্ক মানুষ নানা কারণে দ্বিধাগ্রস্ত ও সংকুচিত। তাই দেশের তরুণ ছাত্রসমাজ তাহাদের নিষ্ঠা ও ঐকান্তিকতা লইয়া আত্মনিয়োগের মাধ্যমে নিরক্ষর দেশবাসীকে অজ্ঞতার অন্ধকার হইতে আলোকের রাজ্যে মুক্তি দানে ব্রতী হইতে পারে। ছাত্র-ছাত্রীরা যদি প্রত্যেকে প্রতি বৎসর অন্তর দুই-তিন-জন নারী-পুরুষকে সাক্ষর করিয়া তুলিতে পারে তাহা হইলে সমাজের অশেষ কল্যাণ হইবে। নিরক্ষরতা দূরীকরণে বিশেষ করিয়া বয়স্কদের শিক্ষাদানই বিশেষ কার্যক্রম। দরিদ্র পিতা-মাতা শিক্ষিত হইলেই তাহাদের সন্তানদের প্রতি বিশেষ প্রভাব পড়িবে। স্কুল ছাড়া ‘ড্রপ আউট ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষাদানে বিশেষ করিয়া ছাত্র-ছাত্রীদের আত্মনিয়োগ করিতে হইবে।

১৬। আমার প্রিয় খেলা (ক্রিকেট) বা (বিশ্বকাপ ক্রিকেট)

সূচনা : বর্তমান বিশ্বের সেরা খেলার মধ্যে হইল ক্রিকেট খেলা। তাই ক্রিকেট খেলা হইতেছে খেলার রাজা। সেইজন্য বিশ্বের সকল খেলার মধ্যে ক্রিকেট খেলাই আমার অধিকতর প্রিয় খেলা।ব্রিটিশ শ্বেতাঙ্গদের দল রাজতন্ত্রের মতো বুক দিয়া রক্ষা করিয়া চলিয়াছে খেলার রাজা ক্রিকেটকে। পৃথিবীর যে স্থানেই তাহারা গিয়াছে সেইখানেই তাহারা স্থাপন করিয়াছে উপনিবেশ।

আর সেই স্থানেই তাহারা পুঁতিয়া আসিয়াছে ব্রিটিশ রাজদণ্ডের সঙ্গে ক্রিকেটের তিনটি ‘উইকেট’আধুনিক বিশ্বে রাজতন্ত্রে উপনিবেশ প্রথার অবসান ঘটিলেও ক্রিকেটের প্রাধান্য কিন্তু কমে নাই,

বরং কালক্রমে এই খেলা আরও বেশী জনপ্রিয়তার ঊর্ধ্বে উঠিয়াছে সারা পৃথিবীতে। বর্তমান বিশ্বে তাই ক্রিকেট যে শুধু রাজার খেলা তাহা নহে ইহা এখন মজার খেলাও বটে। এই খেলা এখন আবাল বৃদ্ধ-বনিতা সকলেরই প্রিয় খেলা হইয়া উঠিয়াছে। তবে একটা কথা মনে রাখিতে হইবে যে‌ পৃথিবীর পরিবেশ ও পরিস্থিতি বদলের সঙ্গে সঙ্গে ক্রিকেটের মৌলিক চরিত্রেরও বেশ বদল হইয়াছে। আজ হইতে একশত বৎসর পূর্বে ক্রিকেট ছিল নিছক চিত্ত বিনোদনের খেলা কিন্তু সেই ক্রিকেট আজ হইয়াছে পেশাভিত্তিক জীবনের খেলা। আর তাহার সঙ্গে সঙ্গে কালের বিবর্তনের পরিবর্তন আসিয়াছে ক্রিকেট খেলার আইনের মধ্যেও।

ক্রিকেট খেলার সরঞ্জাম ও ক্রীড়া নীতি ঃ ক্রিকেট খেলার বিশেষ সরঞ্জাম হইল একজোড়া ব্যাট, ছয়টি স্টাম্প, একটি বল ও দুইটি বেঙ্গল। একটি বৃত্তাকার মাঠের মধ্যস্থলে বাইশ গজ জমিতে এক পীচকে ব্যবহার করিয়া ক্রিকেট খেলা হয়। পীচের উভয় প্রান্তে তিনটি করিয়া স্টাম্প বেঙ্গল বন্ধ করিয়া রাখা হয়। এক প্রান্তে স্টাম্পের ব্যাটসম্যান ব্যাটিং করে। অন্যপ্রাপ্ত হইতে বল করা হয়। দুইজন আম্পিয়ার পীচের দুই প্রান্তে বিচিত্র পোষাক পরিয়া খেলা পরিচালনা করেন। খেলা আরম্ভ হওয়ার প্রথমে টস’-এর মাধ্যমে কোন্ পক্ষ আগে ব্যাট করিবে তাহা স্থির করা হয়। প্রতিপক্ষে ১১ জন করিয়া খেলোয়াড় থাকেন। বোলার একসঙ্গে ছয়টি করিয়া বল করিতে পারে। ছয়টি বল নিক্ষেপ করিবার প্রক্রিয়াকে ‘ওভার’ বলা হয়। উইকেটে ‘বল’ নিক্ষিপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাটম্যান বল ব্যাটের সাহায্যে মারিয়া ‘রান’ করেন। বল ছোড়ার ভঙ্গি অনুসারে ইহাকে

নানা প্রকার নাম দেওয়া হইয়াছে। ফাস্ট, স্পিন, ইন্‌সুইং, আউট সুইং, রিভার্স সুইং, গুগলি, ফুলটাস, বাউন্সার, অফব্রেক, ইয়র্কর, নো বল, ভেড় বল এবং ওয়াইড বল ইত্যাদি। খেলোয়াড়কে “আউট করিবার পদ্ধতিকে বলা হয় যথাক্রমে ক্যাচ আউট, রান আউট, স্টাম্প আউট, বোল্ড আউট, লেগ-বিফোর উইকেট (এল. বি. ডব্লিউ) ইত্যাদি।

ক্রিকেট খেলার বিশ্বের প্রধান দল এবং খেলোয়াড়:

দল ঃ ভারত, পাকিস্তান, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, কেনিয়া, জিম্বাবোয়ে,

নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট-ইন্ডিজ, কানাডা, নামিবিয়া, স্কটল্যান্ড, বারমুডা, বাংলাদেশ, হল্যান্ডইত্যাদি। 

খেলোয়াড় : সৌরভ গাঙ্গুলী, সচীন তেন্ডুলকার, অমরনাথ, কপিলদেব, সুনীল গাভাস্কার, রবি শাস্ত্রী, বীরেন্দ্র সেহবাগ, রাহুল দ্রাবিড়, জাহির খান, আশিষ নেহেরা, আগরকার, অনিল কুলে, যুবরাজ সিং, মহম্মদ কাইফ, হরভজন সিং, মহেন্দ্র সিং ধোনি, মুনাফ প্যাটেল, শ্রীসঙ্গ, ঈশান্ত শর্মা ইত্যাদি (ভারত)।

বিশ্বের অন্যান্যরা হইলেন : ব্যাডম্যান, টনি গ্রেগ, গ্রেগ চ্যাপেল, ভিভিয়ান রিচার্ড, ইমরান খান, ব্রায়ান লারা, ক্লাইভ লয়েড, অর্জুনা রনতুঙ্গা, এস্ জয়সূর্য, অরবিন্দ ডি-সিলভা, মার্ক ওয়া, এনডি ফ্লাওয়ার, সেইন ওয়ার্ন, সোন পলক প্রমুখ বিখ্যাত খেলোয়াড়গণ ।

ক্রিকেট জগতে নানা সময়ে বিভিন্ন পরিবর্তন আসিয়াছে। ১৯৬১ সাল হইতে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ বিশ্বকাপ খেলার বা সীমিত ওভারের ক্রিকেট খেলার পূর্বে, ক্রিকেট খেলাগুলি ছিল টেস্ট খেলা। এই খেলাগুলি ছিল পাঁচদিনের খেলা, ঐ সকল খেলায় যদি প্রথম ইনিংসে কোন দলের রান সংখ্যা দ্বিতীয় দলের ‘রান’ সংখ্যা হইতে ২০০ ‘রান’ কম হইত, তবে কম রান করা দলকে ‘ফলো-অন’ খেলিতে হইত। খেলায় এই ধরনের অবস্থা দেখা দিলে যেই দল ‘ফলো-অন খেলিত সেই দলকে বেশ অসম্মানজনক পরিস্থিতির মোকাবিলা করিতে হইত।

বিশ্বকাপ ক্রিকেট : উৎসাহ, উদ্দীপনা, আনন্দদান ও উন্নত ক্রীড়াশৈলীতে ক্রিকেট খেলা আজকাল জনপ্রিয়তার শ্রেষ্ঠ ‘শিরোপা’ অর্জন করিতে সক্ষম হইয়াছে। তাই বিশেষ করিয়া সীমিত ওভারের একদিনের ক্রিকেট খেলা অর্থাৎ বিশ্বকাপ ক্রিকেট আজকের পৃথিবীতে এক বিশেষ স্থান লাভ করিয়াচ্ছে। বিশ্ব ক্রিকেট হইল ‘ইন্‌স্ট্যান্ট’ ক্রিকেট। ইহার জন্মও হইয়াছে ইংলন্ডের মাটিতেই। একদিনের খেলায় প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দলের ব্যাটিং ও বোলিং এবং জয়-পরাজয় বিশ্বের তামাম ক্রিকেট প্রেমীদের মন জয় করিয়া লইয়াছে। তাই এখন সীমিত ওভারের একদিনের খেলা বিশেষ জনপ্রিয় হইয়া উঠিয়াছে। এই প্রকার খেলায় নিয়ম-কানুনের দিক দিয়া বেশ কিছুটা পরিবর্তনও আনা হইয়াছে। বর্তমানে ‘রান’ আউট নামে বিতর্কিত আউট থার্ড আম্পায়ার টেলিভিশনের পর্ন হইতে ধীর গতিতে লক্ষ্য করিয়া আউট দিয়া থাকেন। থার্ড আম্পায়ার প্রথাটি সম্ভবত ১৯৮৭-র বিশ্বকাপ ক্রিকেট হইতে চালু হইয়াছে।

বিশ্বকাপ ক্রিকেট বা ‘প্রুডেনসিয়াল কাপ’ ক্রিকেটের শুরু হইয়াছিল ১৯৭৫ সালে। চার বৎসর অন্তর অন্তর এই ক্রিকেটের আসর বসে। প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হইয়াছিল ইংল্যান্ডে। এই খেলায় বিজয়ী হয় ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজ’ দল। অস্ট্রেলিয়ার সহিত এই ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হইয়াছিল। ১৯৭৯ সালের বিশ্বকাপ ইংল্যান্ড দলকে হারাই পুনরায় ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজ’ দল বিজয়ী হয়। ১৯৮৩

সালের তৃতীয় বিশ্বকাপ জয় লাভ করিয়াছিল, দুই-দুইবার বিশ্বকাপ বিজয়ের স্বর্ণমুকুট পরিয়া যে “ওয়েষ্ট ইন্ডিজ’ দল খেলিতে নামিয়াছিল তাহাকে হারাইয়া ‘ভারতীয় দল’। ভারতের প্রিয় ও যোগ্য খেলোয়াড় কপিলদেবের অধিনায়কত্বে ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজ’ দলকে হারাইয়া জয়ের গৌরব অর্জন করিয়াছিল ভারত। ১৯৮৭ সালের বিশ্বকাপের প্রতিযোগিতার পরিচালনার যৌথ দায়িত্ব পাইয়াছিল ভারত ও পাকিস্তান। এই খেলার চেয়ারম্যান নিযুক্ত হইয়াছিলেন এন. কে. পি. সাভে। এই খেলার ‘স্পনসর’ করিয়াছিল ভারতের এক বিখ্যাত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান “রিলায়েন্স গ্রুপ” তাই এই বিশ্বকাপ ‘রিলায়েন্স ওয়ার্ল্ড কাপ’ বলিয়া চিহ্নিত হইয়াছে। ১৯৮৭-র বিশ্বকাপ খেলা হইয়াছিল। পঞ্চাশ ওভারের ভিত্তিতে। ইহার পূর্বে বিশ্বকাপগুলি হইয়াছিল নির্ধারিত ষাট (৬০) ওভারের ভিত্তিতে। টেলিভিশন কোম্পানীর সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করিয়া খেলাগুলি ৫০ ওভারে সীমায়িত করা হইয়াছিল। ১৯৮৭ সালের বিশ্বকাপ বিজরী হইয়াছিল ইংল্যান্ডকে হারাইয়া অস্ট্রেলিয়া’ দল। ১৯৯২ সালের পঞ্চম বিশ্বকাপ পায় আমাদের প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান। ঐ খেলায় তাহারা ইংল্যান্ড দলকে হারায়। ১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপের উদ্যোক্তা ছিল যৌথভাবে ভারত-পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। ঐ খেলায় অস্ট্রেলিয়া দলকে হারাইয়া শ্রীলঙ্কা দল বিজয় মুকুট লাভ করিয়াছিল। সপ্তম বিশ্বকাপ পাকিস্তানকে হারাইয়া অস্ট্রেলিয়া দল লাভ করিয়াছিল ১৯৯৯ সালে। অষ্টম বিশ্বকাপ ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়া ও ভারত ফাইনাল খেলায় অবতীর্ণ হইয়াছিল। সাউথ আফ্রিকার

জোহান্সবার্গে ফাইনাল খেলায় ভারতকে হারাইয়া অস্ট্রেলিয়া দল বিজয়ীদলের সম্মানজনক মুকুট লাভ করিয়াছে। এই নিয়ে তিনবার বিজয় মুকুট অর্জন করিল এই অস্ট্রেলিয়া। ২০০৭ সালে নবম বিশ্বকাপ অষ্ট্ৰেলিয়া বিজয়ী হইয়াছে।

অতএব গ্রন্থাগার যেমন প্রয়োজন গ্রন্থপাঠও তেমনি প্রয়োজন। উভয়ই উভয়ের পরিপূরক। মানবজীবনে অধিকার ও কর্তব্য যেমন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত তেমনি গ্রন্থাগার ও গ্রন্থপাঠ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। প্রত্যেক মানুষের উভয়ের বিষয়ে সবিশেষ আগ্রহী হওয়া উচিত। কারণ গ্রন্থাগার ও গ্রন্থপাঠে মানুষ আগ্রহী হইলে দেশ উন্নত দেশে রূপান্তরিত হইবে, জনসাধারণও উন্নত মানের হইবে। ইহাদের ধ্বংসে দেশ, জাতি মানব সভ্যতা ধ্বংস হইবে।

ক্লাস 9 বাংলা প্রশ্নের উত্তর

S.L. No.Group A সূচীপত্র
পাঠ ১গৌরাঙ্গের বাল্যলীলা
পাঠ ২খাই খাই
পাঠ ৩ধূলামন্দির
পাঠ ৪কবর
পাঠ ৫মনসামঙ্গল
পাঠ ৬প্রত্যুপকার
পাঠ ৭ছুটি
পাঠ ৮ডাইনী
পাঠ ৯পিপলান্ত্ৰি গ্ৰাম
পাঠ ১০অ্যান্টিবায়ােটিক ও পেনিসিলিনের কথা
পাঠ ১১লড়াই
পাঠ ১২আমরা
পাঠ ১৩আগামী
পাঠ ১৪আত্মকথা
পাঠ ১৫ভারতবর্ষ
পাঠ ১৬ব্যাকরণ
পাঠ ১৭রচনা
S.L. No.Group B সূচীপত্র
বৈচিত্রপূর্ণ আসাম
পাঠ ১আহােমগণ
পাঠ ২কাছাড়ের জনগােষ্ঠী
পাঠ ৩কারবিগণ
পাঠ ৪কোচ রাজবংশীগণ
পাঠ ৫গড়িয়া, মরিয়া ও দেশীগণ
পাঠ ৬গারােগণ
পাঠ ৭সাঁওতালগণ
পাঠ ৮চা জনগােষ্ঠী
পাঠ ৯চুটিয়াগণ
পাঠ ১০ঠেঙাল কছারিগণ
পাঠ ১১ডিমাসাগণ

১৭। মাদার টেরেসা মহীয়সী মহিলা

সূচনা : ‘জীবন যখন শুকায়ে যায়, করুণাধারায় এসো’—রবীন্দ্রনাথ। বিংশ শতাব্দীর দয়াহীন, ভালোবাসাহীন বিশুষ্ক মরু প্রান্তরে যিনি মূর্তিমতী স্নিগ্ধশীতল করুণাধারার মতো নেমে এসে পৃথিবীকে সুন্দর করে তুলেছেন তিনি সর্বজন বন্দনীয় মাদার টেরেসা। তিনি নিরাশ্রয়কে দিলেন আশ্রয়, রোগাএঁকে দিলেন ঔষধ পথ্য ও সেবা, আশাহীনকে দিলেন আশা এবং অবহেলিত মুমুর্ষু রোগীকে দিলেন সম্মানজনক মৃত্যুর অধিকার।

জন্ম : ১৯১০ খ্রিস্টাব্দের ২৭শে আগস্ট যুগোশ্লাভিয়ার স্কোপজে শহরের এক অ্যালবেনীয় দম্পতির ঘরে মাদার টেরেসা জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর বাল্যকালের নাম ছিল অ্যাগনেস গংক্সা বোজাক্সিউ।

মানবতার ডাক ঃ কিশোরী অ্যাগনেস্ শুনেছিলেন আর্তমানুষের ক্রন্দনধ্বনি। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে ঘর ছেড়ে বিশ্বের আর্ত-পীড়িত দীন-দুঃখীদের সেবায় নিজেকে নিবেদন করলেন। কলকাতা হোল তাঁর সাধনার কেন্দ্রস্থল।

কর্মজীবন ঃ সেন্ট মার্গারেট স্কুলের ভূগোল শিক্ষয়িত্রী কেবল শিক্ষাদন রতেই নিজেকে তৃপ্ত করতে পারেন নাই। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে ১০ই সেপ্টেম্বর দার্জিলিং যাবার পথে তিনি সহসা শুনতে পেলেন বিশ্বের লক্ষ কোটি ক্ষুধার্ত, অসহায় শিশুর কাতর আহ্বান। নীলপাড়ের সাদা সুতীর শাড়ি পরিধান করে তিনি জীবনের মহাব্রত উদযাপনে দুঃখের মহাসমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে গঠিত হলো ‘মিশনারিজ অব চ্যারিটি। ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে কালীঘাটে স্থাপিত হলো নির্মল হৃদয়।’ যেখানে অসহায় মুমূর্ষু মানুষ পেয়েছে করুণাময়ীর স্নেহচ্ছায়া। তারা পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও সেই মৃত্যু হয়েছে প্রীতিস্নিগ্ধ। অনাথ শিশুদের জন্য স্থাপন করেছেন “নির্মল শিশুভবন” যেখান থেকে তারা ফিরে পেয়েছে জীবনের আলো। শুধু কলকাতা বা ভারতবর্ষেই নয় সর্বত্র তিনি তাঁর কর্মজাল বিস্তৃত করেছেন। পৃথিবীতে যার কেউ নেই, কিছু নেই তার জন্য ছিলেন মাদার টেরেসা। সমাজস্বজন পরিত্যক্ত কুষ্ঠরোগীদের জীবনে শান্তির বারি সিঞ্চিত করেছেন। স্নেহ-মমতা ও মানবিকতা মণ্ডিত হৃদয় নিয়ে দুহাত বাড়িয়ে তিনি তাদের আহ্বান করতেন “এসো এসো, আমার ঘরে এসো”। তিনি বলতেন, ঘৃণা নয় সেবা, ভালোবাসা একজন কুষ্ঠরোগীকেও সুস্থ জীবনের কূলে ফিরিয়ে নিয়ে এসে সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারে। “Touch a leaper, touch him with love.” এখানেই স্নেহময়ী জননীর স্নেহের সীমাহীনতা।

স্বীকৃতি : ‘পরিশ্রম কখনই বিফলে যায় না’—মাদার টেরিসার জীবনে একথা চরম সত্য হয়েছিল। বিশ্বের দিক্-দিগন্ত থেকে এলো তাঁর শুভকর্মের স্বীকৃতি। অবশ্য মাদার টেরেসা নাম বা যশের জন্য কাজ করেননি। অন্তরের তাগিদে দুঃস্থ, অসহায়ের পাশে দাঁড়িয়ে অক্লান্ত সেবা করে আত্মতৃপ্তি পেয়েছেন। ভারত সরকার তাঁর কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ “পদ্মশ্রী” উপাধিতে ভূষিত করেছেন। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে তিনি পেয়েছেন “পোপ ত্রয়োবিংশ শান্তি পুরস্কার।” “গুড সামারিটান পুরস্কার”, “কেনেডি আন্তজার্তিক শান্তি পুরস্কার”, “ডক্টর অব হিউম্যান লেটার্স” উপাধিতেও তিনি ভূষিত হয়েছেন। ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে তিনি পেয়েছেন “নেহরু পুরস্কার”। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি পেলেন “টেম্পেলটন ফাউণ্ডেশন প্রাইজ ফর ইন্টারন্যাশনাল আণ্ডারস্ট্যান্ডিং।” ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে পেলেন “নোবেল পুরস্কার”। ১৯৮০ সালে ভারত সরকার তাঁকে ভূষিত করেন “ভারত রত্ন” উপাধিতে।

উপসংহার : আজ বিংশ শতাব্দীর অপরাহ্নে মানবতার দিক থেকে মানুষ যে সম্পূর্ণ দেউলে হয়ে যায়নি মাদার টেরেসা তাই প্রমাণ করলেন। ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দের ৫ই সেপ্টেম্বর সমস্ত বিশ্বকে মাতৃহারা করে মাদার টেরেসা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সমস্ত জীবনের অক্লান্ত পরিশ্রম শেষে “আমি আর নিঃশ্বাস নিতে পারছি না” বলেই মাদার টেরেসা চিরশান্তির কোলে ঢলে পড়লেন। চোখের জলে সারা বিশ্বমানবের কণ্ঠের হাহাকারধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে। “অনাথ করলে তুমি মোদের হে বিশ্বজননী।”

১৮। ছাত্রজীবন

বিদ্যালয়ের প্রবেশ মুহূর্ত হইতে শিক্ষা সমাপ্তি পর্যন্ত জীবনের যে সময় ব্যয়িত হয় তাহাই ছাত্রজীবনের সংজ্ঞা। শৈশব কালই মানবজীবনে প্রবেশের সিংহদ্বার। জীবনের এই পরম লগ্নের যথোপযুক্ত ব্যবহার করিলে মনুষ্যত্বের অধিকারী হইতে পারা যায়। “ছাত্রানাং অধ্যয়নং তপঃ।” অধ্যয়নই ছাত্রের তপস্যা। মানব জীবনে সোনা ফলাইতে হইলে ছাত্রজীবন হইতে গভীর অধ্যয়নের প্রয়োজন। “পাঁচজন পারে যাহা, আমিও পারিব তাহা” এই প্রত্যয় ছাত্রের অন্তরে নিহিত থাকিতে হইবে। মানব জীবনের সকল পাঠই এই সময়ে গ্রহণ করিতে হয়। জীবন যুদ্ধের সৈনিক সকলে। এই জীবন যুদ্ধে বিজয়ী হইতে হইলে পাঠ্যপুস্তক ছাড়াও সমাজ, পরিবেশ ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করিতে হইবে। প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জনের প্রস্তুতি কাল ছাত্রজীবন। মাটি যখন নরম থাকে তখন তাহা দ্বারা যাহা খুশী তৈয়ারি করা যায় সেইরূপ ছাত্রজীবনে সাংসারিক মালিন্যযুক্ত হৃদয়পট কুসুম-কোমল থাকে বলিয়া যে কোন পাঠ অক্লেশে গ্রহণ করিতে পারা যায়।

শৃঙ্খলাবোধঃ প্রতিটি কর্মের মধ্যে আছে একটি সুশৃঙ্খল ধারাক্রম, যার নাম ছন্দ। সেই ছন্দই শৃঙ্খলা, সেই ছন্দই সাফল্যের চাবিকাঠি। শৃঙ্খলাবোধ ও নিয়মানুবর্তিতা ব্যতিরেকে জীবনের বিকাশ হওয়া সম্ভব নয়। ভারতের বৈদিক সমাজ ছাত্র-জীবনে কঠোর ব্রহ্মচর্য পালনের নির্দেশ দিয়াছিল। ছাত্রদের প্রতিটি কর্মই নিয়মানুবর্তিতা মানিয়া গুলিতে হয়।

শিষ্টাচার, সাধুতা, নম্রতা, কর্তব্যপরায়ণতা, ভক্তি পরায়ণতা ছাত্রদের এক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। কেবলমাত্র উচ্চশিক্ষাই মানুষকে প্রকৃত মানুষরূপে পরিগণিত করিতে পারে না যদি তাহার চরিত্রে এই গুণাবলীর অভাব দেখা যায়। পিতামাঅব আশা-আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করিবার জন্য এই সময় হইতেই সচেষ্ট থাকিতে হয়। গৃহে পিতা-মাতা ও বিদ্যালয়ে শিক্ষক ছাত্রগণের প্রকৃত হিতৈষী, বিশাল পৃথিবীতে নিজের স্থান নির্ণয়ে তাঁহারা যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। শ্রদ্ধা, ভক্তি, বিনম্র ব্যবহার ছাত্রকে উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করিতে সাহায্য করে। কিশোর ছাত্রের নমনীয় মনোভূমিতে এই সব গুণ একবার মুদ্রিত হইলে আমৃত্যু তার চরিত্র মাধুর্য সর্বত্রজয়ী থাকিবে।

ছাত্রগণ সমাজেরই অঙ্গ। সুতরাং সমাজের প্রতিও তাদের দায়বদ্ধতা থাকা উচিত। অধ্যবসায়ের সাথে সাথে সাধ্যানুসারে দুর্গতদের সেবায় কাপাইয়া পড়া উচিত। ভবিষ্যৎ জীবনে ছাত্র যখন বিস্তৃততর কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করিবে এই মানবহিতৈষিতাই তাহাকে বৃহত্তর কল্যাণ কর্মে প্রেরণা দিবে।

“ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুদের অন্তরে।” আজকের ছাত্র ভবিষ্যতে নাগরিক। তাহারা রাষ্ট্রনেতা হইবে, আদর্শবান শিক্ষক হইবে, রণক্ষেত্রে দাঁড়াইয়া বন্ধুকণ্ঠে সৈনা পরিচালনা করিবে, ছাত্রদের এই সুপ্তি মগ্ন চৈতন্য সযত্ন প্রয়াসে জাগ্রত করিতে হইবে। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া ছাত্রের কেবলমাত্র মুখ্য উদ্দেশ্য নয়, শুভ লক্ষে পৌঁছাইবার একটি উপায় মাত্র। পুঁথিগত শিক্ষা লাভের সহিত জীবনের অন্যান্য পাঠগুলি আয়ত্ত করিতে না পারিলে সুপ্তি ভঙ্গ হয় না, জীবন সার্থক ও সুন্দর হইয়া উঠে না।

ছাত্র জীবনই হইল ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য নিজেকে সুযোগ্য করিয়া গড়িয়া তোলার প্রকৃষ্ট সময়, দায়িত্ববোধের বিকাশের কাল, সামাজিক কতববোধে দীক্ষিত হইবার পরম লগ্ন। তাই ছাত্রদের একথা মনে রাখা উচিত যে, “জীবনের পরম লগন, কোরনা হেলা।”

১৯। বইমেলা

সূচনা : মেলা কথাটির আক্ষরিক অর্থ হইল ‘মিলন’। মেলার কয়েকটি মৌলিক দিক রহিয়াছে; যেমন—মানসিক মিলন, সামাজিক মিলন ও অর্থনৈতিক মিলন। আর বইমেলা প্রকৃতপক্ষে সংস্কৃতির ভাব বিনিময়ের মিলনকেন্দ্র। মানসিক দিক হইল ভাব-চিন্তা ও আদর্শের লেনদেন। মেলার সামাজিক দিক হইল পরস্পরের সহিত সম্মিলন ও সৌহার্দ্যের আবাহন। ইহার অর্থনৈতিক দিক হইল গ্রামীণ পণ্যসম্ভার ক্রয়-বিক্রয়। ভারতবর্ষে অতি প্রাচীন কাল হইতেই এই সকল মেলার আয়োজন বিভিন্ন। উদ্দেশ্যে আয়োজিত হইয়াছে। বিভিন্ন স্তরের মানুষের ভাবের আদান-প্রদান, সামাজিক উৎকর্ষ, মানস-প্রকর্ষ ও স্থায়ী বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপনের প্রকৃষ্ট উপায়ই হইল মেলা। মেলা অনেক প্রকারের হয়; যেমন—পৌষ মেলা, শিল্প মেলা, কৃষি মেলা, বাণিজ্য মেলা, চড়কের মেলা, রথযাত্রার মেলা; কিন্তু বইমেলার আবেদন একটু অন্য স্বাদের। এখানে লেখক, সাহিত্যিক, পাঠক, ছোট ছোট শিশু- কিশোর; তাদের মনের বিভিন্ন দিকের খোরাক মিটাইতে বইমেলায় আসে। এখানে প্রকৃতপক্ষে সংস্কৃতির ভাব বিনিময় হয়। এখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দিকের জ্ঞান ভাণ্ডারের পরিচয় মিলে। বইমেলা আধুনিক কালের জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনুশীলনের জ্ঞানপীঠ।

উদ্ভব : যতদুর জানা যায় বইমেলা প্রথম শুরু হয় ১৮০২ খ্রীষ্টাব্দে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে। এই বইমেলার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন ম্যাথু কেরী নামে এক ব্যক্তি। ১৮৭৫ খ্রীষ্টাব্দে ১০০ জন প্রকাশক মিলিয়া নিউইয়র্কের ক্লিন্টন শহরে বিরাট এক বইমেলার আয়োজন করিয়াছিলেন। এই মেলায় প্রায় ত্রিশ হাজার গ্রন্থ প্রদর্শন করা হইয়াছিল। তবে আধুনিক বইমেলার সূচনা হইয়াছিল। ১৯৪৯ খ্রীষ্টাব্দের ফ্রাঙ্কফুটের সর্ববৃহৎ বইমেলা হইতেই। তখন হইতেই পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই বইমেলার জোয়ারে মানুষ মাতিয়া উঠিয়াছে।

ভারতবর্ষে সর্বপ্রথম বইমেলার সূত্রপাত হয় ১৯৬৩ খ্রীষ্টাব্দে কলিকাতায়। এই মেলার মাধ্যমে। বায়ালী জাতি বঙ্গ সংস্কৃতির সম্মিলনের অঙ্গ হিসাবে পশ্চিমবঙ্গের জ্ঞানপিপাসু ও গ্রন্থপ্রে মানুষকে ভাব বিনিময়ের মিলনতীর্থে আনিয়া জড়ো করিয়াছিলেন। ১৯৬৯ সালে বোম্বাই (বর্তমানে মুম্বাই) শহরে প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ বইমেলার আয়োজন করা হইয়াছিল। পরবর্তী সময়ে ভারতের রাজধানী দিল্লীতে বইমেলা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের রূপ লয় ।

গৌহাটিতে প্রতিবছর সর্বভারতীয় পর্যায়ে দুইখানি বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। আসামের প্রতি জিলাতে স্থানীয় উদ্যোগে বইমেলা আয়োজিত হয়।

প্রয়োজনীয়তা ঃ বইমেলা সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মনের ‘মিলন’ মেলা। এই মেলাতেই একমাত্র দেখা যায় ধনী-দরিদ্র একই সঙ্গে নানাপ্রকার বইয়ের খোঁজে ছেলেমেয়ে লইয়া স্টলে স্টলে ঘুরিয়া বেড়ায়। প্রতিটি স্টলের সাজসজ্জা ও বৈচিত্র্যের অভাব নাই। প্রতিটি স্টলেই সাজানো থাকে নানা প্রকারের দেশ-বিদেশের বই। প্রতিটি বই পাঠককে অলক্ষ্যে অদৃশ্য হাতছানিতে কাছে টানিয়া লইতে চায়। সাজাইয়া রাখা বইগুলির সামনে দাঁড়াইয়া যেন মনে হয়, যদি সম্ভব হইত তবে সবগুলি বই কিনিয়া লইয়া বাড়ী চলিয়া যাইতাম। বইমেলাতে শুধু পাঠকই নয়, সেইখানে উপস্থিত থাকেন লেখক লেখিকা, নানা বিষয়ের জ্ঞানীগুণী শিল্পীগণ। আর ছোটদের ভিড়ে তো বইমেলা খুবই জমিয়া উঠে।

আমাদের জাতীয় জীবনে এবং সমাজ জীবনে বইমেলার প্রয়োজনীয়তা বলিয়া শেষ করা যাইবে না। মানুষের মনের খোরাক অনুযায়ী বইমেলা বই নির্বাচনের এক আদর্শ স্থান। শুধু গল্প- উপন্যাস-এ্যাডভেঞ্চারই নহে, বিভিন্ন ধরনের ভ্রমণ কাহিনী, বিজ্ঞান-ভিত্তিক রচনা, চিত্রাঙ্কনের বই, ফটোগ্রাফ, ইঞ্জিনিয়ারিং বই ইত্যাদি সকল ধরনের বই-ই বইমেলায় পাওয়া যায়।

উপসংহার : আজকাল বইমেলা আধুনিক জীবনযাত্রার অপরিহার্য অঙ্গ হইয়া পড়িয়াছে। এই বইমেলা বর্তমানে প্রকাশকদের ব্যক্তিগত উদ্যোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হইয়া পড়িয়াছে। ফলে ইহার মাধ্যমে ব্যাপক লোকশিক্ষার সম্প্রচারের দিকটি অবহেলিত হইতেছে। এই বইমেলাকে সরকারী উদ্যোগে ছড়াইয়া দিতে হইবে দূর হইতে দূরতম প্রান্তে। সাধারণ মানুষের জন্য সুলভ মূল্যে বই বিক্রির ব্যবস্থা রাখিতে হইবে। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে বইমেলার উদ্দেশ্য ছড়াইয়া দিতে পারিলে ইহার সর্বাঙ্গীন বিকাশ সম্ভব হইবে।

২০। তোমার প্রিয় উৎসব (বিহু)

প্রতিটি জাতীর-ই একটি নিজস্ব জাতীয় উৎসব আছে। ইহার মধ্যদিয়া ঐ জাতীর নিজস্ব ভাবধারা, আচার-ব্যবহার, চাল-চলন, রীতি-নীতি, খাদ্য-পোষাক প্রভৃতি সকল দিকের এক সার্বিক পরিচয় পাওয়া যায়। 

জাতীয় উৎসবই হইল জাতীর দর্পণস্বরূপ। ইহার মাধ্যমে জাতীর সাংস্কৃতিক জীবনের সামগ্রিক পরিচয় স্পষ্ট হইয়া উঠে। উৎসবের দিনেই প্রাত্যহিকতার মালিন্য দূর করিয়া আত্মপরায়ণ জীবনের সংকীর্ণ গণ্ডী হইতে মুক্ত হইয়া বৃহত্তর কল্যাণের ক্ষেত্রে মানুষ মিলিত হয়। 

আমি আসাম প্রদেশের বাসিন্দা তাই আমার প্রিয় উৎসব হইল বিহু উৎসব। বিহু উৎসব আসামের বসন্ত উৎসব। আসামের বিহু উৎসব কল্যাণ ও মিলনের বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। বিহু উৎসব ব্যাপকতা ও বৈচিত্র্যে, আড়ম্বর ও আনন্দ-কোলাহলে বাংলাদেশের দুর্গোৎসব এবং দক্ষিণ ভারতের পোঙ্গল উৎসবের সহিত তুলনীয়। বিহু উৎসব মূলতঃ কতু-উৎসব। ঋতুর আগমনে প্রকৃতির রাজ্যে যে-রূপ রূপান্তর আসে, তাহা মানুষের মনে সহতারিত করিয়া আনে নব নব ভাব-রসের পুলক বন্যা। বিহু উৎসবের সূচনা হয় বৎসরের শেষদিন অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তিতে। জীর্ণ পুরাতনকে বিসর্জন দিয়া নবীনের প্রাণময় আবির্ভাবের কামনাই হইল বিহু উৎসবের ভিত্তি। বিহু মূলতঃ সৃষ্টি কামনার উৎসব। বিহু তিন প্রকার—কঙ্গালী বা কাতি-বিহু, ভোগালী বা মাঘ বিহু, রঙ্গালী বা বহাগ বিহু। প্রকৃত পক্ষে রঙ্গালী বিহু উৎসব বর্ণাঢ্য আনন্দ-লীলা-বিলাসের উৎসব। এই সময় উৎসবমত্ত তরুণ-তরুণীরা ‘বিহু-বলিয়া’ – বিহুপাগল হয়। তাহারা ঢোল, বাঁশী ও পেপার মনমাতানো সুরে আকাশে-বাতাসে এক অনবদ্য খুশি-তরঙ্গ তোলে। বাজনার তালে তালে চলে নৃত্য। লাল রঙের মেখলা পরিহিতা তরুণীরা প্রণয়ী যুবকের বাঁশী ও পেপার রাজনার ছন্দে যখন নৃত্য চঞ্চল হইয়া উঠে তখন সত্যই মনোমুগ্ধকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এককথায় বলা যায় তখন সমগ্র আসাম যেন ঢোলের বোলে আর পেপা বাঁশির সুরে এক আনন্দঘন উৎসবের উল্লাসে জাগিয়া উঠে।

নাচিবার জন্য যুবক-যুবতীরা দলে দলে চলে বিহুতলীতে। লোকনৃত্য ও লোক-সঙ্গীতে আসাম বিশেষভাবে সমৃদ্ধ। বহাগ বিহু মূলতঃ নৃত্যগীত ও ভোজন-উপহারের অনুষ্ঠান। আসামের প্রতিটি গৃহেই বহাগ বিহুর নৃত্যগীতের আয়োজন হয়। আসামের ডেকা-গাভরু গণ তখন পুরাতনের জড়িমা ত্যাগ করিয়া নুতনের মন্ত্রে উদ্দীপিত হইয়া উঠে স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণোচ্ছল আবেগ এবং অনুভূতিতে। বিহুনৃত্য-গীত সমগ্ৰ অসমীয়া সমাজের যৌথ সৃষ্টি। বিহু সঙ্গীত কোনো এক কবির রচনা নয় কিন্তু ইহা উৎকৃষ্ট কবি কর্মের প্রশংসার দাবি রাখে। উৎসব স্মৃতিকে অক্ষয় করিয়া রাখার জন্য একে অপরকে স্বহস্তে তৈরী ‘গামছা’ উপহার দেওয়ার আছে। বিহু উৎসব শুধু নর-নারীর জীবনেই সীমিত থাকে না, ঐ দিনে গৃহপালিত পশুগুলির প্রতিও যত্ন নেওয়া হয়। মাঘমাসের বিহুকে বলে ভোগালী বিহু। এই সময় ঘরে ঘরে পিঠা-পুলি বানানো হয় এবং খাওয়া-দাওয়ার প্রতি বেশী জোর দেওয়া হয়। বিহুর পূর্বের দিনটিকে উরুকা বলা হয়। ঐ দিনই খর-কুটার ঘর বা মেজী ঘর পোড়াইয়া অশুভ শক্তির নাশ করিয়া নদীতে বা পুকুরে স্নান করিয়া নতুন জামা-কাপড় পড়া হয় ।

 আসামের বিহুগীত পরম বিস্ময়ের বস্তু। আসামকে যদি সভ্য জগৎ মনে রাখে, তবে তাহার বিহু নৃত্য ও বিহু-সঙ্গীতের স্বাতপুমণ্ডিত মাধুর্যের জন্যই মনে রাখিবে।

২১। মানব কল্যাণে বিজ্ঞান

আদিমকালে মানুষ প্রকৃতিকে ঈশ্বর বলিয়া মানিত, অসাধ্য সকল কিছুতেই তাহারা ঈশ্বরের অস্তিত্ব অনুভব করিত। পরবর্তীকালে ‘বাইবেল’, ‘বেদ’ প্রভৃতি ধর্মগ্রন্থ তাহাদের নিয়ন্ত্রণ করিতে লাগিল। বৈজ্ঞানিক কোন আবিষ্কারকে সেই যুগের মানুষ সর্বান্তঃকরণে গ্রহণ করে নাই; যাহার ফলে গ্যালিলিও, সক্রেটিসের মতো বিজ্ঞানীকেও শাস্তি পাইতে হইয়াছিল। কিন্তু বিজ্ঞানের বিজয়- যাত্রার ফলে অসহায় মানুষ আজ অসীম শক্তিধর মানুষে রূপান্তরিত হইয়াছে।

আগুন ও লৌহ আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে হইয়াছে বিজ্ঞানের জয়যাত্রার ভিত্তি। তারপর মানুষ একে একে অনেককিছুই আবিষ্কার করিয়াছে। আজ বিংশ শতাব্দীর শেষপাদের মানুষ সমগ্র পৃথিবীকে, এমনকি, মহাকাশকেও করায়ত্ত করিয়াছে। প্রতিনিয়ত চলিয়াছে ইহার সাধনা, আবিষ্কৃত হইতেছে নূতন নূতন দিগন্ত।

বিজ্ঞান মানব কল্যাণে ব্যবহৃত হওয়ার জন্যই আবিষ্কৃত হয়। আদিম মানব মেঘ ও বিদ্যুতকে দেখিয়া ভয় পাইত। কিন্তু একদিন মানুষ সেই মেঘ ও বিদ্যুতকে বশীভূত করিয়া আপন কল্যাণে নিয়োজিত করিয়াছে। খরস্রোতা নদীকে বশীভূত করিয়া ঊষর মরুপ্রান্তরকে মানুষ ফসলক্ষেত্র করিতেছে। বিজ্ঞানের বলে দূর হইয়াছে আজ নিকট অদৃশ্য অনেক কিছু হইয়াছে আজ দৃশ্য ও কর্মক্ষম। আণবিক তথা পারমাণবিক শক্তিকে আপন ইচ্ছানুযায়ী মানুষ ব্যবহার করিতে শিখিয়াছে। দূরারোগ্য ব্যাধি নির্ণয়ে ও নিরাময়ে আবিষ্কৃত হইয়াছে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি তথা জীবনদায়ী ঔষধপর। শব্দ হইতেও দ্রুতগামী বিমানে চড়িয়া মানুষ আজ মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবী ঘুরিয়া আসিতে পারে। দূরদর্শনের মাধ্যমে ঘরে বসিয়াই মানুষ পৃথিবী তথা মহাকাশের যাবতীয় দ্রষ্টব্য অবলীলাক্রমে দেখিতে পাইতেছে। বহু দূরদেশে বসবাসকারী আত্মীয় বন্ধু-বান্ধবের সহিত টেলিযোগাযোগের মাধ্যমে ঘরে বসিয়া বাক্যালাপ করিতে পারিতেছে। মুদ্রণযন্ত্রের উদ্ভাবনের ফলে শিক্ষা ও জ্ঞান আজ স্থান-কাল অতিক্রম করিয়া পৃথিবীর যাবতীয় মানুষের মধ্যে নৈকট্যের সেতু রচনা করিয়া চলিয়াছে।

মানব কল্যাণে বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত যন্ত্রাদির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হইল বৈদ্যুতিক ও বাষ্পীয় যন্ত্রপাতি, বিভিন্ন যান, রেডিও, টেলিভিশন, সিনেমা, ফ্রীজ, উনান, টেলিফোন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র, রোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, মুদ্রণ যন্ত্র, কম্পিউটার ইত্যাদি।

 কিন্তু বিজ্ঞানের দানবীয় শক্তিও কম ভয়ঙ্কর নয়। মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীদের বাঁচাইয়া রাখিবার জন্য একদিকে যেমন আবিষ্কৃত হইয়াছে জীবনদায়ী ঔষধপত্রাদি অপরদিকে প্রাণিজগতকে ধ্বংসকরিবার জন্য সৃষ্টি হইয়াছে বিভিন্ন মারণাস্ত্র। মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীকে ধ্বংস করিয়া দেওয়ার মত পারমাণবিক অস্ত্র পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশের হাতে রহিয়াছে।বিজ্ঞানকে কেবল কল্যাণের জন্য ব্যবহার করিতে পারলেই জগতের মঙ্গল।

২২। জাতি গঠনে নারী সমাজের ভূমিকা

জাগো নারী, জাগো বহ্নিশিখা – কাজী নজরুল ইসলাম

নারী ও পুরুষের সম্মিলিত জনসংখ্যায় একটি জাতি গঠিত হয়। একটি জাতি তখনই সমৃদ্ধি লাভ করে যখন নারী পুরুষের মধ্যে কোন ভেদাভেদ থাকে না। বিশ্বের উন্নত দেশগুলিই ইহার প্রমাণ। বৈদিক যুগের হিন্দুসমাজে নারী মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত ছিল। পরবর্তী সময়ে নারীদের এই সামাজিক মর্যাদা বিভিন্ন কারণে যেরূপ সামাজিক-রাজনৈতিক-বিদেশী আক্রমণ, ধর্মীয় অনুশাসনের ভুল ব্যাখ্যা ইত্যাদির জন্য খর্ব হইতে থাকে। বৈদিক যুগের পরবর্তী সময়ে এবং মধ্যযুগে নারীরা সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অধিকার হইতে বঞ্চিত হয়। নারী সম্পূর্ণভাবে পিতা, স্বামী এবং পুত্রের উপর নির্ভরশীল হইয়া পরে।

উনিশ শতকে পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে নারীর অবস্থার উন্নতির জন্য বিভিন্ন প্রয়াস আরম্ভ হয়। নারী সমাজ এখন শিক্ষা-দীক্ষা, চাকরি, রাজনৈতিক অঙ্গনেও পুরুষের সমকক্ষতা অর্জন করিয়া আপন আপন যোগ্যতা প্রদর্শন করিতেছে। ঘরের দায়িত্ব ও কর্তব্যও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করিতেছে। সন্তানকে লালন-পালন করিয়া তাহাদের শিক্ষিত, আদর্শবান ও রুচিবান নাগরিক তৈয়ারী করিয়া দেশকে উপহার প্রদান করে। বিখ্যাত ফরাসী যোদ্ধা ও শাসক নেপোলিয়ান বোনাপার্ট বলিয়াছিলেন, “আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি দেব।” এই উক্তি দ্বারাই বুঝা যায় জাতি গঠনে নারীর ভূমিকা কত ব্যাপক ও গুরুত্বপূর্ণ।

একবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাষা নারী ক্রমশ প্রগতির পথে পুরুষের সহিত বিভিন্ন কর্মযজ্ঞে অংশগ্রহণ করিতেছে। তাহাদের কর্মজগতে পরিধি আজ বিস্তৃত। দশভূজার ন্যায় অবতীর্ণ হইয়া নিষ্ঠা ও যোগ্যতার সহিত কর্মস্থল এবং ঘর-সংসারের কর্তব্য সম্পন্ন করে। পুরুষের সহিত সহযোগিতা না করিলে পৃথিবীতে মানবজাতির অস্তিত্বই বিলীন হইয়া যাইত। জীবনের সর্বস্তরে নারী জাতি শরিক হইয়া জাতিকে উন্নতির পথে লইয়া যাইতেছে।

রাষ্ট্রসংঘের নির্দেশে ১৯৭৫-১৯৮৪ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক নারীবর্ধরূপে পালিত হইয়াছে। প্রদীপের তলায় যেরূপ অন্ধকার সেইরূপ আজ একবিংশ শতাব্দীতেও সমাজে নারীর মূল্যায়ন সঠিকভাবে হয় না। তাহারা অপরকে আলোকিত করিতে করিতে একসময় নিজেরা নিঃশেষ হইয়া যায়। বৃহত্তর নারী সমাজ আজও অশিক্ষা, অপুষ্টি, শারীরিক নির্যাতন, মানসিক নির্যাতনের শিকার।

এত উদ্যোগ গ্রহণের পরও কোথায় যেন ফাঁক থাকে এবং সেই ফাঁকের চোরাপথে নারী নির্যাতন অবাধে চলিতেছে।

দেশের প্রত্যেক কর্মকাণ্ডে নারী জাতিকে অংশীদার করিয়াই একটি জাতি, একটি দেশ মর্যাদাশীল দেশ বা জাতি হিসাবে বিশ্বে মাথা উঁচু করিয়া দাঁড়াইতে পারে। পরিশেষে কবির ভাষায় বলা যায়- “না জাগিলে বুঝি ভারত-ললনা, এ ভারত বুঝি জাগে না, জাগে না।”

২৩। তোমার প্রিয় কৰি

আমার প্রিয় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাহার কাব্যে ব্যথাহত পাইবে ব্যথা বিজয়ের প্রের দার্শনিক পাইবে প্রকৃত সত্যের সন্ধান, মৃত্যুপথযাত্রী পাইবেন মৃত্যুঞ্জয়ী সান্ত্বনা। এক কথায়, রবীন্দ্রনাথ আমাদের সত্বার সহিত জড়াইয়া আছেন ।

ইংরাজী ১৮৬১ সালের ৭ই মে কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে রবীন্দ্রনাথ জন্মগ্রহণ করেন। তেরো বছর বয়সে তাঁহার কাব্য উদ্যানে আরম্ভ হয় কাব্য-কুসুমের বসন্ত উৎসব। যৌবনের প্রথম প্রভাতে তাহার হাদয়ের নিবিড় বেদনার সংগীতের যে উৎসমুখ বুলিয়া গিয়াছিল, তাহার মর্মর কলতানে ঝংকৃত হইয়া উঠিল সন্ধ্যা সংগীত, প্রভাত সংগীত, ছবি ও গান, কড়ি ও . কোমল, ভানুসিংহের পদাবলী, মানসী ও সোনার তরী। চিত্রা, চৈতালী কথা ও কাহিনী, নৈবেদ্য। খেয়ার ফসলে এই সোনার তরী বোঝাই হইল। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে গীতাঞ্জলির ইংরাজী অনুবাদের জন্য তিনি সাহিত্যে লাভ করেন “নোবেল পুরস্কার” তাহার পর, বলাকা, পলাতকা, পূরবী, মলুয়া, পুনশ্চ, পত্রপুত্র এবং শ্যামলীর ধারা বহিয়া তাহার কাব্যতরী জন্মদিনেও শেষ লেখার মধ্য দিয়া দিগন্তের অন্তরালে উধাও হইয়া গিয়াছে।

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন পৃথিবীর কবি, মানুষের কবি। এত বিশাল মাপের কবি যখন আত্মসরূপ উদ্ঘাটন করিয়া আক্ষেপ করিয়া বলেন— 

“আমার কবিতা / জানি আমি,

গেলেও বিচিত্র পথে

হয় নাই সে সর্বত্রগামী।”

তখন শ্রদ্ধায় মস্তক অবনত হয়। শুধু স্বদেশেই নহে, পৃথিবীর যেখানে নিগ্রহের রথচক্রতলে মানুষ নিষ্পেষিত হইয়াছে সেখানেই ধ্বনিত হইয়াছে তাহার বলিষ্ঠ প্রতিবাদ। বিশ্বের সর্বত্র তিনি লাভ করিয়াছেন বিশ্বকবির উপযুক্ত সম্মান। ১৯৪১ সালের ৭ই আগষ্ট কবির জীবনাসান ঘটে। ২৫শে বৈশাখের ভাস্করসূর্য অস্তমিত হইল ২২শে শ্রাবণের নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়।

রবীন্দ্রনাথের ছিল বাল্মীকি—দেব্যাস – কালিদাসের গভীর হৃদয় এবং গোটে টলস্টয়ের সুগভীর সমাজ চেতনা। যে গভীর স্পর্শকাতরতা। নিবিড় বিশ্বাত্মবোধ এবং স্থির ঈশ্বর চেতনা তাঁহার কাব্য-কবিতাকে ত্রিবেণী সঙ্গমে স্থাপন করিয়াছে। রবীন্দ্রনাথ সকল কালের মানুষের পবিত্র তীর্থভূমি।

২৪। আসামের বন্যা ও তাহার প্রতিকার 

আসামের (বর্তমানে পরিবর্তিত নাম অসম) বন্যা আসামবাসীদের নিকট বার্ষিক অভিশাপস্বরূপ।

আসামের কোন কোন অঞ্চল প্রতি বৎসরই বন্যার প্রকোপে পড়ে, তাহার ফলে আসামবাসীদের জীবন বিপর্যয় ও দুর্দশার অন্ত থাকে না। ভারতের অন্য কোন অঞ্চল এই ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয় না, কারণ আসামের ন্যায় পার্বত্য ও নদীবহুল রাজ্য ভারতবর্ষ কমই আছে, বন্যার ফলে এই রাজ্যের নদীগুলি যে কি ভীষণ আকার ধারণ করে তাহা প্রত্যক্ষ না করিলে উপলব্ধি করা যায় না।

আসামের বন্যার প্রধান কারণ দীর্ঘতম ব্রহ্মপুত্র নদ। ইহা আসামের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত বর্তমান অরুণাচল প্রদেশ দিয়া লোহিত নামে আসামে প্রবেশ করিয়াছে। তাহাছাড়া উত্তর-পূর্ব সীমান্তের পর্বতশ্রেণীতে প্রচুর পরিমাণে তুষার সঞ্চিত হয়। বৃষ্টির সহিত গলিও তুষারস্তূপ আসামে নদ- নদীগুলির সহিত মিশ্রিত হয়। মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে আসামে বৃষ্টিপাতের পরিমাণও অধিক। অত্যধিক বৃষ্টিপাতের ফলে নদ-নদীগুলি স্ফীত হইয়া উঠে এবং উভয়তীর প্লাবিত হয়। মত্ত উল্লাসে ব্রহ্মপুত্র ও তাহার শাখানদীগুলি সমতলভূমির উপর দিয়া বহিয়া যায়। ভূমিকম্পের ফলেও ভূগর্ভের জল স্ফীত হইয়া উঠে ও উপরের জল দীর্ঘদিনের জন্য উপরেই থাকিয়া যায়।

ব্রহ্মপুত্র ব্যতীত আসামের অন্য একটি প্রধান নদী হইল বরাক। ইহা সমগ্র কাছাড় জেলাকে বন্যা কবলিত করিয়া প্রায় প্রতি বৎসরই জনগণের প্রচুর ক্ষতিসাধন করে। ৩/৪ বৎসর পূর্বে মণিপুরের নিকট বাঁধ ভাঙ্গিয়া যাওয়ায় কাছাড় জেলার বন্যার প্রকোপ বৃদ্ধি পাইয়াছিল। গ্রামাঞ্চলে প্রচুর শস্যক্ষেত্র, গোবাদি পশু বিনষ্ট হয়। শতাধিক মানুষের প্রাণহানি হয়। অসংখ্য লোক গৃহহারা হইয়া শহরাঞ্চলে বন্যাত্রাণ শিবিরে আশ্রয় গ্রহণ করে। শহরাঞ্চলেও যে সমস্ত অঞ্চল নিচু তাহাতেও বন্যার জল গৃহের চাল পর্যন্ত নিমগ্ন করিয়াছিল।

আসামের কন্যার ফলে আসামবাসীরা প্রতিবৎসরই যে এত দুঃখকষ্টের সম্মুখীন হয়, কিন্তু তাহা হইতেও কিভাবে রক্ষা পাওয়া যায় ইহার কারণ অন্বেষণে কেহই যত্নবান নহে। তবে কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকার আসামের বন্যা নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি পরিকল্পনা গ্রহণ করিয়াছে। তাহারা ব্রহ্মপুত্র নদীতে বাঁধ দিয়া ইহার উম্মত্ততা রোধ করিতে চাহিয়াছেন। কিন্তু আসামে বৃষ্টিপাতের কোন স্থায়ী সময় সীমা নাই। বৎসরের যে কোন সময় অতিবর্ষণের ফলে নদ-নদীগুলি প্লাবিত হয় বলিয়া এই সকল প্রকল্পের স্থায়ী সুফল এখনও পাওয়া যায় নাই। খরস্রোতা পার্বত্য নদীর উপকূলভূমিও বৃহৎ প্রস্তরখণ্ড বাঁধিবার চেষ্টা করিয়া দেখা গিয়াছে যে প্রচণ্ড প্লাবনে ইহা কার্যকরী হয় না। ব্রহ্মপুত্র তীরস্থ শহরগুলির ভাঙ্গন রোধ করিতে এই ব্যবস্থা অবলম্বন করা হইয়াছে। ইহাছাড়া গঙ্গার সহিত ব্রহ্মপুত্রের সংযোগ স্থাপন করিবার জন্য খাল কাটিবার পরামর্শ একদা ভারতের প্রাক্তন সেচমন্ত্রী ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নদী পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ ডক্টর. কে. এল রাও দিয়াছিলেন। ইহাতে একনিকে যেমন আভ্যন্তরীণ নদী পরিবহনের ক্ষেত্র বিস্তৃত হইবে অন্যদিকে তেমনি আসামও বন্যার ভয়াবহতা হইতে রক্ষা পাইবে। কিন্তু এই পরিকল্পনা বাস্তবে রূপায়ণ করা সম্ভব হয় নাই, কারণ ইহাতে প্রচুর পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন। ইহাছাড়া আসামে প্রতি বৎসর বন্যার ফলে নদীখাতসমূহ ভরাট হইয়া যাইতেছে। ইহাতে নদীর গভীরতা কম হওয়ায়, নদীগর্ভে সঞ্চিত মাটি, বালি প্রভৃতি ড্রেজার দ্বারা সরাইবার ব্যবস্থা করিলে জল প্লাবন বন্ধ করা যায়। প্লাবন রোধের জন্য মানুষের ঐকান্তিক প্রয়াস যদি আংশিক সাফল্য লাভ করে তাহা হইলেও অগণিত মানুষের জীবন রক্ষা পায়। বিজ্ঞজ্ঞানের অশেষ চেষ্টার ফলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত হইতে মানুষ অব্যাহতি পায় নাই তবুও ইহার বীভৎস পরিণাম হইতে যাহাতে মুক্তি পাইতে পারে এই ব্যাপারে সরকারকে সচেষ্ট হইতে হইবে।

২৫। কম্পিউটার

বিজ্ঞানের জয়যাত্রার নবতম সাফল্য কম্পিউটার। গাণিতিক নিয়ম ছাড়াও যে কোনও বিষয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্লেষণের মাধ্যমে কম্পিউটার অতি দ্রুত ফলাফল প্রদান করে। ১৬৪২ সালে গণিতজ্ঞ ব্লেইজি প্যাসকেল প্রথম যান্ত্রিক গণনাযন্ত্র তৈয়ারী করেন। ১৬৭১ সালে গডফ্রাইড লেবনিজ প্রথম গুণ ও ভাগের ক্ষমতাসম্পন্ন যান্ত্রিক ক্যালকুলেটর তৈয়ারী করেন। ১৯৪৪ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও আই. বি. এম. কোম্পানীর যৌথ উদ্যোগে ইলেকট্রো- মেকানিক্যাল কম্পিউটার তৈয়ারী হয়। ইলেকট্রিক কম্পিউটার তৈয়ারী হয় ১৯৪৬ সালে। কম্পিউটারের বিপুল ব্যবহার আরম্ভ হয় ১৯৫৭ সালের পর। কম্পিউটার জগতের বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে ১৯৭১ সালের পর হইতে।

কম্পিউটারের প্রধান দুইটি দিক হইল হার্ডওয়ার এবং সফ্টওয়ার সরঞ্জাম অর্থাৎ যান্ত্রিক সরঞ্জাম এবং প্রোগ্রাম সরঞ্জাম। যান্ত্রিক সরঞ্জামকে কাজে লাগাইবার জন্য প্রোগ্রাম প্রয়োজন। কম্পিউটারের বিভিন্ন অংশের মধ্যে কার্যের সমন্বয় রক্ষা করে প্রোগ্রাম। কম্পিউটারকে প্রধানত চারটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা— (১) সুপার কম্পিউটার, (২)মেইনফ্রেম কম্পিউটার, (৩) মিনি কম্পিউটার এবং (৪) মাইক্রো কম্পিউটার।

বিভিন্ন গাণিতিক সমস্যা সমাধানের জন্য কম্পিউটারের মেমরিতে একসাথে অনেক কার্য নির্দেশের তালিকা সংরক্ষিত হয়। কার্য নির্দেশের এই সমষ্টিকে কম্পিউটার প্রোগ্রাম বলা হয়।

ইন্টারনেটের উদ্ভাবন কেবল তথ্য এবং সংযোগের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহৃত হইলেও বর্তমানে মনোরঞ্জনের মাধ্যম হিসাবেও ব্যবহৃত হয়। কম ব্যয়ে কম সময়ে অধিক সুবিধাজনক হিসাবে ব্যবহার করিতে পারার জন্য ইহার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাইয়াছে। ইন্টারনেট বা অনলাইনের মাধ্যমে সম্পাদিত ব্যবসা-বাণিজ্যকে বলা হয় ই-কমার্স। ই-কমার্সের মাধ্যমে বিভিন্ন জিনিসের ক্রয়- বিক্রয় করা হয়। কম্পিউটারের সম্মুখে বসিয়া বাড়িতে বসিয়াই ক্রয়-বিক্রয়, রেল ও বিমানের টিকিট ক্রয়, যোগাযোগ সম্ভব হয়। ই-মেল, ই-ব্যাঙ্কিং, ই-ট্রেভেল ইত্যাদি লইয়া বিস্তৃত হইয়াছে ইলেকট্রনিক্সের জগৎ।

কম্পিউটার জটিল সমস্যার সমাধান করে। মহাশূন্যে গবেষণার কাজ সহজসাধ্য হইয়াছে কম্পিউটারের মাধ্যমে। কম্পিউটারের মাধ্যমে খেলা, চিত্র অঙ্কন করা, ভাষা অনুবাদ, প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ প্রভৃতি কার্য সম্পন্ন হইতেছে। বর্তমানে শিক্ষানুষ্ঠান, অফিস, আদালত, বাণিজ্যিক সংস্থা সর্বত্র কম্পিউটারের ব্যাপক ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। কম্পিউটার যেন সমগ্র বিশ্বকে ঘরের ভিতরে আনিয়াছে। তাই বিশ্বকবির সুরে বলা যায়— “কত অজানারে জানাইলে তুমি কত ঘরে দিলে ঠাই দূরকে করিলে নিকটবন্ধু, পরকে করিলে ভাই।”

২৬। পরিবেশ প্রদূষণ ও ইহার প্রতিকার

সমগ্র পৃথিবীতে বিজ্ঞানী তথা বুদ্ধিজীবীরা আজ যে কয়টি প্রধান সমস্যার সমাধানে ব্যস্ত আছেন, ইহাদের একটি অন্যতম সমস্যা হইল পরিবেশ প্রদূষণ। আদিযুগে পরিবেশ এমন ছিল না; বায়ুমণ্ডল ছিল নির্মল, জল ছিল বিশুদ্ধ, মাটি ছিল খাঁটি। কিন্তু আধুনিক যন্ত্র সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশে শুরু হইল প্রদূষণ। কল-কারখানা নিঃসৃত ধোঁয়ার নিসর্গ প্রকৃতির আকাশ- বাতাস আজ কালিমাযুক্ত হইয়া উঠিয়াছে। মানুষের জৈবিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য যানবাহন ও যন্ত্রপাতিগুলি পরিবেশকে দূষিত করিতেছে। যন্ত্র পরিত্যক্ত জঞ্জাল নদী-নালায় জলের বিশুদ্ধতা নষ্ট করিতেছে। কীট-নাশক নানা প্রকারের ঔষধ প্রয়োগের ফলে মাটির খাঁটিত্ব নষ্ট করিয়া ফসলের মাধ্যমে মানবদেহে বিষ প্রয়োগ হইতেছে। জৈবিক প্রয়োজনে গাছপালা ধ্বংসের ফলে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের পরিমাণ হ্রাস পাইতেছে। পারমাণবিক তথা বৈজ্ঞানিক নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলে সূর্যরশ্মির বিশুদ্ধাতাও নষ্ট হইতেছে। পঞ্চভূতে গঠিত প্রকৃতির পাঁচটি উপাদান পঞ্চভূতে গঠিত মানবদেহকে করিতেছে দূষিত। মানুষ যেদিন হইতে আগুনের আবিষ্কার শিখিল, সেইদিন হইতে বায়ুতে অক্সিজেনের পরিমাণ হ্রাস পাইতে শুরু করিল। এদিকে গাছপালা বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করিয়া অক্সিজেনের ভারসাম্য রক্ষা করিত। কিন্তু মানুষ আজ নিজেদের প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে অরণ্য ধ্বংস করিতেছে। ইহাছাড়া বাষ্পশক্তি ও বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদনের মূলেও রহিয়াছে অক্সিজেন দহন। অধুনা পারমাণবিক ক্রিয়া-কলাপের মূলেও রহিয়াছে অক্সিজেনের দহন লীলা। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে নাগাসাকি ও হিরোসিমার উপর যে বোমা বর্ষিত হইয়াছিল মানুষ জীবজন্তু ও গাছপালার উপরও ইয়ার প্রভাব পড়িয়াছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং উহা হইতে সুযোগ-সুবিধা লাভের আশায় মহাকাশে আজ যে সমস্ত রকেট ও কৃত্রিম উপগ্রহাদি প্রেরিত হইতেছে, উহাদের নিঃসৃত গ্যাসও পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে দূষিত করিতেছে। বায়ুমণ্ডলের স্ট্যাটোস্ফিয়ার-এর ‘ওজন গ্যাস ইহার সমতা রক্ষা করিতে পারিতেছে না। ইহার ফলে সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মি বা আলট্রা ভায়োলেট রে’ পৃথিবীতে আসিয়া প্রাণ সম্পদের অনিষ্ট সাধন করিতেছে।

আধুনিক পৃথিবীতে পরিবেশ প্রদূষণের জন্য বিশেষ করিয়া মানুষই দায়ী, আর সমগ্র প্রাণিজগৎ ইহার ফলভোগী। অরণ্যের বৃক্ষাদি ধ্বংস হওয়ায় বায়ুমণ্ডলের গ্যাসের ভারসাম্য বিনষ্ট হইয়াছে। ইহার ফলে পৃথিবীতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ হইয়াছে অস্বাভাবিক। ঋতুকালীন বৃষ্টিপাত না হওয়ার ফলে শস্য উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটিতেছে; বহু মূল্যবান প্রাণী ও উদ্ভিদ পৃথিবী হইতে চিরতরে ধ্বংস হইয়া যাইতেছে। মনুষ্যকুলেও রোগ-ব্যাধির প্রকোপ বৃদ্ধি পাইতেছে। দুষিত বায়ুমণ্ডল ও দুষিত জল রোগ- জীবাণুর বংশবৃদ্ধির অনুপম ক্ষেত্র। ফলে মানব সমাজে আজ যক্ষ্মাদি শ্বাসরোগ, অন্যান্য ক্ষয়রোগ, উদরাময়, রক্তদৃষ্টি, স্নায়ুরোগ প্রভৃতি দুরারোগ্য ব্যাধি আপন প্রভাব বিস্তার করিয়া চলিয়াছে।

ভারতের পরিবেশ প্রদূষণজনিত মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দের ২ ডিসেম্বর মধ্যপ্রদেশের ভূপালে পৃথিবীর ইতিহাসে ইহাকে ভূপালের ভয়াবহ গ্যাস দুর্ঘটনা বলা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে এখানে ইউনিয়ন কার্বাইডের বিরাট কীটনাশক ঔষধ প্রস্তুতের কারখানা স্থাপিত হয়। কারখানার পাঁচটি ট্যাঙ্কের একটিতে উৎপন্ন হইত বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড

গ্যাস, একটিতে ফসজিন গ্যাস এবং অবশিষ্ট তিনটিতে মিথাইল আইসো-সায়োনেট বা সংক্ষেপে ‘মিক’ গ্যাস দুর্ঘটনার দিন মধ্যরাত্রে ‘মিক’-এর ট্যাঙ্কে বিস্ফোরণ ঘটিল, দেখিতে না দেখিতে শহরের চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িল প্রাণঘাতী এই গ্যাস। কারখানার নিকটস্থ বস্তিতে ঘটিল সর্বাপেক্ষা অধিক অঘটন। বহু আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা এই গ্যাসের বিক্রিয়ায় হইল নিহত, বহুলোক হইল চিরতরে অন্ধ বা পঙ্গু। তারপর বিকলাঙ্গ বা পঙ্গু অবস্থায় সেখানে পরবর্তীকালে মাতৃস্ঠর হইতে শিশুরা ভূমিষ্ঠ হইতে লাগিল । এই দুর্ঘটনায় প্রায় দেড় হাজার লোকের মৃত্যু ঘটে। অগণিত (যাহার সংখ্যা এখনও নির্ণীত হয় নাই) লোক বিকলাঙ্গ বা পঙ্গু অবস্থায় শেষে ভয়ঙ্কর দিনের অপেক্ষা করিতেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রেডক্রস সোসাইটি ইতিমধ্যে দুর্গতদের কিছুটা অর্থ সাহায্য দিয়াছে। কিন্তু এত বড় দুর্ঘটনার পরও এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলি তেমন সজাগ ও সাবধান হইতেছে না। সরকারী বিধি-নিষেধকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখাইয়া বড় বড় শহরেও আজ মারাত্মক সব কারখানাগুলি সগর্বে মাথা উঁচু করিয়া চলিতেছে। এই ব্যাপারে বিভিন্ন রাজ্য তথা কেন্দ্রীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলিকে দুর্নীতিমুক্ত করিয়া পরিবেশ প্রদূষণের কবল হইতে প্রাণিজগতকে যতটুকু সম্ভব রক্ষা করা আবশ্যক। সমস্যাটি এককভাবে কোন একটি দেশের বা রাজ্যের নয়, সমগ্র বিশ্বে ইহার প্রভাব ছড়াইয়া পড়িয়াছে। কিছুদিন পূর্ব পর্যন্ত দক্ষিণের হিম মহাদেশ আন্টার্কটিকা ছিল প্রদূষণমুক্ত। সম্প্রতি সেখানকার পরিবেশেও প্রদূষণের ছোঁয়া লাগিয়াছে।

সম্প্রতি রাষ্ট্রসংঘের উদ্যোগে বিশ্ব পরিবেশ প্রষণ প্রতিরোধ করিবার জন্য ৫ই জুনকে বিশ্ব- পরিবেশ দিবসরূপে পালন করিবার সিদ্ধান্ত লওয়া হইয়াছে। আজ পৃথিবীর সর্বত্র দরকার পরিবেশ বিশুদ্ধীকরণ। ইহার জন্য সকলকে আগাইয়া আসিতে হইবে। বৃক্ষরোপণে উৎসাহ দিতে হইবে, পুরাতন ইঞ্জিনাদি হইতে ধোঁয়া যত কম বাহির হয় তাহার ব্যবস্থা করিতে হইবে, পরিত্যাক্ত অঞ্চলে নদ- বা যেখানে-সেখানে না ফেলিয়া পুড়াইয়া ফেলিবার ব্যবস্থা করিতে হইবে, অশিক্ষিতদের পরিবেশ সম্বন্ধে সজাগ করিবার জন্য পরিবেশ অধ্যয়নের ব্যাপক ব্যবস্থা করিতে হইবে। বায়ুমণ্ডলে ব্যাপকহারে রকেটাদি উৎক্ষেপণ বা মহাকাশে অনাবশ্যক পরীক্ষা-নিরীক্ষাজনিত বিস্ফোরণ সীমিত করিতে হইবে, জলের বিশুদ্ধতা রক্ষা করিতে হইবে, লোকালয়ের আশে পাশে কল-কারখানা স্থাপন বন্ধ করাইতে হইবে, অন্যথায় পৃথিবীর প্রাণিজগতকে অকালমৃত্যুর কবল হইতে রক্ষা করা যাইবে না।

২৭। মিতব্যয়িতা

মানুষের আয়ের সহিত ব্যয়ের সামঞ্জস্য রক্ষা করাকেই মিতব্যয়িতা বলা হয়। সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনই আদর্শ জীবন। প্রকৃত মানুষ সেই জীবনকেই কামনা করে। মিতব্যয়িতা সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনের ভিত্তিপ্রস্তর-স্বরূপ। বর্তমানের সহিত ভবিষ্যতের, আয়ের সহিত ব্যয়ের সামঞ্জস্য রাখা দরকার। জীবনে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধির বুনিয়াদ রচনা করিয়া দেয় মিতব্যয়িতা। শৈশব কাল হইতেই মিতব্যয়িতা আচরণীয় এবং অনুকরণীয় আদর্শ হওয়া উচিত।

মানুষের নিকট ভবিষ্যত অজ্ঞাত। তাহার জীবন অনিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ। মানুষ তাই তাহার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সর্বদা আশঙ্কিত থাকে। শুধু বর্তমানকে লইয়া কিংবা অতীতের স্বপ্নে মগ্ন হইয়া সন্তুষ্ট থাকিতে মানুষ পারেনা। সে ভবিষ্যতের জন্য করিতে চায় জীবনের সংস্থান। তাই মিতব্যয়িতা

তাহার নিকট অপরিহার্য বিষয়। রোজগারের মাধ্যমে যাহা আয় হয় তাহার সবটুকুই বর্তমানের মোহময় গহ্বরে নিক্ষেপ না করিয়া ভবিষ্যতের জন্য কিছু সঞ্চয় করিয়া রাখা দরকার। 

মিতব্যয়িতার অর্থ আয়ানুসারে ব্যয় করা। মানুষ যাহা উপার্জন করে, সে যদি তনতিরিক্ত ব্যয় করিয়া বসে, তাহা হইলে তাহাকে অনুর ভবিষ্যতে নিদারুণ অভাবগ্রস্থ হইতে হইবে। অমিতব্যয়ী

জীবনের বিপুল তাড়নায় তাহাকে দুর্জয় ঋণজালে জর্জর হইয়া ভাগ্যকে দোষারূপ করিতে হইবে। কিন্তু মানুষ যদি ব্যয়ের পরিমাণকে আয়-সীমানার মধ্যে আবদ্ধ রাখে, তাহা হইলে তাহাকে ঋণ করিতে তো হইবেই না উপরত উদ্বেগহীন সুখময় জীবন কাটাইতে পারিবে।

 মিতব্যয়িতার অর্থ কৃপণতা নয়। যাহারা কৃপণ তাহারা নিজের এবং পরিবারের প্রয়োজনের অর্থ খরচ না করিয়া অতিরিক্ত সঞ্চয় করিয়া থাকে। ইহাতে পারিবারিক সুখ-শান্তি নষ্ট হইয়া থাকে। কৃপণেরা বর্তমানকে ফাঁকি নিয়া ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনাতিরিক্ত অর্থ সঞ্চয় করিয়া রাখে। নিজের আত্মাকে কষ্ট নিয়া, তাহারা পরিবার-পরিজনকে উপবাসী রাখিয়া কেবল সময়ের নেশায় মাতিয়া উঠে। কিন্তু বর্তমান তাহাকে ক্ষমা করে না, ক্ষয়-ক্ষতি বা রোগ-শোকের দুর্জয় আঘাতে বর্তমান কাল তাহার প্রতিশোধ গ্রহণ করিতে বাধ্য। লক্ষ্মীর অন্তরের কথা হইল কল্যাণশ্রী আর; কুবেরের অন্তরের কথা অর্থ আবার খরচের নেশায় পাইয়া বসিলে মানুষ অমিতব্যয়ি হইয়া উঠে এবং ব্যয় বাহুল্যের অনিবার্য পরিণামে পরবর্তী কালে তাহার জীবনে আসে অসহ দুঃখ ও লাঞ্ছনা।

বাল্যকালে পিতা-মাতার স্লোহাতিশয্যে অমিতব্যয়িতা প্রশ্রয় পাইয়া জীবনের চন্দনতরুকে বিষবৃক্ষে পরিণত করিতে পারে। অথচ শৈশবেই যদি তাহা সংশোধিত হয় তাহা হইলে উত্তর জীবনের চরম ট্র্যাজেডি হইতে নিজেকে রক্ষা করা সহজতর হয়। অমিতব্যয়ীর জীবনে আত্মসুখ ও ভোগ সর্বস্বতার ক্ষুদ্রতা প্রশ্রয় পায়। সমাজবাদী রাষ্ট্রে ভোগবন্টনের সকল বিধি বলবৎ থাকায় সেইখানে বিষবৃক্ষের জন্ম ও বৃদ্ধির সম্ভাবনা কম। সেখানে সামাজিক মিতব্যয়িতা ব্যক্তির মিতব্যয়িতাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার ভার গ্রহণ করে সমাজ।

২৮। বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ

ভূমিকা : বিজ্ঞান শব্দের প্রকৃত অর্থ হইল যে জ্ঞান মানুষকে বিশেষরূপে জানাইয়া দেয়। যাহা মানুষ হাতে কলমে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সাহায্যে প্রত্যক্ষরূপে জানিয়া থাকে তাহাই বিজ্ঞান। সভ্যতার ইতিহাসে কখন হইতে বিজ্ঞানের সূত্রপাত তাহা সঠিক করিয়া নির্ণয় করা অসম্ভব। সৃষ্টির আদিম যুগে মানুষ ছিল একান্ত অসহায়, প্রকৃতির ক্রীড়নকমাত্র। মানুষ তাহার যুগ-যুগান্তরের স্বপ্ন ও সাধনার অনবদ্য ফসল নিয়া আধুনিক সভ্যতার বিশাল ইমারত গড়িয়া তুলিয়াছে। আপন মনীয়ার বলে মানুষ বিজ্ঞানকে আজ সভ্যতার বনিয়াদ রচনার কাজে নিয়োজিত করিয়াছে। আজ সভ্যতার চরম সমুন্নতির মুলে রহিয়াছে বিজ্ঞানের অপরিসীম বিস্ময়। বিজ্ঞান অসম্ভবকে আনিয়াছে সম্ভবের সীমানায়। মানুষকে পৌঁছাইয়া দিয়াছে শূন্যে মহাকাশে, গৌরবের উচ্চশিখরে। বিজ্ঞানের চমৎকারিত্বে আজ প্রকৃতির হাতে অসহায় মানুষ হইয়া উঠিয়াছে অসীম শক্তিধর। আজ সুউচ্চ পর্বত, পারাপারহীন সাগর অথবা অন্য কোন প্রাকৃতিক বাধা মানুষের অগ্রগতির পথরোধ করিয়া দাঁড়াইবার ক্ষমতা রাখে না। মানুষের তৈরি যন্ত্র আজ সর্বদিকেই যেন অসাধ্যকে সাধন করিতে সক্ষম হইতেছে।

কিন্তু বিজ্ঞজ্ঞানের এই সীমাহীন ও অকৃপণ অবদানের জন্য সকৃতভজ্ঞ চিত্তে মাথা নত করিয়াও বিশ্বমানবের অন্তর হইতে যেন ভাসিয়া আসিতেছে এক ভীষণ ভয়ার্ত জিজ্ঞাসা –এই সুন্দর বিশ্বের ধ্বংসের বিষাণ কি চির কল্যাণময় বিজ্ঞানই বাজাইবে? বিজ্ঞানের আশীর্বাদের পিছনে কি অভিশাপের হাতছানি অপেক্ষা করিতেছে?

বিজ্ঞান আশীর্বাদ : মানব জীবনকে পূর্ণতর এবং সুন্দরতর করিয়া তুলিবার উপায় হিসাবে বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্বকে অস্বীকার করিবার কোনো উপায় নাই। বিজ্ঞান মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ আশীর্বাদ। বিজ্ঞানের ফলস্বরূপ চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতি মানুষের আয়ু-সীমা বর্ধিত করিয়াছে। মানুষ এমনকি কৃত্রিম উপগ্রহ নির্মাণ করিয়া বিধাতার ক্ষমতার প্রতিস্পর্ধী হইয়া দাঁড়াইয়াছে। বিজ্ঞান মানুষকে ভূগর্ভস্থিত অসংখ্য মূল্যবান ধাতু ও রত্নের সন্ধান দিয়া করিয়াছে ধনবান। বিজ্ঞানের প্রসাদে মানুষের জীবনে দেখা দিয়াছে সুখ-স্বাচ্ছন্দ। বিজ্ঞান মানুষেকে করিয়াছে বিপুল বৈভবের অধিকারী। বিজ্ঞানীর প্রতিভা বৈদ্যুতিক শক্তিকে করায়ত্ত করিয়া পৃথিবীর রূপকেই যেন পাল্টাইয়া দিয়াছে। বৈদ্যুতিক বাতি, পাখা, রেডিও, ফ্রিজ, টেলিফোন, টেলিভিশন, ইত্যাদি বিভিন্ন আবিষ্কার দূরের দেশ, দূরের মানুষ আজ হইয়া উঠিয়াছে একেবারেই কাছের। এই বিশাল বিশ্ব আজ মানুষের নিকট এক পড়ায় পরিণত হইয়াছে। আরাম-আয়াসের তো কথাই নাই, এই সকল হইল বিজ্ঞান-নির্ভর আধুনিক সভ্যতার অতি উজ্জ্বল দিগন্ত।

বিজ্ঞান অভিশাপ ঃ বিজ্ঞানের আবিষ্কার মানব জীবনে অভূতপূর্ব সুখ-স্বাচ্ছন্দ আনন্দ আনিয়া দিয়াছে সত্য, কিন্তু জগতের অন্যান্য জিনিসের মতো বিজ্ঞানেরও একটা অশুভ দিক আছে। ইহার যেমন আধুনিকতম সভ্যতা সৃষ্টির ক্ষমতা আছে, তেমনই এ বিজ্ঞান এক মুহূর্তে এই সভ্যতাকে ধ্বংস করিবার ক্ষমতাও রাখে। আলফ্রেড নোবেল ডিনামাইট আবিষ্কার করিয়াছিলেন পাহাড়ের পাথর ভাঙ্গিয়া যাতায়াতের পথ সুগম করিবার জন্য। পরে দেখা গেল, এই ডিনামাইটের সাহায্যে কত সুসভ্য জনপদ উড়িয়া গিয়াছে। একটি মাত্র পরমাণু বোমার আঘাতে মুহুর্তের মধ্যে বিরাট ধ্বংসলীলা সাধিত হইয়া গিয়াছিল জাপানের দুইটি শহরে ‘হিরোশিমা’ ও ‘নাগাসাকি।

বিজ্ঞান-রূপ সিন্ধুর মন্থনে একদিকে যেমন বিজ্ঞানের আশীর্বাদরূপ ‘অমৃতের’ উদ্ভব হইয়াছে, অন্যদিকে সঙ্গে সঙ্গেই পাশাপাশি ‘হলাহল’ও উৎপন্ন হইয়াছে? এখন বর্তমান বিশ্বের মানব সমাজ বুঝিতে শিখুক যে তাহারা বিজ্ঞানকে কোন পথে লইয়া যাইবে। কিন্তু প্রকৃত বিচারে দেখা যাইবে ধ্বংসক্রিয়ার জন্য বিজ্ঞান কিন্তু দায়ী নহে, ইহা তো একটি নিষ্ক্রিয় শক্তিমাত্র, বুদ্ধিমান মানুষ ইহাকে যেই দিকে চালনা করিবে বিজ্ঞান সেই দিকেই চলিবে।

আজ লক্ষ লক্ষ কল-কারখানা, যানবাহন, শব্দ-যন্ত্র—সকলের সম্মিলিত অবদানে পৃথিবীর পরিবেশ বিষে বিষে নীল। প্রকৃতি আর জীবনে নামিয়া আসিয়াছে সংকটের অশনি সংকেত। অসীম সম্ভাবনা ও শক্তিময় বিজ্ঞান মুষ্টিমেয় স্বার্থপর নরঘাতীদের হাতে পড়িয়া আজ সমাজের সার্বিক দুঃখ-কষ্ট ও আতঙ্কের রূপে প্রকট করিয়া তুলিয়াছে। মূল কথা বিজ্ঞানের সুফল ও কুফল দুইয়েরই রূপকার মানুষ। মানুষ যদি চায় বিজ্ঞানের মঙ্গল শঙ্খ-ই বাজাইবে তবে পৃথিবীতে কোন দিনই ধ্বনিত হইবে না ধ্বংসের বিষাগ আর বিষের বাঁশি।

২৯। তোমার প্রিয় সাহিত্যিক

যখন বাংলা সাহিত্যে তেমন কোন সাহিত্যিক আদর্শ ছিল না, ছিল না কোন মহান সাহিত্যিক ও সাহিত্যপ্রেম, অবহেলায় অনাদরে বাংলা সাহিত্য ছিল নিমজ্জমান, ঠিক তখনই যিনি রূপকথার রাজপুত্রের মতো বাংলা সাহিত্যকে, বাঙালীর ভাষাকে, চরম অবহেলা, অধঃপতন ও অবমাননার হাত হইতে উদ্ধার করিতে ব্রতী হন, সেই মহান পুরুষই হইলেন আমার প্রিয় সাহিত্যিক বা লেখক। তিনি হইলেন সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। সেই সময় সত্যিই ছিল বাংলা ও ভাষা সাহিত্যের ক্ষেত্রে এক দুঃসময়। একদিকে ইংরেজী শিক্ষিতদের চোখে ছিল বাংলা ভাষা বর্বরের ভাষা, অন্যদিকে সংস্কৃত পণ্ডিতদের দৃষ্টিতে ছিল ইহা চণ্ডালের ভাষা। অপমান, অনাদর, অবহেলা মস্তকে ধারণ করিয়া বাংলা ভাষা সাহিত্য দীন-হীন বেশে শম্বুক গতিতে চলিয়াছিল। সেইদিন বাংলা সাহিত্যের অগ্রণী কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা ভাষাকে অবহেলা করিয়া উহাকে ত্যাগ করিয়াছিলেন। আর সেই অনাদর মুহূর্তে ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র বঙ্গসরস্বতীর পদতলে দাঁড়াইয়া ভক্তিনম্র শিরে তুলিয়া লইলেন বাংলা ভাষাকে।

সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র বঙ্গসরস্বতীর মন্দিরে প্রবেশ করিয়া বাংলা ভাষার পূজার মাধ্যমে বাংলা ভাষার মুখে হাসি ফুটাইয়া তুলিলেন। তাই বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা সাহিত্যের যুগ পুরুষ। পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সাহিত্যের সংঘাতে ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলায় যে বিপুল তরঙ্গ উঠিয়াছিল বঙ্কিমচন্দ্র তাহাকে অপূর্ব বাণীমূর্তি দান করিলেন। তিনি পশ্চিমিয়া হাওয়াকে পূর্বাহাওয়ায় পরিবর্তিত করিয়া বাংলা সাহিত্যের দৈন্যদশা মোচন করিলেন। নতুন নতুন সৃষ্টির উল্লাসে তখন যেন বাংলা সাহিত্য ভাসিল।

শুধুমাত্র এই কারণেই যে লেখক বঙ্কিমচন্দ্র আমার প্রিয় লেখক, তাহা নহে, বঙ্কিমচন্দ্রের মধ্যে আমাদের সুপ্ত চেতনার যেন প্রথম জাগরণ প্রত্যক্ষ করিলাম। তাঁহার বাস্তব জীবনবোধে আমরাঅনুপ্রাণিত হইলাম। তাই আমরা আমাদের সমাজ, স্বদেশ ও নিজের জীবনকে ভালোবাসিতে শিখিলাম। তাহার ‘আনন্দমঠ’, তাহার ‘কমলাকান্তের দপ্তর’, তাহার মুচিরাম গুড়ের জীবন কাহিনীতে আমাদের শুধু চিত্ত মুক্তিই ঘটিল না, আমাদের আত্মদর্শনও ঘটিল।

 বঙ্কিমচন্দ্র মানবী-জননী, দেশ-জননী এবং দেবী-জননীর সমাহারে দেশ মায়ের বাণী বিগ্রহ রচনা করিয়া দেশবাসীর হাতে তুলিয়া দিয়াছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র ভারতের তেত্রিশ কোটি মানুষকে যেন ত্যাগী, বীর ও সন্তানধর্মে দীক্ষিত করিয়াছিলেন তাঁহার ‘বন্দেমাতরম’ মন্ত্রে। শুধু তাহাই নহে, তিনি জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তির সমাহারে তাঁহার ‘আনন্দমঠ’ গ্রন্থে নবযুগের মাতৃসাধনার সার্থক রূপ দিয়াছিলেন। এই সাধনা ব্যর্থ হয় নাই। বঙ্কিমচন্দ্র আমাদের দেশের স্বাদেশিকতার প্রথম রূপকার। সামগ্রিক ভাবে তিনি বাংলা সাহিত্যের ভগীরথ। তাহার আবির্ভাবের পূর্বে বাংলা সাহিত্যে কোথাও ছিল না প্রাণের স্পন্দন, কোথাও ছিল না সবুজের আভাস। তিনি বাংলা সাহিত্যের ধূসরতাকে ঊষরতায় বদলাইয়া দেন। তাহার পরবর্তী কালে লেখক রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী” সেই ধানেই বোঝাই করিয়াছিল। বাংলা সাহিত্যের চরম সমুন্নতির দিনে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের নিকট আমাদের ঋণ অনস্বীকার্য। তাই স্বনামধন্য লেখক বঙ্কিমচন্দ্র আমার প্রিয় লেখক। তিনি আমাদের জাতীয় জীবনমুক্তির চরম এবং পরম উদাহরণ।

Leave a Reply